সংসারে বড় অভাব। আমি তো ওদের সংসারে কম দিন থেকে আসিনি।
অভাব হওয়ার তো কথা নয়। বুলু যা মাইনে পায় ওদের দু’জনের ভালভাবে চলবার কথা।
তবে চলে না কেন?
কঞ্জুসদের ওরকমই হয়। ওটা অভাব নয়, স্বভাব।
বুলু যে একটু কৃপণ তা দীননাথ জানেন। তবু কথাটা স্বীকার না করে মাথা নেড়ে বললেন, মিতব্যয়ী আর কী। তবে প্রয়োজন বুঝে খরচ করতে পিছছায় না।
শ্রীনাথ অন্যমনস্ক হয়ে দূরের দিকে চেয়ে ছিল। বলল, কষ্ট তো আমারও কিছু কম যায়নি একসময়ে। তখন বুলু ক’দিন খোঁজ করেছে?
দীননাথ আবার অপ্রতিভ হয়ে বললেন, ও খোঁজ করে কী করবে? ওর নিজেরই চলে না।
এ কথায় শ্রীনাথের মুখ বিকৃত হয়ে যায়। তীব্র বিরক্তির গলায় বলে, বুলুকে আপনি খুবই স্নেহ করেন, সেটা ভাল কথা। কিন্তু আপনার যে আরও দুটি ছেলে আছে সে কথাটা ভুলে যান কেন? এত একচোখোমি মোটেই ভাল নয়।
দীননাথ এ কথায় একেবারে বেহাল হয়ে গেলেন। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে নিজের ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, কথাটা ঠিক তা নয়। বুলুর কাছেই ছিলাম তো, তোমরা কেউ খোঁজ নিতে না।
বাজে কথা। শ্রীনাথ ধমক দিয়ে বলে, আমরা সবসময়েই আপনার খোঁজ নিতাম, টাকাও পাঠানো হত।
সে সবই শুনেছি।
তবে বলছেন কেন?
বলে কিছুক্ষণ আক্রোশভরে দীননাথের দিকে চেয়ে রইল শ্রীনাথ। তারপর হঠাৎ তার চোখ উদাস হয়ে গেল। মুখটা লাল হয়ে উঠেছিল, আস্তে আস্তে বিবর্ণ হয়ে গেল। খুবই উদাস গলায় বলল, বুলু বা দীপু যদি এখানে এসে থাকতে চায় অনায়াসেই থাকতে পারে। আমি বলার কে? এ সম্পত্তি কার তা কি আপনি জানেন না?
কেন, মল্লিনাথের।
শ্রীনাথ মৃদু ম্লান হাসি হাসল। বলল, আপনার ভীমরতি ধরেছে। এ সম্পত্তি আপনার বউমার।
দীননাথ তাতে হটে গেলেন না। দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, বউমার মানেই তো তোমার। স্ত্রীধনে স্বামীর পুরো অধিকার। তাছাড়া স্ত্রীলোকের আবার আলাদা সম্পত্তি হয় নাকি? আমি যদি একটা বাড়ি করতাম তবে তোমার মায়ের নামেই করতাম। সবাই আজকাল তাই করে।
শ্রীনাথ মাথা নেড়ে বলে, অন্যে কী করে তা দিয়ে আমার কী? আপনার বউমার সম্পত্তি আমি নিজের সম্পত্তি বলে মনে করি না।
দীননাথ একটু অবাক হয়ে বলেন, বউমা তো চমৎকার মেয়ে। আমার জন্য ছাগল পর্যন্ত কিনেছে। তোমার সঙ্গে তার বনিবনা হয় না কেন?
শ্রীনাথ বাবার দিকে অবাক হয়ে তাকাল। বলল, ছাগল কিনেছে?
শুধু তাই? দু’বেলা ডাক্তার আসছে। চমৎকার সব খাওয়াদাওয়া। আমার তো দশ বছর বয়স কমে গেছে।
শ্রীনাথ চুপ করে রইল।
দীননাথ বললেন, তুমি বরং বউমাকে একটু বলে দেখো। তুমি বললে বউমা দীপু আর বুলুকে এখানে আনতে অরাজি হবে না।
আপনার বউমা আমার কথায় চলেন না। আপনিই বলুন, তবে এটা জেনে রাখবেন, এ সম্পত্তিতে আমার অধিকার নেই। আমি অধিকার ফলাতেও চাই না।
বড় ভাইয়ের সম্পত্তিতে সকলের অধিকার আছে। মেয়েমানুষ যত ভালই হোক তাকে মাথায় উঠতে দিতে নেই।
বিরক্ত হয়ে শ্রীনাথ বলে, যা বোঝেন না তা নিয়ে কথা বলেন কেন? বউমা আপনার সেবা-যত্ন করছে, সে খুব ভাল কথা। আরামে থাকুন। খামোখা সংসারের পলিটিকসে মাথা দিতে যাবেন না। তা হলে আর বেশি দিন আরামে থাকতে হবে না। আপনার ভালর জন্যই বলছি। এখন আপনি যান, আমার কাজ আছে।
দীননাথ ম্লানমুখে উঠে পড়েন। তিন ছেলে এক জায়গায় থাকবে, তার এই স্বপ্নটা হয়তো কোনওদিন সত্য হবে না। ছেলেদের মধ্যে মিল নেই। তবু বউমাকে একবার বলে দেখবেন। বউমা বিবেচক।
গাছপালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে ধীরে ধীরে দীননাথ চলে যাচ্ছেন, এই দৃশ্যটা খানিকক্ষণ দাওয়ায় বসে দেখল শ্রীনাথ। তারপর ঘরে এসে হেলানো চেয়ারটায় বসল। জীবনে কোথাও কোনও শান্তি নেই। মদ মেয়েমানুষ রেস খেলা কিছুতেই সে কোনও আনন্দ পায় না আজকাল। মনটা বিষাক্ত, বিরক্ত, ক্ষিপ্ত। মাথার মধ্যে পাগল-পাগল ভাব।
বহুক্ষণ চোখ বুজে ভিতরকার যন্ত্রণাটা অনুভব করে শ্রীনাথ। ভিতরে যেন একটা অর্থহীন পাগল কারখানা চলছে। বিপুল রোলার, পিনিয়ন শ্যাফট চলছে ঘুরছে শব্দ করছে, কিন্তু কিছুই তৈরি হচ্ছে না। একা হলেই নিজের ভিতরে এই পাগলা কারখানার কান্ড টের পায় সে। বহুকাল হল সে কোনও সৎ চিন্তা করে না, সৌন্দর্য উপভোগ করে না।
খুব তলিয়ে ভাবলে অবশ্য একটা কথা স্বীকার করতে হয়। এই যন্ত্রণাটাকে সে উপভোগ করে। এই বিষ থেকেই একটা নেশার আমেজ উঠে এসে তার মন আর মগজকে আচ্ছন্ন করে রাখে। একরকমের মৌতাত। তখন সে বাইরের পৃথিবীর কিছুই লক্ষ করে না, আপনমনে বিড় বিড় করে নানা কথা বলতে থাকে। কান পেতে শুনলে শোনে, বিড় বিড় করে সে যা বলে সেগুলো কুৎসিত অশ্লীল সব গালাগাল এবং আক্রোশের কথা। আর তার সমস্ত আক্রোশ ক্রমে ক্রমে জড়ো হয়েছে। এক জায়গায়। সেই জায়গাটার নাম তৃষা। তাই চোখ বুজলেই সে তৃষাকেই দেখতে পায়।
বাবা!–আচমকা ডাকে খুব চমকে উঠল সে।
কে রে?
আমি। আমি স্বপ্ন।–বলে স্বপ্নলেখা ঘরে আসে।
কত লম্বা হয়েছে স্বপ্ন। বহুকাল বাদে দেখল নাকি নিজের ছোট মেয়েটাকে! মুখের আদলটাও একটু বদলে গেছে। নিজের মুখের সুস্পষ্ট ছাপ মেয়ের মুখে দেখতে পায় শ্রীনাথ। এ মেয়ে দিনেকালে চিত্রার মতোই সুন্দর হবে।
মেয়েকে দেখে মনটা সামান্য নরম হল। গলার তেতো ভাব যতদূর সম্ভব কমিয়ে রেখে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, কী চাস?
