রামলাখন বিদেয় হতেই সাবধানে চারপাশটা দেখে নিয়ে সজল এক দৌড়ে বেজির খাঁচা নিয়ে ভাবন-ঘরে পৌঁছে গেল। তালা খুলে ভিতরে ঢুকে সে দরজায় খিল তুলে দেয়।
ভাবন-ঘরের পিছন দিকে একটা দরদালানের মতো ঢাকা বারান্দা আছে। খুব বড় নয়, বরং খুবই ছোট। চারদিকে ঘষা কাচ বসানো জানালা। এ ঘরে কেউ কখনও আসে না। একটা অদ্ভুত ঢালু টেবিল আছে। এটাতে নাকি ড্রইং-বোর্ড রেখে জেঠু নানা আঁকজোঁক করত। ইঞ্জিনিয়ারদের ওরকম করতে হয়। এ ঘরে পুরু ধুলোর আস্তরণ পড়েছে, মাকড়সা জাল বুনেছে, ঘুলঘুলিতে চড়াই পাখি বাসা করেছে।
টেবিলের তলায় খাঁচাটা রেখে সজল ভাবতে লাগল, বেজিরা কী খায়?
ভেবে পেল না। তবে বাড়ি থেকে একটু বাদে গিয়ে কয়েকটা ছোলা, এক বাটি জল, কিছু চাল এনে খাঁচার মধ্যে ছড়িয়ে রেখে গেল। যেটা মন চায় খাবে। বিকেলে চিনেবাদাম কিনে এনে দেবে। মংলুকে বললে কাঁচা মাংসেরও ব্যবস্থা হবে। বাবা এলে জেনে নেবে বেজিরা কী খায়।
ভাবন-ঘরে ফের তালা দিয়ে বেরোচ্ছে, শুনতে পেল ঝোপড়ার দিক থেকে নিতাইখ্যাপা চেঁচাচ্ছে, জয় কালী, কালীশ্বরী, মহাবিদ্যা, প্রলয়ংকরী। মা। মা গো।
তাকে দেখেই নিতাই হাতছানি দিয়ে ডাকল।
মুখখানা নিপাট ভালমানুষের মতো করে এগোয় সজল।
কোথায় ছিলে সজলখোকা? কত কাণ্ড হয়ে গেল, দেখলে না?
কী কাণ্ড?
হি হি করে খুব হাসে নিতাই। তারপর গলা নামিয়ে চোখ ছোট করে খুব ষড়যন্ত্রের গলায় বলে, বাজারে পেয়ে ব্যাটা খুব ধরেছিল আমাকে। মা প্রলয়ংকরী এসে বাঁচায়।
কে ধরেছিল?
রামলাখন। ব্যাটা সাতদিনের মধ্যে মুখে রক্ত উঠে মরবে। বাণ মেরে দিয়েছি, কাজও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু মায়ের কী লীলা বলো তো? আমাকে বাঁচাতে মা বেজিটা হাপিস করে দিল বটে, কিন্তু সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও শালাটাকে আর দেখতে পাচ্ছি না।
বেজি? কত বড় বেজি?
নিতাই চোখ কুঁচকে সজলের দিকে অনেকক্ষণ দেখে নিয়ে বলে, তোমার কাণ্ড নয় তো?
মাইরি না। চোখের দিব্যি।
আহা, বেজিটা তো তোমার জন্যই আনা। ব্যাটা দেহাতি কী মর্ম বুঝবে অবোলা জীবের?
পেলে আমাকে দিয়ে। আমার খুব বেজি পোষার শখ।
মুখটা একটু ম্লান হয় নিতাইখ্যাপার। আনমনে দূরের দিকে চেয়ে বলে, মা কত মায়াই না জানে। বেজিটা যে হাওয়া হয়ে গেল আর রূপ ধরল না। মেহনতটাই বৃথা।
তুমি বেজিটা চুরি করেছিলে নিতাইদা?
চুরি আবার কী? অবোলা জীবটাকে উদ্ধার করেছিলাম। তা মায়ের জীব মা নিজেই নিয়েছে। ভারী আশ্চর্য কাণ্ড। জলজ্যান্ত ঘরে রেখে গেলাম।
দুপুর পেরিয়ে গেল নিতাইদা, খাবে না?
আনমনে একটু হুঁ দিয়ে নিতাই মাটিতে একটা কাঠি দিয়ে আঁকিবুকি কাটতে থাকে।
সজল সরে আসে। বেজিটা কিছুদিন এখন লুকোনো থাক।
উঠোনের পুবধারে মস্ত নিমগাছের ঝিরঝিরে ছায়ায় ইজিচেয়ার পেতে বসে দীননাথ হোমিয়োপ্যাথ হরিপদ রায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একসময় বলেই ফেললেন, তোমার ওষুধ সত্যিই কথা কয় হে।
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় হরিপদর মুখ একটু উজ্জ্বল হয়। মুখখানা এমনিতে শুকনো আর ভাঙা, রসকষ নেই, সর্বদাই চিন্তায় ভারাক্রান্ত। বলল, আগে তো বিশ্বাস করতেন না! রস
তোমার ওষুধের গুণও আছে, এ বাড়ির ভাল খাওয়াদাওয়া, সেবা যত্ন আছে। বউমার ব্যবস্থা সব খুব ভাল।
সে তো আছেই। কিন্তু খেলেই তো হবে না, হজম করবে কে?
সেও ঠিক। ছোট ছেলের কাছে যখন ছিলাম তখন মনে হত, বয়স বুঝি আশি-নব্বই কি শতেক পার হয়েছে। একটু ভীমরতিও যেন ধরেছিল। হাঁটতে চলতে পারতাম না নিজের জোরে।
আর এখন?
দেখছই তো, ওই ঘর থেকে একা এতদূর চলে এসেছি।
আস্তে আস্তে আরও পারবেন। আমি আপনাকে একদম ছোকরা বানিয়ে দেব।
দীননাথ হাসলেন। বেঁচে থাকতে একটা আলাদা স্বাদ পাচ্ছেন। বললেন, ওষুধ তো ভালই দাও, তবে আমার দাদুভাইয়ের কৃমি সারে না কেন?
সজলের কৃমি জন্মেও সারবে না। শুধু ওষুধ দিলে কী হবে? পথ্য কন্ট্রোল করবে কে? সারাদিন কুপথ্য করছে।
দীননাথ গম্ভীর মুখে খানিক ভেবে বললেন, আমার চার ছেলের মধ্যে বড় জন নেই, সেজো বিয়ে করবে কি না জানি না। ঘোটরও ছেলেপুলে হবে শুনছি, কিন্তু মেয়ে হলেই বা ঠেকায় কে? এখন পর্যন্ত বংশে বাতি দিতে ওই একমাত্র নাতি। তুমি খুব মন দিয়ে ওর চিকিৎসা করোত?
ওষুধ তো দিই। প্রায়ই খায় না, ভুলে যায়।
এখন থেকে আমি খেয়াল রাখব। আজকাল আর ততটা ভুলে যাই না।—বলে দীননাথ লাজুক মুখে হাসেন।
সজলের জন্য ভাববেন না। আমার চিকিৎসাতেই বড় হল। তবে মাঝে মাঝে অ্যালোপ্যাথিরও বিষ ঢুকেছে কিনা।
হরিপদ চলে যেতে দীননাথ গ্রীষ্মের বিকেলে এই নরম ছায়ায় বসে বসে সোমনাথের কথা ভাবতে লাগলেন। মেজো বউমা যত্ন করে বটে, এ বাড়ির পরিবেশও ভাল। তবু কেন যেন ছোট বউমার জন্য, ছোট ছেলের জন্য আর কলকাতার অন্ধকার সেই একতলা বাসাবাড়ির জন্য বড় মন কেমন করে। এখানে এসে অবধি শ্রীনাথের সঙ্গে ভাল করে দেখাই হয়নি। খুব পর মানুষের মতো। থাকে। ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু চিন্তাশক্তি এখন আর তেমন জোরালো নয় বলে ভেবেও কিছু ঠিক করতে পারছেন না।
আজকাল ঘরে, বারান্দায়, উঠোনে টুকুস টুকুস করে হাঁটতে পারেন। আগে পারতেন না। মেজো বউমা অবশ্য বলে, হাঁটতে ঠিকই পারতেন, কেবল মনে জোর ছিল না। ভাবতেন, হাঁটতে গেলেই পড়ে যাব বুঝি। মেজো বউমার বুদ্ধি খুব সাফ। ঠিকই বুঝেছিল। একা বসে মাথায় দুশ্চিন্তা আসছিল বলে দীননাথ উঠে পড়লেন। বাচ্চা ছেলের যেমন নতুন হাটতে শিখে হাঁটার নেশায় পায়, তারও হয়েছে তেমনি।
