ফের বুজরুকি করছিস? এটা লাইনের ওপার নয়, মনে রাখিস।
হেঃ হেঃ করে হেসে নিতাই বলে, এই তো সেদিন জন্মালি রে লাখন। মায়ের পেটে যখন ছিলি তখন এই নিতাই এসব জায়গায় লাঠি ঘোরাত। দেহাত থেকে এসেছিস দেহাতির মতো চুপচাপ থাক।
এই পর্যন্ত হয়েছিল। তিনদিনের দিন নিতাই মাঝরাতে গিয়ে রামলাখনের মাটির ঘরে সিঁধ দিল।
পরদিন সকালের রোদে বেজিটা খ্যাপা নিতাইয়ের ঘরের সামনে তুরতুর করে চলে ফিরে বেড়াতে থাকে আর প্রাণ ভরে দেখতে থাকে নিতাই। ইস্পাতের একটা বন্ধু হল। বেজিটাকে এমন ট্রেনিং দেবে সে যে, ব্যাটা বাঘের গলার নলিও কেটে দিয়ে আসতে পারবে।
নিতাই জানে বেজি খুঁজতে এ বাড়িতে আসার মুরোদ রামলাখনের নেই। মুখে যতই গেছো মাগি বলুক, সজল খোকার মাকে যমের মতো ডরায়। তাই নিতাই খানিকটা নিশ্চিন্ত।
বেজির ঘোরাফেরা দেখতে দেখতে নিতাই অনেক তত্ত্বকথা ভাবছিল। মল্লিবাবুর ছিল দুটো বেজি, তার একটা। বড়লোকদের সব জিনিসই কিছু বেশি থাকে। কিন্তু ভগবান তা বলে বড়লোকদের তিনটে করে হাত-পা দেয়নি। তবে বড়লোক শালারা অত তড়পায় কেন?
কথাটা ভেবে খুশিই হল সে। এখন কথাটা কাউকে বলা দরকার। ঘরে একটা পাখির খাঁচা খালি পড়ে আছে। তার বউ ময়না পুষত। বউ পালানোর পর কিছুদিন মন খারাপ থাকায় ময়নাটাকে আর দানাপানি দেওয়া হয়নি। পাখিটা মরেই যেত। যখন ধুকছে তখন তৃষা এসে নিয়ে গেল। খাঁচাটা পরে ফেরত দেয়। ময়নার জন্য নতুন মস্ত খাঁচা বানিয়ে নিয়েছে।
বেজিটাকে ধরে খাঁচাবন্দি করে তত্ত্বকথাটা কাউকে বলতে বেরোল নিতাই।
গ্রীষ্মকালে মাথার জটাটা খুব পাকিয়ে উঠেছে। উকুনের চিড়বিড়েনির চোটে মাথা খাবলে ঘা করে ফেলল। সেই ঘা এখন দগদগিয়ে উঠে পুঁজ রক্ত পড়ছে। চিমসে গন্ধ এমন ছাড়ে যে, নিতাই নিজেও টের পায়। বোষ্টমরা বেশ আছে। মাথা কামিয়ে ফেলে। তান্ত্রিকদেরই যত বিপদ।
হরিশ ডাক্তার আগে জল দিলেও লোকের রোগ সারত। এখন আর পসার নেই, এই গঞ্জ জায়গায় এখন আরও দু’জন ডাক্তার হয়েছে। তবু হরিশ ডাক্তার এখনও বাজারের গায়ে ডিসপেনসারিতে হাতের থাবায় নাক ঢেকে চুপ করে বসে থাকে। কম্পাউন্ডার পর্যন্ত। নেই।
নিতাই গিয়ে সুমুখের চেয়ারটা টেনে বসে বলল, মাথার ঘায়ের একটা ওষুধ দাও দিকিনি।
হরিশ বেশি কথা বলে না। চেয়ে থেকে শুধু বলল, পয়সা কে দেবে?
চিকিচ্ছের আগেই পয়সা! ডাক্তাররা কি চামারই হল দিনে দিনে!
যা না, ওই যে সব ভাগাড়ের ডাক্তাররা এসেছে তাদের কাছে যা। কী বলে শুনে আয়।
ওসব শুনে কী হবে? তুমি হলে এ গাঁয়ের পুরনো ডাক্তার। আমিও পুরনো লোক। তোমার আমার কি কেবল পয়সার সম্পর্ক?
তবে কিসের সম্পর্ক? তুই আমার কোন ভাতিজা লাগিস?
মাথার ঘায়ে আমার বলে পাগল-পাগল অবস্থা! পিছুতে লাগছ কেন বলো তো একটা মলম-টলম দাও না। ডাক্তাররা তো বিনিমাগনা কত ওষুধ পায়।
সে তোর মতো গর্ভস্রাবের জন্য নয়।
খুব যে বড় বড় কথা বলছ, তোমার অবস্থাও জানি।
কী জানিস?
তোমার রুগি জোটে না।
হুঁ! দু’দিন সবুর কর, তারপর দেখিস জোটে কি না।
দু’দিনে কী হবে?
ভাগাড়ের ডাক্তাররা যখন রতনপুরে শকুন ফেলবে তখন ত্রাহি-ত্রাহি বলে এসে জুটবে সব। রুগি জোটে না! রুগি জোটে না তো তুই-ই বা কেন এসে জুটলি? বেরো!
আচ্ছা না হয় মানছি। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে, সবাই জানে। তোমার দাম এরা বুঝবে কি? আমরা পুরনোরা বুঝি।
হরিশ ডাক্তার একটা শ্বাস ফেলে বলে, সুবিধে হবে না রে, অন্য জায়গায় দেখ।
চটলে নাকি?
চটাই তো স্বাভাবিক। সকালবেলায় তোর মুখটাই দেখতে হল!
শাস্ত্রে কী আছে জানো?
কী আছে?
শাস্ত্রে আছে, বড়লোকদের তিনটে করে হাতও নেই, তিনটে করে পাও নেই। আছে?
তবে বড়লোকদের কটা করে হাত-পা?
দুটো করে। গরিবদের মতোই।
এটা তো ভেবে দেখিনি।
ভাবো। ভাবলেই টের পাবে।
ভাবব’খন। এখন তুই বাপু গতর তোল।
তুলছি, তুলছি। আমার হাতে মেলা সময় বলে ভালো নাকি? কাজ আমারও আছে। বলছিলাম, বড়লোকদের যদি ভগবান গরিবদের মতোই সব দিয়েছেন, তবে শালাদের অত তেল কেন?
এটাও ভাববার কথা। জামাকাপড় ক’দিন কাচিস না বল দেখি! গন্ধে ভৃত পালায়।
ভূত কখনও গন্ধে পালায় না গো ডাক্তার।
তবে কীসে পালায়?
মন্ত্রে।
ওঃ, তুই তো আবার তান্ত্রিক!
আলবত তান্ত্রিক। একটা মলম দাও, মাস পয়লা দাম দিয়ে দেব।
তোর কি মাস পয়লায় বেতন হয় নাকি?
আমার যজমান আছে, তাদের বেতন হয়।
তোরও যজমান?
আমাকে ভাবো কী বলো তো তোমরা, তন্ত্রটা তো ইয়ারকি নয়!
সে জানি। কিন্তু তোর ওষুধের পয়সা না থাকলেও গাঁজার পয়সা জোটে কোত্থেকে বল দিকি?
লোকে দেয়।
চুরি-টুরি এখনও করিস নাকি?
চোর কি আমার গায়ে লেখা আছে?
চোরের গায়ে চোর লেখা থাকে নাকি?
মলম তা হলে দেবে না?
পয়সা দিলে দেব।
ফুঃ! বিনা পয়সায় কত মলম চাও? ওই বেণু ডাক্তারের কাছে গেলে এখনই বাপের সুপুত্র হয়ে মলম দেবে।
তাই যা না।
যাচ্ছি। তুমি পুরনো লোক বলেই এসেছিলাম।
যা যা ভাগ।
গনগন করতে করতে নিতাইখ্যাপা বেরিয়ে এল। ওযুধ করাটা একটু শিখতে হবে। জড়িবুটি কিছু না জানলে আজকাল সাধুসন্নিসির তেমন কদর হয় না।
বেণু ডাক্তার গঞ্জে নতুন লোক। তার ডাক্তারখানায় কিছু রুগি জোটে। আজও জুটেছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে নিতাই হুংকার দিল, জয় কালী! জয় কালী তারা মহাবিদ্যা সোড়শী ভুবনেশ্বরী।
বেণু একটা ছেলের পিলে টিপে দেখছিল। বিরক্ত মুখ তুলে বলল, কী চাই?
