স্বপ্না একটু ত্রস্ত। খুব ব্যস্ত জরুরি গলায় বলে, ভাইয়ের মাথা ফেটে গেছে। তোমার ওষুধের বাক্সটা নিয়ে একবার আসবে?
মাথা ফেটে গেছে? কীভাবে?–বলে হিম হয়ে থাকে শ্রীনাথ। রক্ত সে একদম সইতে পারে।
বেজি নিয়ে খেলা দেখাচ্ছিল পাঠশালার মাঠে। বেজিটা পালিয়ে যাচ্ছিল, ভাই তাড়া করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে। ইটে মাথা লেগে কেটে গেছে।
তোর মা কোথায়?
মা বাড়ি নেই। ছোটমামাকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় গেছে সেই দুপুরবেলায়। ফিরতে রাত হবে। পিসেমশাইকে দেখতে যাবে বলে গেছে।
তৃষাকে ঘৃণা করলেও শ্রীনাথ জানে এসব অবস্থায় তৃষাই সবচেয়ে উপযুক্ত লোক। তার রক্ত সাপের মতো ঠান্ডা, কোনও বিপদে কখনও ঘাবড়ায় না।
আঁকুপাকু করে শ্রীনাথ উঠল বলল, খুব রক্ত পড়ছে নাকি?
খুব। ভেসে যাচ্ছে।
জ্ঞান ফিরেছে?
জ্ঞান ফিরবে কী? অজ্ঞান তো হয়নি। বরং হাসছে হি হি করে।
হাসছে?
ভাইকে তো চেনো না। গেছে বাঁদর একটা।
হাসছে শুনে খানিকটা ধাতস্থ হল শ্রীনাথ। একটা ফার্স্ট এইড বক্স বহুকাল ধরে এই ঘরে রাখা আছে। দাদা মল্লিনাথই কিনে রেখেছিল। ডেসকের লকার থেকে সেটা বের করে খুলে দেখল, ব্যান্ডেজ, কাঁচি থেকে ওষুধপত্র সব সাজিয়ে রাখা। দেখলেই কেমন লাগে। কেবল রক্ত, ক্ষত, যন্ত্রণার কাতর শব্দ মনে পড়ে। এইজন্যই না সে প্রীতমকে এতকাল দেখতে যায়নি!
বাক্সটা নিয়ে উঠল শ্রীনাথ, চল দেখি।
মায়াবশে স্বপ্না বলে, তোমাকে যেতে হবে না। বাক্সটা দাও।
পারবি?
ওমা, আমি তো ফাস্ট এইড জানি। মা’র ঘর তালাবন্ধ, নইলে ওঘরেও ফার্স্ট এইড বক্স ছিল।–বলে স্বপ্না বাক্স নিয়ে চলে গেল।
শ্রীনাথ বসে পড়ে। কিন্তু নিজের ভিতর এক অস্থিরতা বোধ করতে থাকে। একবার যাওয়া দরকার। তবে একটু পরে। আগে ওরা রক্ত-টক্ত মুছে ব্যান্ডেজটা বেঁধে ফেলুক।
ভিতরের কারখানাটা আবার ভীমবেগে চলতে শুরু করে। শ্রীনাথ বিড় বিড় করতে থাকে, মাগি। হারামজাদি! শুয়োরের বাচ্চা!
সন্ধে হয়ে আসতে শ্রীনাথ উঠে পড়ল। জামাকাপড় পরে ভিতরবাড়িতে এসে সজলকে দেখল। ব্যান্ডেজ বাঁধা মাথা নিয়ে শুয়ে শুয়েই মেকানো নিয়ে খেলছে। দেখেই বলল, বাবা দেখো, ঠিক হাওড়ার ব্রিজ হয়নি?
শ্রীনাথ আড়চোখে লোহার ছোট ছোট পাতে নাটবল্ট দিয়ে এঁটে তৈরি করা ব্রিজটা দেখে বলল, অনেকটা।
এই সেটটা দিয়ে ক্যান্টিলিভার ব্রিজ হয় না। তুমি আমাকে একটা বড় মেকানো কিনে দেবে?
দেওয়া যাবে।
আজই।
আজ কী করে হবে? ওসব তো কলকাতা ছাড়া পাওয়া যায় না।
তুমি কলকাতায় যাচ্ছো তো?
না। এখানেই একটু ঘুরে আসতে যাচ্ছি।
আমি যাব?
আজ নয়। সদ্য একটা ব্যথা পেয়েছ।
ব্যথা লাগেনি।
তোমার এ টি এস নেওয়া আছে?
হ্যাঁ।
তবু আজ আর না বেরোলেই ভাল।
তা হলে কী আনবে?
কী চাও?
কিছুমিছু এনো।–বলে সজল হি হি করে হাসে।
হাসছ কেন?
কিছুমিছু গল্পটা জানো না বাবা?
না।
নিতাইদা জানে। সওদাগর বাণিজ্যে যাচ্ছিল, সবাই সবকিছু আনতে বলল, শুধু ছোটবউ বলল, কিছুমিছু এনো।
সজল গল্প শুরু করছে দেখে শ্রীনাথ তাড়াতাড়ি বলে, গল্প পরে শুনব বাবা। তুমি এখন ঘুমোও।
সন্ধেবেলা কি ঘুম আসে? এখুনি মাস্টারমশাই আসবে যে।
আজ পড়বে?
পড়ব। আমার কিছু হয়নি।
চিন্তান্বিত মুখে শ্রীনাথ ছেলের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর বলে, তা হলে পড়ো। উঠে পড়ি বাবা?
উঠবে?–বলে আবার ভাবে শ্রীনাথ।
তুমি দিদিদের ডেকে বলে দাও যে, আমাকে ওঠার পারমিশন দিয়েছ। নইলে ওরা আমাকে জোর করে শুইয়ে রাখবে।
শ্রীনাথ ষড়যন্ত্রটা বুঝতে পারল। তবু ঘাড় নেড়ে বলল, ঠিক আছে।
তা হলে উঠি?
শরীর ভাল লাগলে ওঠো।
সজল উঠেই পড়েছিল। এখন এক লাফে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। হো হো হো’ বলে দু’হাত ওপরে তুলে চেঁচাতে চেঁচাতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল এক ছুটে।
শ্রীনাথ বেরিয়ে এসে দেখে স্বপ্না কোথা থেকে এসে সজলকে পাকড়াও করে ধমকাচ্ছে, শিগগির গিয়ে শুয়ে থাক। নইলে মা এলে বলে দেব।
শ্রীনাথ গম্ভীর গলায় বলল, ওর তেমন কিছু হয়নি। ছেড়ে দে। বসে বইটই পড়ুক, মন ভাল থাকবে।
শ্রীনাথ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। হাতে টর্চ। রামলাখনের ঘরে ফুর্তির আসরটা কী রকম তা একবার দেখে আসবে আজ। খুবই নোংরা অস্বাস্থ্যকর নিশ্চয়ই। তবে শ্রীনাথের আজকাল বাছাবাছির মন নেই। তা ছাড়া এখানকার বদমাশ শয়তানগুলোর সঙ্গে একটু মেলেমেশা করা বড় দরকার।
২৯. শ্রীনাথ বাড়ির ফটক পেরিয়ে
শ্রীনাথ বাড়ির ফটক পেরিয়ে রাস্তায় পা দিয়ে চারপাশে লক্ষ করল। দু-চারজন যাতায়াত করছে, কিন্তু চেনা মুখ নজরে পড়ল না। ধীরেসুস্থে স্টেশনের দিকে হাঁটতে থাকে সে।
সামনেই একটা তেমাথা মোড়। আর মোড় মানেই কিছু পানবিড়ি বা মুদির দোকান। কিছু লোক সমাগম। এখানে দু-চারটে চেনা মুখ নজরে পড়ল বটে, কিন্তু এদের সঙ্গে কথাবার্তার সম্পর্ক বড় একটা নেই শ্রীনাথের। রাস্তায় ঘাটে প্রায়ই দেখে, এই যা। তবে হরিশ কম্পাউন্ডার ধীরে ধীরে সাবধানে সাইকেল চালিয়ে মোড় পেরিয়ে বাজারের দিকে যাচ্ছিল। হরিশের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা নেই, তবে কথাবার্তা হয়। শ্রীনাথ হক মারল, হরিশবাবু যে!
হরিশ সাইকেলের ব্রেক চেপে ধরেও ঘষটাতে ঘষটাতে খানিক দূর চলে গিয়ে নামল। এ অঞ্চলে শ্রীনাথবাবু মানী লোক। তিনি ডাকলে থামতেই হয়, পথ-চলতি জবাব দিয়ে চলে যাওয়া যায় না।
হরিশ একগাল হেসে বলে, ভাল আছেন তো শ্রীনাথদা?
খারাপ কী? আপনাকে বহুকাল দেখি না।
