দেখবেন কী করে, আপনারা কাজের লোক, ব্যস্ত থাকেন।
আমার আর কাজ কী? বসে বসে খাচ্ছি।–বলে শ্রীনাথ একটু শ্লেষের হাসি হাসে।
হরিশের সাইকেলের হ্যান্ডেলে একটা ন্যাকড়ার ব্যাগ ঝুলছে। বোধ হয় বাজার করে ফিরবে সেই রাত্রিবেলা। কম্পাউন্ডার হলেও বোধ হয় হরিশের সংসার বেশ সুখেরই। মুখে-চোখে সংসারী মানুষের স্বাভাবিক দুশ্চিন্তার ছাপ আছে, চেহারাটাও গরিবদের মতো নীরস। বোধ হয় দিন দুয়েক দাড়ি কামায়নি। অল্পে বুড়িয়ে যাওয়ার ভাব। নিতান্তই সস্তা হ্যান্ডলুমের ময়লা গেরুয়া পাঞ্জাবি আর মোটা ধুতির পোশাক। পায়ে হাওয়াইজোড়ার সোল কাগজের মতো পাতলা। তবু লোকটাকে অসুখী মনে হয় না শ্রীনাথের। একহাতে সাইকেলটা ধরে রেখে অন্য হাতে মাথা চুলকোতে চুলকোতে কৃতার্থ হয়ে যাওয়ার হাসি হেসে বলে, বসে বসে খেলেও কি আর বড়লোকদের কাজের অভাব হয়?
আমি বড়লোক কিসের? সবাই জানে, সম্পত্তি সজলের মায়ের।
ওই হল। আপনার যে কেমন সব কথা!
কথাটা শুনতে খারাপ বলেই কি আর মিথ্যে? আমি বড়লোক-টড়লোক নই বাপু!
হরিশ বোধ হয় এসব কথায় থাকতে চায় না। অন্য কথায় যাওয়ার জন্যই বলল, আজ যে বড় বেলাবেলি দেখছি। এত সকালে তো ফেরেন না।
আজ ফিরেছি। ভাবলাম, রোজ তো কলকাতায় ফুর্তি করিই, আজ এখানকার রসের হাটটা একটু দেখে আসি।
হরিশ একটু ঘাবড়ে গেল এ কথায়। বলল, তা বেশ তো। ভাল কথা।
শ্রীনাথ কূটচোখে হরিশকে নজর করছিল। একে দিয়ে কাজটা হলেও হতে পারে। তাই সে গলাটা একটু নামিয়ে বলল, রামলাখনের ঝোপড়ায় কেমন ব্যবস্থা জানেন?
হরিশ থতমত খেয়ে বলে, রামলাখন? মানে লাইনের ওপাশে?
হ্যাঁ। শুনেছি নাকি খুব জমে সেখানে।
হরিশ বিষণ্ণ মুখে বলল, জানি না।
বেশ গলা তুলে মোড়ের প্রায় সবাইকে শুনিয়ে বলল, আজ রামলাখনের ঘরেই ফুর্তি করতে যাচ্ছি।
হরিশ এ কথার জবাব না দিয়ে এবং কথাটা যেন শোনেনি এমন ভাবখানা করে তাড়াতাড়ি বলল, যাই তা হলে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
বলেই সাইকেলটা একটু ঠেলে গুপ্ করে লাফিয়ে উঠে বসল।
শ্রীনাথ একটু চেয়ে রইল চলন্ত সাইকেলটার দিকে। আশা করা যায়, আজ বা কালকের মধ্যেই সারা বাজারে কথাটা ছড়িয়ে পড়বে। ভেবে আপনমনে এক বিষাক্ত আনন্দের হাসি হাসল শ্রীনাথ। ছড়াক, অনেকদূর পর্যন্ত ছড়াক।
মোড় ছাড়াতেই যতীনবাবুর সঙ্গে দেখা। বছরখানেক আগে হাইস্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মাস্টার হিসেবে রিটায়ার করেছেন। এখন দু’বেলা টিউশনি করেন আর অবসর সময় কাটে বছর তিনেকের নাতনিটিকে নিয়ে। আজও নাতনি নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন। যতীনবাবুরও ভারী গাছপালার শখ। তবে পয়সার অভাবে বিরল জাতের দামি গাছ লাগাতে পারেন না। আজ দেখা হতেই বললেন, দেওঘর থেকে গোলাপ আনিয়েছেন শুনলাম। আমাকে একটা কলম দেবেন?
আর কদিন যাক। গাছ এখনও মাটির সঙ্গে কথা কইছে।
সে তো জানি। গাছ বড় হোক, আমার কথাটা যেন মনে থাকে।
থাকবে। আপনি নতুন কী লাগালেন?
এ সিজনে আর কী হবে! মল্লিকা লাগিয়েছিলাম, খুব ফুল হচ্ছে। আপনার কথামতো কেমিক্যাল সার একদম বাদ দিয়ে দিয়েছি।
ভাল করেছেন। বেশিদিন কেমিক্যাল সার দিলে মাটি জমে পাথর হয়ে যাবে। দুনিয়াটার যে কী সর্বনাশই করছে মানুষ কেমিক্যাল সার দিয়ে। বুঝবে একদিন। দরদি লোক পেয়ে কথাটা আবেগ দিয়ে বলল শ্রীনাথ।
যতীনবাবুর বাচ্চা নাতনিটা খুঁত খুঁত করছে। দাদুর এই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা তার বিশেষ পছন্দ নয়। যতীনবাবু নাতনিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, কদিন ধরেই যাবাব ভাবছিলাম। কিন্তু আপনাকে তো বাড়ি গিয়ে পাওয়া যায় না। আজ ভাগ্যে দেখা হয়ে গেল।
সকালের দিকটায় থাকি।
আজ ছুটি নাকি?
না। তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছি।
বলে একটু ইতস্তত করল শ্রীনাথ। যারা গাছ ভালবাসে তাদের দুঃখ দিতে তার প্রাণ চায় না। কিন্তু মনে এত বিষজ্বালা যে, সব সৎ ও অসতের বোধ একাকার হয়ে গেছে। তাই শ্রীনাথ দ্বিধা ঝেড়ে বেশ স্পষ্ট করে বলল, যাচ্ছি একটু রামলাখনের ঘরে ফুর্তি করতে।
যতীনবাবু কথাটা ঠিক বুঝতে পারেননি। বললেন, রামলাখন? সেটা আবার কী?
ওই লাইনের ওপাশে তার ঝোপড়ায় দেশি মদ বিক্রি হয়। আরও সব ব্যাপার আছে।
যতীনবাবু হা হয়ে গেলেন। এমনভাবে তাকালেন যেন শ্রীনাথের মাথা খারাপ হয়েছে কি না তা বুঝতে পারছেন না। দৃশ্যটা করুণ এবং শ্রীনাথের একটু কষ্টও হল। কিন্তু এরকমভাবে কথাটা না ছড়ালেও তার উপায় নেই। এ তার লড়াই।
যতীনবাবু ভীষণ গম্ভীর হয়ে গেলেন। নাতনিকে আর-একটু বুকে চেপে ধরে–টা কুঁচকে বললেন, যান। বড়লোকদের সবই মানায়।
আমি বড়লোক নই, তবে ফুর্তিবাজ বটে। বড়লোক হচ্ছে সজলের মা। আমি কে?
যতীনবাবু গলা খাঁকারি দিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। তারপর বললেন, ওসব ভদ্রলোকের জায়গা নয়।
বেশ রেলার সঙ্গেই শ্রীনাথ বলল, ভদ্রতার মুখে পেচ্ছাপ।
এই কথাটাই যতীনবাবুকে ধাক্কা দিয়ে সচল করে দিল। নাতনি নিয়ে বেশ পা চালিয়ে চলে গেলেন।
মোড়ে দাঁড়িয়ে একা একা হাসল শ্রীনাথ। কাজ হচ্ছে। কাজ হচ্ছে।
চোটে হেঁটে শ্রীনাথ স্টেশনের বিপরীত গঞ্জে পৌঁছে গেল সন্ধের ঘোর-ঘোর আঁধারে। রামাখনের ঝোপড়াটা সে কয়েকদিন হল চিনে রেখেছে দূর থেকে। কাজেই খুঁজতে হল না।
তবে রামলাখনের আড্ডাটা নিতান্তই ছোটলোকদের জন্য। উঠোনে গোটা চারেক ছাগল বাঁধা অবস্থায় মিহিন স্বরে ডাকছে মাঝে মাঝে। দড়ির জালে ঘেরা বারান্দার একধারে মুরগির পাল ডানা ঝাপটাচ্ছে। ছাগলের বোঁটকা গন্ধের সঙ্গে মুরগির চামসে গন্ধ মিশে বাতাস দূষিত।
