দুপুরের দিকে বাজারটা ফাঁকা-ফাঁকা। তারই ভিতর থেকে হঠাৎ একটা কালোপানা লোক ধা করে বেরিয়ে এল। নিতাই মাতব্বরিতে ব্যস্ত ছিল বলে দেখতে পায়নি। লোকটা এসে রক্তাম্বরখানা গলার কাছটায় চেপে ধরতেই নিতাই চেতন হয়ে দেখল, রামলাখন।
এই শালা, কাল আমার ঘরে সিঁধ দিয়েছিল কে?
তোর বাবা।—বলে চোখ বুজে রইল নিতাই। নিশ্চিন্তে। কারণ, সেই মুহূর্তে সে বাজারের ও প্রান্ত থেকে একটা ভটভটিয়া আসার শব্দ পেল। সময় মতোই আসছে।
শালা, এইখানে আজই তোর লাশ নামিয়ে দিয়ে যাব।
নিতাই চোখ বন্ধ কবে গম্ভীর গলাতেই বলল, পিপড়ের পাখা ওঠে কখন জানিস? মরার সময়। ঘোর কলি, ঘোর কলি। নইলে মাতাল বদমাশবা সাধুসন্নিসির গায়ে হাত তোলে?
একটা খিস্তি দিয়ে রামলাখন বলে, পুলিশে সকালবেলায় খবর করেছি। কিন্তু তোক পুলিশে দেব না। নিজের হাতে বানাব।
ভটভটিয়াটা ত্রয়ীর সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। কলের লাইন ভেঙে লোকে মারপিট দেখতে জুটে গেছে চারধারে।
নিতাই চোখ খুলে চারদিকটা দেখে নিয়ে খুশি হল। লোকজন না জুটলে খেল কিসের? ঠান্ডা গলায় বলল, তিনদিনের মধ্যে গলায় রক্ত উঠে মরবি। যা, বাণ মেরে দিলাম। ঠিক আছে। বাণের মোকাবিলা করে নেব। এখন বল, বেজিটা কোথায়? তার আমি কী জানি?
তুই জানিস না তো কে জানে? তোর বাপ জানে। বল।—বলে রামলাখন একটা ঠুসো দিল পেটে।
ককিয়ে উঠে নিতাই বলে, বাপ জানে সে আমার বাপের কাছেই যা না। আমার বাপ কোথায় আছে জানিস? ভূত হয়ে মাদারপাড়ার বাঁশবনে দোল খায়। তোকেও সেখানে পাঠাব। আর তো মোটে তিনদিন।
চড়াক করে একটা চড় পড়ল গালে। মাথাটা ঘুরে গেল একটু। গাঁজার নেশা থাকলে একটু দুধ দরকার হয়। নইলে শরীরে কিছু থাকে না। বুধিয়ার মায়ের কাছ থেকে একপো করে নিলে কেমন হয়? বদলে মন্তর দেবে ওদের। রাজি হবে না?
নিতাই বিড়বিড় করে বলে, তুই মরবি। তোর বংশ ঝেডেপুছে সাফ হবে। ছেরাদ্দ হবে না, পিণ্ডি পড়বে না।
মলমটা ঠেলা ধাক্কায় হাতের মধ্যেই ভচকে গেছে। হাতময় আঠা। এই অবস্থাতেও সাবধানে হাতটা তুলে মাথার ঘায়ে মলম ঘষতে ঘষতে সে হঠাৎ চেঁচায়, বোম কালী, গোলে বকাবলী। জয়
মা! শেষ করে দে, ফিনিশ করে দে, রক্ত দিয়ে চান কর মা! মা গো!
সরিৎবাবু বড় দেরি করছে। আবার চোখ বুজে ফেলে নিতাই। চোখের নজর লুকোনোটা ভাল অভ্যাস। তারাপীঠের এক সাধু তাকে কায়দাটা শিখিয়েছিল। বলেছিল, পাপ-তাপ করল লোককে চোখের দিকে তাকাতে দিয়ো না। চোখে সব ভেসে ওঠে। ধরা পড়ে যাবে। চোখ বুজে থেকো, মেজাজটা ঠান্ডা রেখো। বিপদ কেটে যাবে। সেই উপদেশটা আজ কাজে লাগিয়ে দিল।
ভিড়ের ওপাশে রাস্তার ধারে সরিৎ তার মোপেড় থামিয়েছে, দোকানের কর্মচারীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। গোলমাল দেখে ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ কোঁচকাল।
কী হচ্ছে রে ওখানে?
দোকানের ছোকরা কর্মচারী শম্ভু বলে, খ্যাপা নিতাইকে রামলাখন ধরেছে। বেজি না কী চুরি করেছে বুঝি।
রামলাখনটা কে?
সে ওই লাইনের ওধারে ঝোপড়ায় থাকে। মহা বদমাশ।
সরিৎ একবার ভাবল, ঝামেলায় জড়াবে না। সেজদি আবার কী না কী বলে।
কিন্তু রামলাখন নামে লোকটা খুব গলা তুলছে। দু-চার ঘা ঝাড়লও। সরিতের রক্তটা একটু চনমনে হয়ে ওঠে। নিতাই চোর-ছ্যাঁচড় যা-ই হোক, সে চাটুজ্জেবাড়ির আশ্রিত। তার ওপর বাজারি মার পড়লে দিদিরও অপমান।
সরিৎ মোপেড় থেকে নেমে রাস্তাটা চকিত পায়ে পার হল।
বাবা আজকাল তাকে ঘরের চাবি দিয়ে যায়। আগের মতো বাবা আর রাগী নেই। না, কথাটা ভুল হল। বাবা এখন বরং আগের চেয়ে আরও বেশি রাগী হয়ে গেছে। কিন্তু সজলের ওপর বাবা আজকাল একদম রাগে না।
বাবার ঘরে ঢুকে সজল আজকাল ইচ্ছেমতো জিনিসপত্র হাঁটকায়। বাবা কিছু বলে না। মাঝে মাঝে বলে, আমি যখন থাকব না তখন তুমি এ ঘরটায় থেকো।
তুমি কোথায় যাবে?
কোথাও চলে যাব।
কেন?
এখানে ভাল লাগে না।
আমারও লাগে না। আমাকে রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে পাঠাবে?
সে তোমার মা জানে।
মাকে তুমি বলো না!
কেন হোস্টেলে যেতে চাও?
হোস্টেলে অনেক বন্ধু পাব।
কেন, এখানেও তো তোমার অনেক বন্ধু। পাঠশালার মাঠে বিকেলে ওই যাদের সঙ্গে ফুটবল খেল।
হ্যাঁ, ওরা আবার বন্ধু নাকি? মা তো আমাকে বাইরের কারও সঙ্গে মিশতে দেয় না, যদি আমি খারাপ হয়ে যাই। তাই সব ভাল ভাল ছেলেদের সঙ্গে মা বন্দোবস্ত করেছে, তারা যদি বাড়িতে এসে আমার সঙ্গে খেলে তা হলে রোজ ভাল টিফিন খাওয়াবে।
শ্রীনাথ অবাক হয়ে বলে, সে কী!
সজল হি হি করে হাসে। বলে, একটা ছেলেও ভাল করে শট করতে জানে না। একটা ছেলের সঙ্গেও আমার তেমন ভাব নেই। শুধু খাওয়ার লোভে পেটুকগুলো রোজ খেলতে আসে।
রাগে ক্ষোভে শ্রীনাথের মুখটা কেমনধারা হয়ে গেল। প্রায় কাপা গলায় বলল, শাসন তা হলে এত দুর গেছে।
তুমি ভেবো না বাবা, আমি স্কুলে অন্যসব বন্ধু পাই।
কিন্তু এ রকম ভাড়া করা বাছাই ছেলেদের সঙ্গে মিশলে যে মনের দিক থেকে তুমি পঙ্গু হয়ে যাবে।
কথাটার মানে বুঝল না সজল; কিন্তু আন্দাজে বুঝল। বলল, সেইজন্যই তো হোস্টেলে যেতে চাই। যেতে দেবে, বাবা?
শ্রীনাথ একটু ভেবে মাথা নেড়ে বলে, আমি তোমাকে যেতে দেওয়ার মালিক নই।
তা হলে আমি তোমার সঙ্গে যাব।
শ্রীনাথ হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। গাঢ় স্বরে বলে, সেও তোমার মা জানে। তোমার মায়ের হাত থেকে কেউ পালাতে পারে না। তুমিও পারবে না।
