উঠোনের দু’পাশে দুটো খোড়ো ঘর। মাটির ভিত। সর্বত্রই নোংরা ময়লা আর দীনদরিদ্র হাড়হাভাতে ভাব। কোনওকালেই এরকম কুৎসিত জায়গায় পা দেয়নি শ্রীনাথ। এখানে ফুর্তির প্রশ্ন ওঠে না। বরং বমি আসছে।
তবু এ তো তার লড়াই।
রামলাখনকে চাক্ষুষ চেনে কি না তা সে নিজেও জানে না। দেখলে হয়তো মুখটা চেনা বলেই জানতে পারবে। তবে সে না চিনলেও এ তল্লাটে তাকে সবাই চেনে। তাই বারান্দায় উঠে গম্ভীব গলায় হক মারল, রামলাখন!
ঘরের ভিতর থেকে সোঁদা টকচা বিচ্ছিরি গন্ধ আসছে। সম্ভবত পচাই বা তাড়ি, বা দুটোই। এসব কখনও খায়নি শ্রীনাথ। খেতে পারবে বলেও মনে হয় না। গন্ধে গা গুলোচ্ছে।
খুব নিচু আধমানুষ সমান একটা দরজা সামনে। কুঁজো হয়ে সাজোয়ান একটা লোক উঁকি মেরে খুব দ্রুকুটি করে তার দিকে চাইল।
শ্রীনাথ উঁচু গলায় বলে, তুমি রামলাখন?
রামলাখন সন্ধের ঘোর-ঘোর অন্ধকারে বোধ হয় ভাল দেখতে পায় না। ফের ঘরে ঢুকে একটা হ্যারিকেন হাতে উঁকি দিয়ে দেখে নিল। তারপর পরিষ্কার বাংলায় বলল, কী চাই বাবু?
শ্রীনাথ হেসে বলল, দূর ব্যাটা। তোর এখানে লোকে আবার কী চাইবে? ফুর্তি করতে চাই।
লোকটা হাঁ করে আছে। হ্যারিকেনের আলোতেও তার চোখে আতঙ্ক দেখতে পায় শ্রীনাথ। বোধ হয় তার মতো বিশিষ্ট লোক এখানে আসায় ভড়কে গেছে।
শ্রীনাথ গলা মোলায়েম করে বলে, ভাল মালটাল রাখিস? না কি শুধু পচাই আর তাড়ি?
লোকটা জবাব দিচ্ছিল না। ঘরের ভিতরে বোধ হয় দু-চারজন গুন গুন করে কথা বলছিল, সেসব কথাবার্তা থেমে গেছে। লোকটার মুখের ভাব আর চারদিককার আবহাওয়ায় কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল শ্রীনাথের। সে রামলাখনকে নিশ্চিন্ত করার জন্য বলল, আরে ভয় নেই, পুলিশের লোক নই। আমাকে চিনিস না? আমি চাটুজ্জেবাড়ির বাবু।
এবার লোকটা চেরা গলায় এক কথায় বলল, চিনি।
তবে হাঁ করে আছিস কেন?
লোকটা একটু যেন বিরক্ত গলায় বলল, যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আবার কী অন্যায়টা হল?
কথাটার কোনও মানেই বুঝল না শ্রীনাথ। বলল, দূর ব্যাটা, নিজেই এক পেট গিলে বসে আছিস নাকি? কী হয়েছে? কিসের কথা বলছিস?
লোকটা কথা কানে না তুলে বলল, সাচ বাত বলে দিই বাবু, নিতাই শালা বহুত হারামি। অনেকদিন আমার বেজিটা চুরি করার মতলবে ছিল। লাইনের এধারে শালাকে পেলে ছাড়ব না।
শ্রীনাথ বুঝল, নিতাই একটা কিছু করেছে। তা সে নিত্যই সবসময়েই করে। চুরি তার হাতের পাঁচ। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে শ্রীনাথ ভাবে, নিতাইকে তাড়িয়ে দেবে। আবার মনে হয়, সেই দাদার। আমল থেকে আছে, পাগলছাগল লোক। আছে থাক। কত সময়ে কাজেও লেগে যায়।
শ্রীনাথ জিজ্ঞেস করল, কেন? নিতাই কী করেছে?
আপনি জানেন না বাবু?
বললে তো জানব! আমি কি নিতাইয়ের খবর নিয়ে বেড়াই নাকি?
আপনার শালা সরিৎবাবু আমাকে বাজার থেকে মারতে মারতে সকলের সামনে দিয়ে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। বলল, বের কর তোর বেজি, নইলে জান নিয়ে নিব। বলুন, কাজটা জুলুম নয়? নিতাই বেজি চুরি করেছে সবাই জানে। আর চোরাই মাল ঘরে রাখার মতো বুরবক তত নিতাই নয়। ঝুটমুট আমার হয়রানি।
সরিৎ তোমাকে মেরেছে? কবে বলো তো?
আজ দুপুরবেলা।
শ্রীনাথ কী বলবে ভেবে পেল না। তবে রাগে তার গা জ্বলতে লাগল। সরিং যে ভদ্রলোকের মতো মানুষ হয়নি সেটা শ্ৰীনাথ জানে। কিন্তু এটা বড় বেশি বুক চিতিয়ে চলা। এটাকে বাড়তে দিলে অনেক দূর গড়াবে। একা তৃষাতেই রক্ষা নেই, তার ওপর আবার সরিৎ।
শ্রীনাথ একটা ধমক দিয়ে বলল, তা তোকে মারল আর তুইও মার খেলি! এত বড় গতরটা কি ভোর গতব নাকি? উলটে দু’ ঘা দিলি না কেন?
আই বাবা, বাবুলোকদের গায়ে হাত তুললে পুলিস জান কয়লা করে দেবে। আমরা তৃষা বউদির সঙ্গেও কাজিয়া করতে চাই না। কিন্তু নিতাই শালা কে বলুন! ওকে খাতির করব কেন?
কথা বারান্দায় দাঁড়িয়েই হচ্ছে। ভারী মশার উৎপাত। দাঁড়ানো অবস্থাতেই শ্রীনাথের ধুতি পরা পায়ের পিছনে গোটা পাঁচ-সাত কামড়াল। সে নিচু হয়ে পা চুলকোতে চুলকোতে বলল, ঠিক আছে, ব্যবস্থা হবে। এখন ঢুকতে দে বাবা। মালটাল বের কর কী আছে।
লোকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলে, এই ঘরে সব বস্তির লোক বসে। ওইদিকের ঘরে চলুন, আলাদা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
দূর ব্যাটা!–শ্রীনাথ হাসে, আলাদা মাল খাওয়ায় সুখ কী রে! সকলের সঙ্গে বসে খেলে তবে না মৌজ। দরজা ছাড় তো বাবা বিভীষণ।
রামলাখন দরজা ছেড়ে ভিতরে ঢুকে যায়। পিছু পিছু শ্রীনাথ।
ঘরটা বেশ বড় মাপের। মেটে ভিটির ওপর দেয়াল ঘেঁষে কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ, আর মাঝখানে চাটাই পাতা। খদ্দের বেশি এখনও জোটেনি। দু-চারজন রিকশাওয়ালা বা কুলিকাবারি গোছের লোক বসে আছে এদিক ওদিক। জানালা বেশি না থাকায় ঘরের মধ্যে যেমন গুমোট তেমনি গাগোলানো গন্ধ। অতি জঘন্য পরিবেশ। একটা কালো মোটাসোটা গেছে মেয়েছেলে সার্ভ করছে। তার হাতে মোটা রুপোর রুলি, পায়ে মল। মুখখানার কোনও শ্রী নেই। বরং ব্রণ বা ঘামাচি থাকায়। মুখের চামড়া অমসৃণ। তবে মেয়েটার একটা প্লাস পয়েন্ট যে, তার বয়স ত্রিশের নীচেই।
এই মেয়েটাই যদি এখানকার মক্ষীরাণী হয়ে থাকে তবে শ্রীনাথ এখানে মেয়েছেলের বাপারটা পেরে উঠবে না।
রামলাখন তাকে একটা কাঠের চেয়ারে বসতে দিয়েছিল। শ্রীনাথ সোজা চাটাইয়ে বসল। রামলাখন বোধ হয় গরম জলে ধুয়ে ভাল একটা গেলাসে তার স্টকের সবচেয়ে সেরা দিশি মদই এনে দিল। তবু খুবই ঘিন ঘিন করছিল শ্রীনাথের। কিন্তু সে জানে মুখে দেওয়ার আগটুকু পর্যন্তই যত ঘেন্না। তারপর আর ঘেন্নাপিত্তি থাকে না, সব অমৃত হয়ে যায়।
