মাল খেতে খেতে শ্রীনাথ রামলাখনের সঙ্গে জমিয়ে নিল।
বহু বহুকাল বাদে তৃষা এই ঘরের কাছের কলকাতায় এল।
দুপুরবেলা হাওড়া স্টেশনে নেমেই বুঝেছিল সে অনেকটাই গেঁয়ো হয়ে গেছে। শহর দেখলে বুকে চমক লাগে। ভয় ভয় করে। দিশাহারা বোধ হয়।
সরিৎ বলল, ট্যাক্সি নেব তো?
ট্যাক্সি। ট্যাক্সি কেন?
তবে কিসে যাব? যা ভিড়।
আমার পয়সা সস্তা হয়নি। বাসে বা ট্রামে যাব।
এ কথার ওপর কথা নেই। তবে সরিৎ আশা করেছিল। বড়লোক দিদির সঙ্গে একটু আরামে ট্যাক্সিতে ঘুরবে। সেটা হল না।
তৃষার তেমন কেনাকাটার বাই নেই। তবে বড়বাজার থেকে কিছু জামাকাপড় না কিনলেই নয়। ত্রয়ীর জন্য পাইকারদের কাছেও যেতে হল। বড়বাজারের পাইকাররা মফস্সলের খুদে দোকানদারদের পাত্তাই দিতে চায় না। তৃষা এসেছে তাদের কারও কারও সঙ্গে পাকাপাকি ব্যবস্থা করতে। না হোক তৃষার হাতব্যাগে হাজার দশেক টাকা আছে আজ। বাসে যাওয়া কতটা নিরাপদ। তা বুঝতে পারছিল না সরিৎ। শত সতর্ক থাকলেও কলকাতার হস্তশিল্পীদের কাজ খুবই সূক্ষ। মেজদিও তো এখন আর কলকাতার হালচালে রপ্ত নয়। তাই সরিৎ প্রায় চোখের পাতা ফেলছিল না।
বড়বাজারের কাজ সারতে সারতেই বিকেল হয়ে গেল। অফিস টাইম।
সরিৎ বলল, ভবানীপুরে কি আজই যাবে?
যেতেই হবে। কেন?
বলছিলাম, অফিস ভাঙল তো, বাসে ওঠা যাবে না।
আমি যাবই!
সঙ্গে মালপত্র আছে যে!
পাইকারদের সঙ্গে বন্দোবস্তে যাওয়া গেছে বলে তৃষা একটু খুশি। মেয়েছেলে খদ্দের দেখেই হোক বা অন্য কারণেই হোক পাইকাররা তৃষার সঙ্গে অন্তত দুর্ব্যবহারটা করেনি। পাইকার বাছতে ঘোরাঘুরিও কিছু কম হয়নি। তাই সবদিক বিবেচনা করে তৃষা বলল, ট্যাক্সি ধরতে পারবি?
দেখি।
দেখ তা হলে।
সরিৎ অবশ্য সহজেই ট্যাক্সি পায়। তার কারণ সে সহজাতভাবেই উদ্যোগী লোক। ট্যাক্সি ধরতে গিয়ে যদি অন্য কারও সঙ্গে বখেরা লাগে বা ট্যাক্সিওয়ালা বেগড়বাই করে, তবে সরিৎ টপ করে হাত চালাচালিতে নেমে যেতে পারে। তা ছাড়া নিপাট ভালমানুষের মতো ট্যাক্সিওয়ালা যেদিকে যেতে চায় সেদিককার নাম করেই উঠে বসে, তারপর নিজস্ব পথে ঘাড় ধরে নিয়ে যেতে পারে।
সুতরাং আধঘন্টার চেষ্টাতেই সরিৎ ট্যাক্সি পেয়ে গেল। ভবানীপুরে যখন পৌছোল তখনও বেলা আছে বেশ।
একটু বাধোবাধো লাগছিল তৃষার। বহুকাল প্রীতমবাবু বা বিলুর সঙ্গে দেখা হয়নি। এ বাড়িতে আসেওনি তিন-চার বছর। বিলুর মেয়ে হয়েছে খবর পেয়েছিল, সেই মেয়েটাকে দেখেনি পর্যন্ত।
দোতলায় উঠে কলিং বেল টিপতেই অল্পবয়সী একটি মেয়ে দরজা খুলে দিল। ঘরে ঢুকে স্বভাবসিদ্ধ তীক্ষ্ণ নজরে চারদিকটা দেখে নেয় তৃষা। প্রথমেই নজরে পড়ে, ঘরে অনেক দামি জিনিস, কোনও যত্ন নেই। বিলু কোনওকালেই সংসারী ছিল না। একটু উড়ু উড়ু উদাসীন মেয়ে। কুমারী অবস্থায় অনেক জল ঘোলা করেছে। তৃষা কানাঘুষো শোনে, এখনও নাকি একজন পুরুষবন্ধুর সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রাখে।
তা সে রাখুক গে, কিন্তু সংসারটা গুছিয়ে তুলবে তো। বাইরের ঘরে সিলিং-এ ঘন কালো স্কুল জমেছে, চেয়ারে ধুলো, সোফার ঢাকনা নোংরা, টেবিলের ওপর ম্যাগাজিন অগোছালোভাবে উঁই করা, মেঝের জুট কার্পেটের ফেঁসে বেরিয়ে আছে, দরজার পরদায় হাজার রকমের হাতমোছার দাগ।
তৃষা প্রথমে মেয়েটিকেই জিজ্ঞেস করল, তুমি কে?
এ বাড়িতে বাচ্চা রাখি।
শুধু বাচ্চা রাখো?
হ্যাঁ।
তৃষার চেহারায় ব্যক্তিত্ব এবং কণ্ঠস্বরের বিরক্তিতে মেয়েটা একটু মিইয়ে গেছে। ঠিক বুঝতে পারছে না, ইনি কে বা কতখানি কর্তৃত্বের অধিকারী।
তৃষা নীরস গলায় বলল, ঘরদোরের দিকে একটু নজর দিতে পারো না? বিলু বাড়ি আছে?
না। অফিসে।
প্রীতমবাবু?
ভিতরের ঘরে শুয়ে ঘুমাচ্ছেন।
তা হলে আমরা এ ঘরেই একটু বসি। তুমি ততক্ষণে একটু চা করে আনন! আর প্রীতমবাবুর ঘুম ভাঙলে বোলো, রতনপুরের বউদি এসেছে।
আচ্ছা।
বাচ্চাটা কোথায়?
বাচ্চাও ঘুমোচ্ছে।
তোমার নাম কী?
অচলা।
কতদিন কাজ করছ?
এই তো মাস তিনেক।
চা করতে পারবে তো?
এবার অচলা হেসে বলে, কেন পারব না?
না ভাবছিলাম তোমার চা করার কথা হয়তো নয়।
তাতে কী? একটু বসুন, করে আনছি।
বাড়িতে আর কাজের লোক নেই?
আছে।
বলে অচলা সরিৎকে অপাঙ্গে দেখে নিল। ঘরে ঢুকে অবধি ছেলেটা খুব মন দিয়ে তাকে দেখছে। ক্ষুধার্ত চোখ। যেন পেলেই ছিড়ে খায়। নজরটা অবশ্য অচলার খারাপ লাগে না। পুরুষের চোখে নিজের একটা যাচাই হয়। রতনপুরের বউদিকেও তার একনজরেই ভাল লেগে গেছে। আজকালকার ফালতু বউ নয়, ওজন আছে। ঘরের পাখা চালিয়ে দিয়ে অচলা স্মিতমুখে ভিতরে চলে গেল।
প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে তৃষার ব্লাউজ ভিজে গেছে। কিন্তু শরীরের কষ্টকে সে কোনওকালে কষ্ট বলে মানে না। মনের কষ্টও তার নেই, কারণ মন জিনিসটাকে সে মেরে ফেলতে শিখে গেছে।
তৃষা পাখার তলায় সোফায় বসল। সরিৎ একটু সমসূচক দূরত্ব রেখে বসল চেয়ারে। সরিৎ জেনে গেছে সে মেজদির যতটা ভাই তার চেয়ে অনেক বেশি কর্মচারী।
একটু বাদেই ট্রেতে চা সাজিয়ে নিয়ে এল অচলা। প্লেটে বিস্কুট আর চানাচুর। বলল, দাদাবাবু জেগেছেন।
আমার কথা বলেছ?
বলেছি। উনি আসছেন।
আসছেন!–বলে ভ্রু তোলে তৃষা, আসছেন মানে? শুনেছি, উনি নাকি বিছানা থেকে উঠতে পারেন না!
এখন তো ওঠেন দেখি।
তবু কী দরকার? চলো, আমরাই ভিতরে যাই।— বলে তৃষা উঠে পড়ে।
