নিতাই তা জানে। তবে বহুকাল ধরে একটা বেজির বড় শখ। মল্লিবাবুর একজোড়া বেজি ছিল। তখনকার এই রতনপুর ছিল কেউটে গোখরোর আড়া। উরু পর্যন্ত একটা চামড়ার স্নেক-বুট পরে বেজি নিয়ে মল্লিবাবু এই ভিটের জঙ্গলেই কত সাপ মেরে বেড়িয়েছেন। সেই কর্মফলেই অকালে মরণ। সাপ মারতে নেই, এই সরল সাদা কথাটা শহুরে বাবুরা কিছুতেই শুনবে না। নিতাই ধরে নিয়েছিল, একদিন সাপেই কাটবে বাবুকে। সেটা অবশ্য হয়নি। মল্লিবাবু সাপ মেরে মেরে এ জায়গাকে সাপের শ্মশান বানিয়ে ছেড়েছিলেন। তিনি মারতেন, তার বেজি দুটোও মারত। মদন ঠিকাদার বলত, সাপের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি বিপজ্জনক। মেয়েমানুষ আরও সাপ না মেরে ববং বন্দুক দেগে এখানকার কয়েকটা বদমাশ শয়তানকে মারো হে মল্লিবাবু। বন্দুক লেগে দাও, জায়গাটা ঠান্ডা হবে। মল্লিবাবু জবাবে বলতেন, আমি সবকিছু মারতেই ভালবাসি।
তখন গনিয়ার জঙ্গল নামে একটা জঙ্গল ছিল, এখন রিফিউজিরা সেখানে থানা গেড়েছে। সেই জঙ্গলে ঢুকে পাখি মারতেন মল্লিবাবু। কম করেও চার-পাঁচটা খ্যাপা কুকুর মেরেছেন। বধে খুব আনন্দ ছিল। মানুষও মেরেছেন কি না সে কথা বলা বারণ। নিতাইয়ের মুখ দিয়ে কখনও তা বেরোবে না। তা সেই গনিয়ার জঙ্গলেই একদিন বেজি দুটো পালিয়ে গেল। মল্লিবাবুর সে কী রাগ বাবা! পোষা জীব মায়া কাটিয়ে পালিয়ে গেলে রাগ হওয়ারই কথা।
আর পোষা মানুষ, ভালবাসার মানুষ পালিয়ে গেলে? যে লক্ষ্মীছড়ি গুসকরায় গিয়ে রসবড়া ভাজছে তাকে কিছু কম পুষত নিতাই? বেজির নেমকহারামি তবু গায়ে সয়, মেয়েমানুষেরটা সয় না।
খালধারে রামলাখনের ঘরে একটা বেজির বাচ্চা রেখে গেছে কোনও এক খদ্দের। কাণ্ডটা ভারী মজার। ব্যাটা নাকি বেজির বাচ্চাটা নিয়েই ফুর্তি করতে এসেছিল। পকেট গড়ের মাঠ। খাসির নাড়িভুড়ি দিয়ে প্যাঁজ লঙ্কার ঝাল-কটকটে করে রান্না ঘুগনি আর দিশি মাল মিলিয়ে পনেরো-বিশ টাকার খেয়ে উঠে বলল, পয়সা নেই। তখন রামলাখন বেজিটা রেখে দিল। বেজির প্রতি কোনও মায়া-দয়া নেই তার। লোকটাও আর ছাড়াতে আসেনি।
সন্ধান পেয়ে বেজিটা বাগাতে রামলাখনকে গিয়ে অনেক তোতাই-পাতাই করেছে নিতাই। রামলাখন রাজি নয়। কেবল বলে, তোর পয়সা কোথায়? বেজি কি মাগনা?
দেব। যত চাস দেব।
বাকির কারবার হবে না। হঠ।
জানিস আমার দশ বিঘে জমি আছে?
সবাই জানে। যা না জমির এক গোছ ধানে হাত দিয়ে দেখ গেছো মাগি তোর কী হাল করে।
চাটুজ্জে-গিন্নিকে গেছো মাগি বললি! দাঁড়া বলে দেব।
বল গে। লাইনের এপারে কিছু করতে এলে—
বলে জঘন্য একটা খিস্তি দেয় রামলাখন।
শুনে কান ঢেকে ফেলে নিতাই। বলে, ছিঃ ছিঃ, মুখটা গঙ্গাজলে ধুয়ে ফেলিস রে। ওসব পাপকথা বলতে নেই।
তবে জমির কথা তুলিস কেন? জমি কি তোর বাপের?
আমার নামে তো।
তাতে কী? নাম ধুয়ে জল খা গে যা।
বেজির জন্য চাস কত বলবি তো!
পঞ্চাশ। এক পয়সা কম হবে না।
তাই দেব।
নগদ ছাড়, দিয়ে দিচ্ছি।
নগদ পাব কোথায়? কাউকে বাণ মারতে হয় তো বল, মেরে দেব।
দেহাতিরা বাণ-টানকে একটু ভয়-টয় পায়। রামলাখনের বাপটা পুরোদস্তুর দেহাতি ছিল। কাঁচা চামড়ার মজবুত নাগরা পড়ত। মাথায় ফগে জড়াত, মোটা মার্কিনের কুর্তা পরত, আটহাতি ধুতি ব্যবহার করত। কিন্তু পাষণ্ড রামলাখনটা এ দেশের জল-হাওয়ায় শেয়ালের মতো চালাক হয়ে উঠেছে। বলল, তোর বাণের মুখে পেচ্ছাপ করি। বাণ মারবি তো গেছো মাগিকে মার গে। মুখে রক্ত উঠে যদি মরে তো বেজিটা দিয়ে দেব।
রামলাখনের রাগের কারণ আছে। স্টেশনের গায়ে একটা গাছের গোড়া বাঁধিয়ে দিব্যি একটা জুয়ার আজ্ঞা করেছিল সে। সন্ধের দিকে কারবাইড জ্বালিয়ে আসর বসত। জমি কারও বাপের নয়, সরকারের। কারও বলার হক ছিল না। পুলিশ-টুলিশ বড় একটা আসেও না এদিকে। কেউ এসে পড়লে দু-চার টাকা দিলেই হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন পালে বাঘ পড়ল হড়াম করে। স্বয়ং সার্কেল অফিসার আর থানার ও সি এসে হাজির।
রামলাখনকে মাস তিনেক জেলের ভাত খেতে হয়েছিল। পুলিশের একটা পোস্টও বসে গিয়েছিল স্টেশনের ধারে। সবাই বলে, কাণ্ডটা ঘটিয়েছিল তৃষা। পুলিশ তার হাতের লোক। তার পিছনে পলিটিকসওয়ালারাও আছে।
নিতাই বলে, তা কিসে দিবি বলবি তো! বেজি জিনিসটা আমার বড় পছন্দ।
রামলাখন উদাস গলায় বলে, আমার ভুট্টাখেতটা যদি সাতদিন কুপিয়ে চৌরস করিস তো দিয়ে দেব।
বলে কী ব্যাটা! দিনে আট টাকার মজুর রাখলেও সাতদিনে ছাপ্পান্ন টাকা যে! ব্যাটার মাথাটাই খারাপ। নিতাইকে কাজ করতে বলছে। কাজ করা কাকে বলে তা নিতাই নিজেই ভুলে গেছে। ফাইফরমাশ করা ছাড়া তার আর ভারী কাজ আসেই না। কাজের নামে গায়ে জ্বর আসে। আর করাই বা কার জন্য? যার জন্য কাজ সেই তো কবে লম্বা দিয়েছে।
নিতাই বলল, তোর দিন ঘনিয়েছে রে ব্যাটা! সাধুসন্নিসিকে কাজের কথা বলিস!
তুই সাধু?
আলবত সাধু।
তবে চোর কে? বদমাশ কে?
তোর কবে কী চুরি করেছি রে নির্বংশের ব্যাটা?
অ্যাই বাপ তুলে কথা বলবি না বলে দিচ্ছি।
ওই দেখ। বাপ তুললাম কখন? তুইই তো আমাকে চোর আর বদমাশ বললি।
বললাম তোকী? মারবি নাকি?
মেজাজ দেখাচ্ছিস কেন রে হারামজাদা? বেজিটা নিয়ে কথা হচ্ছে তো তাই নিয়ে কথা ক’।
হারামজাদা বললি যে! মানে জানিস?
মদ বেচে দু’পয়সা করেছিস বলে খুব তেল হয়েছে রে তোর। এই বলে রাখলাম, নিতাইকে খেপিয়ে কেউ সাতদিন পার করতে পারেনি। মরবি।
