আর তুমি?
আমি পারব। একভাবে না পারি অন্যভাবে পারব।
অন্যভাবে কীরকম বাবা?
সে তুমি বুঝবে না। তবে আমি যখন থাকব না তখন এই খোলামেলা ঘরখানায় তুমি এসে থেকে। আমার বাগানটা দেখো। বাগান করা খুব ভাল। প্রকৃতির মতো এমন শিক্ষক আর নেই।
বাবার কথাগুলো একটু অদ্ভুত লাগে বটে, কিন্তু বাবা বরাবরই একটু এ রকমই তো। সজল তাই বাবাকে নিয়ে বেশি ভাবে না। তবে ঘরখানা তার খুব ভাল লাগে। সুযোগ পেলেই এসে হানা দেয়। হাঁটকায়।
সেদিন সকালের পড়া থেকে ছুটি পেয়েই চলে এল বাবার ঘরে। গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। অগাধ অফুরন্ত দুপুর সামনে। বাবার ঘর থেকে ক্ষুরটা গোপনে নিয়ে বেরিয়ে এল সজল। বিশাল বাগানের এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে চলে এল নিতাইয়ের ঘরে।
সামনে ঝিম মেরে ঘুমোচ্ছে ইস্পাত। ঝোপড়ার দরজাটা বন্ধ। ঠেলতেই ঝাঁপের দরজা খুলে যায়।
নিতাইদা আছো?
নেই। তবে একটা অদ্ভুত জিনিস রয়েছে। পাখির খাঁচায় ছোট্ট একটা বেজি।
সজল খাঁচার গায়ে হাতের চাপড় দিতেই বেজিটা এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। বেজি সাপ মারে শুনেছে সজল। কখনও দেখেনি। সে খাঁচাটা দোলাতে থাকে। এখন একটা সাপ এনে খাঁচাটার মধ্যে ছেড়ে দিলে দারুণ হত।
ভাবতে ভাবতেই ফটকের দিকে একটা গোলমাল শুনতে পেল সজল।
ছোটমামা কাকে যেন মারতে মারতে আর গালাগাল দিতে দিতে টেনে আনছে। বলছে, চল শালা, তোর বেজি যদি খুঁজে না পাস তবে পুঁতে ফেলব।
দরজায় দাঁড়িয়ে সজল দেখল। লোকটা রামলাখন। মামা খুব মারছে রামলাখনকে। চেন দিয়ে গলাটা পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে এক হাতে। মামার গায়ে দারুণ জোর। দেখে একটু খুশির হাসি হাসে সে। গায়ের রক্ত ছলাত-ছলাত করে।
বেজির ব্যাপারটা বুঝতে তার এক পলকও লাগেনি। চকিতে ঘরে ঢুকে খাচাটা নিয়ে সে বেরিয়ে আসে। তারপর অজস্র ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঢুকে যায়।
২৮. আড়াল থেকে দেখতে পাচ্ছিল সজল
আড়াল থেকে দেখতে পাচ্ছিল সজল, রামলাখনকে ছোটমামা ঘাড় ধরে এনে ধাক্কা দিয়ে নিতাই খ্যাপার ঝোপড়ায় ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, বার কর তোর বেজি। বার কর!
রামলাখনের অবস্থা খুবই সঙ্গিন। মুখটা ভাবাচ্যাকা খেয়ে আছে। কাঁদো-কাদো ভাব। আবার রাগও থমথম করছে। কিন্তু শক্ত পাল্লায় পড়ায় কিছু করতে পারছে না।
ছোটমামার সঙ্গে যদি কোনওদিন সেজোকাকার ফাইট হয় তবে কে জিতবে তা এখন ভেবে ঠিক করতে পারছে না সজল। তার মন চায় সেজোকাকাই জিতুক। কিন্তু তা কি হবে? ছোটমামার গায়ের জোর ভীষণ, সাহসও সাংঘাতিক। এই তো মাত্র কয়েক মাস হল এ জায়গায় এসেছে, এর মধ্যেই তাকে সবাই ভয় খায়। তবু যদি কোনওদিন ফাইট লাগে, আর সজলকে যদি রেফারি করা হয় তবে সজল সেজোকাকুকেই জিতিয়ে দেবে।
রামলাখন ঝোপড়া থেকে ম্লান মুখে বেরিয়ে এল। সজল জানে, ঘরে বেজিটা পেয়ে গেলেও রামলাখনের লাভ হত না। ছোটমামা অত কাঁচা ছেলে নয়। সঙ্গে সঙ্গে বলত, ওটা তো আমাদের বেজি। পরশুদিনই গণি মিয়ার কাছ থেকে কিনেছি। তোর বেজি কই?
এসব সজলের জানা। বেশ কিছুদিন আগে শীতলাবাবুদের ময়না পাখিটা খাঁচা খোলা পেয়ে উড়ে পালায়। কিন্তু খাচায় থেকে থেকে ডানার জোর ছিল না বলে খানিক উড়ে এসে তাদের বড় ঘরের বারান্দায় চুপ করে বসে ছিল। বৃন্দা সেটাকে ধামাচাপা দিয়ে ধরে। পরে খবর পেয়ে শীতলাবাবুর মেয়ে টুটু যখন খোঁজ করতে এল তখন পাখিটা নতুন বড় একটা খাচায় নিতাইখ্যাপার পাখিটার পাশে দোল খাচ্ছে।
টুটু বলল, ও মা! এই তো আমাদের ময়না।
বৃন্দা অবাক হয়ে বলে, তাই নাকি? তা সে তোমরা গণি মিয়ার সঙ্গে বোঝো গে যাও। নগদ পচিশ টাকায় কালই তো বড়দিমণি কিনলেন।
ডাহা মিথ্যে। পরে শীতলাবাবুর বাড়িসন্ধু মেয়ে-মদ্দায় এলে সে কী কাউ কাউ করে ঝগড়া! জবাবে মা কিছুই বলল না। বৃন্দাকে এগিয়ে দিল। বৃন্দা একাই গলার জোরে সবাইকে হঠিয়ে দিয়েছিল।
গণি মিঞা মাঝে মাঝে পাখি বেচতে আসে। মা’র সঙ্গে তার একটা বন্দোবস্ত আছে। মা যা বলাবে সে তাই বলবে। কাজেই বৃন্দার ভয় ছিল না। তবু শীতলাবাবুদের পাখিটাকে ধরে রাখার একটা অন্য কারণও ছিল। কোন কালে যেন জেঠুর সঙ্গে জমি নিয়ে তাদের মামলা হয়। সেই রাগে জেঠুর তিনটে গোরুর একটাকে শীলাবাবু তার চাকরকে দিয়ে বিষ খাইয়ে মারে। গাভিন গাইটা সন্ধের মুখে বাড়ির উঠোনে দাপিয়ে মরল। গোরুর ডাক্তার এসে বলল, এ তো ক্লিয়ার পয়জনিং কেস। মা তবু ময়নাটাকে মারেনি। কেউ কেউ অবশ্য বলে যে, শীতলাবাবুদের ময়নাটা আসলে নিজে উড়ে আসেনি, নিতাই পাগলই সেটাকে চুরি করে আনে।
সত্যি মিথ্যে কে জানে!
তবে রামলাখন ব্যাটা এখন হাতজোড় করে ছোটমামার কাছে বোধহয় ক্ষমাই চাইছে। পুকুরপাড়ের ঝোপঝাড়ে গা ঢাকা দিয়ে বসে সজল সব দেখতে পাচ্ছিল। তার হাতের খাঁচায় বেজি।
হেলেদুলে নিতাই খ্যাপা এসে দাঁড়িয়ে হাত তুলে বলল, জয় কালী কলকাত্তাওয়ালি। নখদর্পণ জানিস ব্যাটা?
রামলাখন কী একটা তেজি জবাব দিল তার কথার।
নিতাই নেচে উঠে বলল, শাস্তর মন্তর জানলে তো মর্ম বুঝবি! পাঁচটা টাকা নিয়ে অমাবস্যায় আসিস, গুনে বলে দেব তোর বেজি কোথায় আছে।বলে খুব হাসতে থাকে বাহাদুরির হাসি।
ছোটমামা অবশ্য আর বাড়াবাড়ি করল না। বাগানের কাজ করার জন্য যেসব ফুরনের লোক হামেশা কাজ করে তাদের একজনকে ডেকে বলল, এটাকে লাইন পার করে দিয়ে আয় গে। এসে আমাকে খবর দিস।
