বিকেলের দিকে বাড়িটা হাঁ-হাঁ করছে ফাঁকা। উঠোনটা জনমনিষ্যিহীন পড়ে আছে। ঘুরে ঘুরে হিসেবি চোখে দেখেন দীননাথ। ছোঢ় শয়তান বুলুটা মিছে কথা বলে না। মল্লি বেশ বড় সম্পত্তিই করেছিল। অনেকখানি জায়গা নিয়ে বাড়ি। কোনও কিছুরই অভাব নেই। উপচে পড়ছে। দেখে বুকের মধ্যে একটু ধাক্কা লাগে। তার আর-ছেলেরা কেউই তেমন কৃতী নয়। সকলেরই টানাটানি। ওরা যদি সবাই মিলে এই জায়গাটায় থাকতে পারত। ভেবে দীর্ঘশ্বাস পড়ে। হবে না। ওদের কারও সঙ্গে কারও মিল নেই।
উঠোনের পশ্চিমধারে এসে একটা ছাগলের ‘ম্যা’ শুনে দাঁড়ালেন দীননাথ। বাগানে ছাগল ঢোকেনি তো! পশ্চিমধারে একটা বাঁশের আগড়। সেটা ঠেলে উঁকি মারতেই দেখেন, একটা পুরুষ্ট ছাগল ঠ্যাং ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আর মংলু পেতলের মালসায় চড়াং চড়াং করে তার দুধ দুইছে।
ছাগলের দুধ কে খায় রে?
শুনে মংলু হাসে, আপনিই তো খান, আর কে খাবে?
ও বাবা, আমাকে বউমা রোজ ছাগলের দুধ দেয় বুঝি?
হ্যাঁ তো। ডাক্তার আপনাকে ছাগলের দুধ খেতে বলে গেছে না! মা ঠাকােন তাই ছাগলটা কিনে আনালেন।
দীননাথ হাঁ করে থাকেন। তাঁকে দুধ খাওয়ানোর জন্য বউমা ছাগল কিনেছে? এ যে ভাবা যায়। বলতে কী, এই বুড়ো বয়সে বেঁচে আছেন বলেই মাঝে মাঝে তার লজ্জা করে। যত্ন-আত্তি খাতিরের কথা মনেও আসে না। এ যে আজকাল নিজের মেয়েও করে না।
ছাগল দোয়ানো দেখতে দেখতে চোখে প্রায় জল এসে গেল। দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দৃশ্যটা দেখলেন। মালসা ভরে উঠল দুধে, দীননাথের মনটাও ভরে গেল। দুনিয়াতে একটু আদর ছাড়া আর তাঁর কিছু চাওয়ার নেই।
ফিরে এসে বউমার ঘরের দাওয়ার সিঁড়িতে উঠে ডাকলেন, বউমা! ও মেজো বউমা!
ঘরে কেউ নেই। শ্রীনাথের তিন মেয়ের নাম ওদের ঠাকুমাই রেখে গেছেন রমলা, বিমলা আর কমলা। সে নাম অবশ্য আজ আর টিকে নেই। শুধু দীননাথই আজও ওদের এই নামে ডাকেন। রমলা এখানে থাকে না। তার এক মাসি তাকে দত্তক নিয়েছে। বিমলা আর কমলাকে বড় একটা দেখতে পান না দীননাথ। এখন দেখলে, মেজো বিমলা লাল একটা শাড়ি পরে খুব পাকা মেয়ের মতো সেজে এলোচুল খোপায় বাঁধতে বাঁধতে উঠোন পেরিয়ে কোথায় যাচ্ছে।
দীননাথ ডাকলেন, বিমলি।
কী দাদু?
কোথায় যাস?
কোথায় যাব? বাড়ির মধ্যেই।
তোর মা কোথায়?
মা বেরিয়েছে। কিছু লাগবে?
না, কী আর লাগবে।
তবে? কথা বলার লোক পাচ্ছি না বুঝি?
দীননাথ হেসে বলেন, তো তুই-ই আয় না, দুটো প্রাণের কথা বলি বসে বসে।
পাঠশালার মাঠে আমার বন্ধুরা বসে আছে যে।
তবে যা।
তুমি গিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলো না! বাবা ফিরেছে।
ফিরেছে? যাক।
বলে উঠলেন দীননাথ। লাঠিতে ভর দিয়ে বেশ ভালই হাঁটতে পারছেন। কাউকে না ধরে, কারও সাহায্য না নিয়ে পৌঁছে গেলেন ভাবন-ঘরে।
শ্রীনাথ একটু দূরের ছেলে। দীননাথ এমনিতেই ছেলেদের সমীহ করেন, শ্রীনাথকে আরও একটু। ছোট ছেলে ছাড়া আর কাউকে তুই-তোকারি করেন না। বাইরে দাঁড়িয়ে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে সাবধানে ডাকলেন, শ্রীনাথ, আছে নাকি?
ভিতর থেকে গম্ভীর গলা এল, কে?
আমি দীননাথ।
শ্রীনাথ দরজায় এসে দাঁড়াল। খালি গা, পরনে একটা সবুজ লুঙ্গি। টকটক করছে ফর্সা রং। চুলগুলো এলোমেলো। চোখের নীচে একটু বসা ভাব, একটু কালচেও। ঠোঁট দুটো কেমন যেন ঢিলে হয়ে ফাঁক হয়ে আছে। শরীরের বাঁধুনি নেই। এক সময়ে খুবই সুপুরুষ ছিল শ্রীনাথ। এখনও আছে। বোধহয় এখন একটু বয়সের ছাপই পড়েছে চেহারায়।
শ্রীনাথ একটু অবাক এবং বিরক্ত হয়েছে। বলল, আপনি একা একা এতদূর এলেন কেন?
দীননাথ অপ্রতিভ হয়ে হাসলেন। বললেন, আজকাল একটু হাঁটতে-টাটতে পারি। বউমার কাছে এসে বেশ ভাল আছি। কত সেবা-যত্ন।
বলে বড় বড় চোখ করে ছেলের দিকে চাইলেন দীননাথ। কিন্তু শ্রীনাথ খুশি হয়েছে বলে মনে হল না, বরং বিরক্তিটা স্পষ্ট প্রকাশ পেল। বলল, তবু একা একা এতদূরে এসে ভাল করেননি।
দীননাথ ম্লান হয়ে বললেন, ভাবলাম অনেকদিন তোমার সঙ্গে দেখা হয় না। তুমি তো রাত করে ফেরো, আমি তখন ঘুমিয়ে পড়ি।
বিরক্ত শ্রীনাথ বলল, দেখা করার কী আছে?
তোমার শরীরটা কি ভাল নেই? আজ তাড়াতাড়ি ফিরলে যে।
না, শরীর ভালই আছে।
দীননাথ ঘরে ঢুকতে সাহস পেলেন না। অনেকটা হেঁটে এসে একটু কাহিল হয়ে পড়েছেন। লাঠিটা পাশে রেখে বড় একটা শ্বাস ছেড়ে ছেলের মন রাখার জন্য বললেন, অফিসে নাকি তোমার খুব নামডাক। খাটুনিও তাই বোধ হয় বেশি। নামডাক হলেই খাটুনি বাড়ে।
শ্রীনাথ ঠোঁট ফাঁক করে অসহায় বিরক্তি নিয়ে বাবার দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, চলুন আপনাকে রেখে আসি।
তোমাকে যেতে হবে না। আমি একাই পারব। একটু টা নিয়ে নিই।
অনিচ্ছের গলায় তখন শ্রীনাথ বলে, শানে বসছেন কেন? দাঁড়ান চেয়ার এনে দিই।
হাত তুলে দীননাথ বলেন, তার দরকার নেই। এই ভাল। বলছিলাম কি বউমার ব্যবস্থা তো খুবই সুন্দর, চারদিকে লক্ষ্মী শ্ৰী। একটু আগে বসে বসে ভাবছিলাম, এই জায়গায় তোমরা তিন ভাই যদি একসঙ্গে থাকতে পারতো।
শ্রীনাথ কথাটার জবাব দিল না। তবে অনেকটা দূরত্ব রেখে সেও বারান্দার শানে বসল উবু হয়ে।
দীননাথ আপন মনেই বললেন, এখানে হাঁস, মুরগি, গোরু, ছাগল, সবজি কত কী! অপর্যাপ্ত। বুটার কথা ভাবি। বড় কষ্টে আছে। সবাই মিলেমিশে থাকলে কারও তেমন কষ্ট থাকবে না।
শ্রীনাথ গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে, বুলুর কষ্ট কিসের?
