চাটুজ্জেবাড়ি থেকে আসছি।
কোন চাটুজ্জে?
চাটুজ্জে আবার এখানে ক’টা? শ্রীনাথ চাটুজ্জে, তৃষা চাটুজ্জের নাম শোনোনি?
ও।
বলে বেণু ডাক্তার আবার পিলে দেখতে লাগল। তারপর ওষুধের নাম লিখল, কম্পাউন্ডারকে ডেকে কাগজখানা দিল।
ততক্ষণে নিতাই কাঠের বেঞ্চটায় জায়গা করে নিয়ে বসে ঠ্যাং নাচাচ্ছে। বসে বসে সে বেণু ডাক্তারকে দেখছিল আর ভাবছিল। কোত্থেকে এসে বেশ জুড়ে বসে গেছে। কথায় আছে বন থেকে বেরুল টিয়ে, সোনার টোপর মাথায় দিয়ে। এও হল সেই কাণ্ড।
আপনমনে খুব একচোট হাসল নিতাই। বেণু ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে চেয়ে তার হাসি দেখল, কিছু বলল না। নিতাই হেসে-টেসে নিয়ে বলল, হরিশ ডাক্তার কী বলে জানো? বলে, তোমরা নাকি সব ভাগাড়ের ডাক্তার।
বেণু আবার ভ্রু কোঁচকায়। বলে, এটা গালগল্পের জায়গা নয়।
তোমরা বাপু হুট করে বড় চটে যাও। আজকাল কারও সঙ্গে বসে দুটো কথা বলতে পারি না। সবাই ব্যস্ত, সবাই বদরাগী।
হাতের রুগিকে ছেড়ে দিয়ে বেণু নিতাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, কী চাই?
মাথার ঘায়ের জন্য একটু মলম দাও তো।
মাথাটা দেখি।
গোরু-মোষ যেমন গুতোনোর সময় করে তেমনি মাথাটা এগিয়ে দিল নিতাই।
বেণু ডাক্তার টাকার কথাটা আগে তুলাল না। তার মানে লোকটা খারাপ নয়। জপানো যাবে।
অনেকক্ষণ দেখল বেণু। তারপর বলল, ওষুধ দিচ্ছি। দিন সাতেক লাগিয়ে দেখো। যদি তাতে কমে তবে একবার মেডিক্যাল কলেজে গিয়ে দেখিয়ে।
নিতাই একগাল হেসে বলে, তোমার ওষুধেই কমবে। লোকে বলে তুমি ধন্বন্তরী।
কই, হরিশবাবু তো বলেন না!-বলে বেণু একটু হাসে।
হরিশ আবার ডাক্তার! কলিকালে কতই হল, পুলিপিঠের ন্যাজ বেরুল।
বেণু ডাক্তারের সত্যিই গালগল্পের সময় নেই। তবু বলল, পুলিপিঠের আবার লেজ হয় নাকি?
ও সে এক মাতালের গল্প। মদ খেয়ে আলায়-বালায় পড়ে ছিল, তো এক ইঁদুর এসে তার মুখ শুঁকছে। খপ করে ইঁদুরটাকে চেপে ধরে ভাবল, বাঃ এ যে দিব্যি পুলিপিঠে। কিন্তু পুলিপিঠের একটা ন্যাজও’রয়েছে। তাই ভাবছে এসব কলিকালের কাণ্ডমাণ্ড আর কী!
গল্পটা বেণু ডাক্তার জানত না। একটু হাসল। হাসি দেখে ভরসা পেল নিতাই। মানুষের মুখে হাসি সে বড় একটা দেখতে পায় না। ভারী দুর্লভ জিনিস। বলল, এরকম কত গপ্পো আছে আমার ঝোলায়। শুনতে চাও তো রোজ এসে শুনিয়ে যাব।
কম্পাউন্ডার একটা অয়েল পেপারে মোড়া খানিকটা মলম এনে দিয়ে বলল, এক টাকা বারো আনা। দিনে তিনবার লাগাবে। সকাল, দুপুর, রাত্রি।
কম্পাউন্ডার ছোকরা চেনা মানুষ। আর চেনা মানুষকেই নিতাইয়ের যত ভয়। তাই শুনি-না শুনিনা ভাব করে বলল, বুঝলে ডাক্তার, আমি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছি। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় এমন টাইফয়েড হল, পরীক্ষাটাই বরবাদ।
ও বাবা!—বেণু ডাক্তার চোখ বড় করে বলে, এইট থেকেই এক লাফে ম্যাট্রিক!
কোথাও একটা কিছু গোলমাল হচ্ছে বুঝতে পেরে নিতাই মোলায়েম গলায় বলে, সে আমলে। হত। আজকের কথা তো নয়।
তুমি কোন আমলের লোক, বয়স কত?
তা তিন কুড়ি চার কুড়ি হবে।—নিতাই বোকা সাজল একটু।
ডাক্তার হাসে। বলে, তা হলে তো মেলাই বয়স তোমার।
আমি যখন ছোট ছিলাম তখন এ জায়গায় বাঘ ডাকত।
কম্পাউন্ডার ছোকরা তাড়া দিয়ে বলে, পয়সাটা?
নিতাই বিরক্ত হয়ে বলে, চুপ দে তো সতু। কাজের কথা হচ্ছে তার মধ্যে ঘ্যান ঘ্যান লাগালি। পয়সা হবে’খন। চাটুজ্জেবাড়ির পয়সা মার যায় দেখেছিস? আমার দশ বিঘে জমি আছে।
কথার তোড়ে সতু ভড়কে পিছিয়ে গেল।
বেণু ডাক্তার তোক খারাপ নয়। তাছাড়া পসার জমাতে হলে লোককে প্রথম প্রথম একটু খাতির করতেই হয়। তাই হাসিমুখেই বলল, ঠিক আছে, পরে দিয়ে যেয়ো। তৃষা বউদির কাছে বিলও পাঠিয়ে দিতে পারি।
আঁতকে উঠে নিতাই বলে, না না, বউদিদিমণিকে আবার এর মধ্যে কেন? মোটে তো সাতসিকে পয়সা। গনিয়ার জঙ্গলের পূবধারে ভাঙা মন্দির খুঁড়লে সাত ঘড়া সোনার মোহর, জানো? বহুকাল আগে এক সাধু আমাকে সন্ধান দিয়ে গেছে। ভারী আলিস্যি তো আমার, তাই আজও তুলিনি। আমারটা খাবেই বা কে বলো! সন্নিসি ফকির মানুষ। তুলব-তুলব করেও তাই তুলিনি। এবার একদিন যেতেই হবে দেখছি।
মলমটা নিয়ে বেরোতেই দেখতে পেল, সামনে বউদিমণির দোকান এয়ীর পাশের টিউবওয়েলটায় মাছির মতো ভিড় লেগেছে। আগে বাজারে পাতকো ছিল, পুকুর ছিল, একটা টিউবওয়েলও ছিল। পুকুর মজে ভরাট হয়েছে, পাতকো ভাঙা, টিউবওয়েলটার দশাও বুড়োর দাঁতের মতো নড়বড়ে। বউদিমণি এই টিউবওয়েল বসাল এই সেদিন, এখনও গায়ের সবুজ রংটা চটেনি পর্যন্ত। প্রথম-প্রথম লোকে এ টিপকলের জল নিত না। মাতব্বররা নাকি নিষেধ করেছিল। আজ ভিড় দেখে খুশি হল নিতাই। একটা হুংকার ছেড়ে বলল, জয় কালী। এই ব্যাটারা, লাইন লাগা! লাইন লাগা!
বলে নিজেই এগিয়ে গিয়ে লোকজনকে ঠেলা ধাক্কা দিতে থাকে নিতাই, বাপের কল পেয়েছিস শালারা? ভেঙে ফেলবি যে। এই খোকা, ভর দিবি না, টিপল বেঁকে যাবে।
লোকে হিহি করে হাসে, নিতাইয়ের কথার অবাধ্যও হয় না। যত যাই হোক, বউদিমণিরই তো কল। আর নিতাই হল বউদির ডান হাত। লোকে তাই লাইন লাগাতে থাকে। নিতাই একটু তফাত হয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে মাতব্বরি করতে থাকে, এই পদা, অমন ঝকাং ঝকাং হ্যান্ডেল মারছিস যে! বাপের জন্মে এসব সাহেবি জিনিস দেখেছিস? খাস বিলেত থেকে জাহাজে করে আনা। বলি ও রতনের মা, লাইন ভেঙে এগোলে যে বড়! কাদু, তুই হরিপদর পেছনে। এই শালা কেতল, তোর কি চান করার মতলব নাকি? কোমরে গামছা, মাথায় সপসপে তেল, হাত বালতি মগ? আঁা? চান করলে ঠ্যাং ভেঙে দেব। ইঃ, লাটসাহেব বউদির বিলিতি কলে চান মারাতে এসেছে! ভাগ, ভাগ! হুঁ হুঁ বাবা, এ কল এমন মন্তর দিয়ে বেঁধেছি কেউ বদ মতলব নিয়ে এলে কল সাপ হয়ে ছুবলে দেবে। এ হল পাতালগঙ্গার জল, যত পারিস খা, রোগ-ভোগ দূর হয়ে যাবে, গায়ে। হাতির বল হবে। ডায়াবেটিস জানিস, ডায়াবেটিস? এই জল খেলে ডায়াবেটিসও সারে।
