ঘরদোর বেশ বড়লোকদের মতো সাজানো গোছানো। ভাল সোফাসেট, বুক-কেস, রেডিয়োগ্রাম সবই আছে। মেঝেয় একটা উলের ছোট কার্পেট পর্যন্ত। দীপনাথ আরও হাঁ হয়ে গেল। এরা তবে মোটেই গরিব নয়।
সুখেন তাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে রেখে চট করে ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ কেউ এল না। শুধু একটু বাদে স্বস্তি একটা হাওয়াই শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল, বসুন, চা আসছে।
একটু বাদেই সুখেনের পিছু পিছু চায়ের ট্রে হাতে এলেন বীথি। এবং দীপনাথের যা কখনও হয়, সে প্রথম দর্শনেই এই তিন ছেলেপুলের বয়স্কা মায়ের প্রেমে পড়ে গেল।
বীথির যে বয়স হয়েছে তা তার অদ্ভুত সৌন্দর্য ভেদ করেও বোঝা যায়। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হবে, লাগে সাতাশ–আঠাশ। বেশ লম্বা, দারুণ ফর্সা, সবচেয়ে চোখে পড়ে দু’খানা মায়াবি একটু পুরু ঠোঁট। টসটস করছে আহ্লাদে। এত সুন্দর ঠোঁট খুব কমই দেখেছে দীপনাথ। তাছাড়া মুখখানায় সৌন্দর্য যতটা তার চেয়ে ঢের বেশি কমনীয় নরম একরকম সহৃদয় ভাব। শরীরটা একটু মেদভারে আক্রান্ত। তবু মানিয়ে গেছে। জংলা ছাপা শাড়ি পরে আছেন, খাটো ব্লাউজ, দু হাতে সোনার দুটি বালা। সামনের দিকে চুল এমনভাবে ছাটা যে কপালের দু’পাশে দুটো চুলের ঝুমকো দোল খায়। কপালে টিপ, ভ্রু প্লাক করা।
দীপনাথ কোনও মেয়ের দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে পারে না। লজ্জা করে। আজ বীথির সুন্দর চেহারা এবং হয়তো বিয়ারের প্রভাবে সে প্রায় চোখের পাতা ফেলতে পারছিল না। সুখেনের মাথা কি সাধে খারাপ হয়েছে?
বীথি বেশি আদব কায়দার ধার না ধেরে প্রথমেই বলে ফেললেন, দেখুন তো ভাই, আপনাকে নিয়ে আসবে যদি ফোনেও একবার জানিয়ে দিত, তা হলে একটু যত্ন-আত্তির ব্যবস্থা করতাম। এই তো আধঘণ্টা আগে রান্নার লোকটাকে ছুটি দিয়ে দিলাম।
আমরা খেয়ে এসেছি।—দীপনাথ বলল, এবং তার নিজের কানেই নিজের গলা অনারকম শোনাল।
সুখেনের মুখে একটা আহ্লাদের হাসি লেগে আছে তো আছেই। এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হচ্ছে। উনি বললেন, সেকথা কি বলতে বাকি রেখেছি! কিন্তু বীথি না খাইয়ে ছাড়বে না।
বীথি চা এগিয়ে দিয়ে উলটোদিকে বসে বললেন, ফ্রিজে মাংসের ঘুগনি আছে। একটু বসুন, গরম করে দেব।
পেটে জায়গা নেই। পারব না।—দীপনাথ কাতর স্বরে বলে।
জায়গা হয়ে যাবে। বসুন না, খিদে পেয়ে যাবে খন। হোটেলে মেসে থাকেন, ওরা কী খাওয়ায় তা তো জানি।
হাতের আঙুলগুলো লক্ষ করছিল দীপনাথ। বীথির মতো এত সুন্দর লম্বাটে ললিত আঙুল সে জীবনে দেখেনি।
চায়ে নিঃশব্দে ছোট একটা চুমুক দিয়ে বীথি বললেন, আজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হয়ে গেল। রান্নার গ্যাসও ফুরিয়েছে দুদিন হল। স্টোভ জ্বেলেই সব করতে হবে।
কষ্ট করবেন কেন? কোনও দরকার নেই।
সৌন্দর্যের সঙ্গে একটা আত্মসচেতনতাও মিশে আছে কি না, ভাবছিল দীপনাথ। কয়েকটা কথাতেই বীথি জানিয়ে দিলেন যে, তাঁর বাসায় টেলিফোন, ফ্রিজ এবং গ্যাস উনুন আছে। আজকাল মধ্যবিত্তদের ঘরে এসব থাকে এবং তারা এই নিয়ে খুব আত্মপ্রসাদও বোধ করে। বীথির আত্মসচেতনতার কথা ভেবে একটু খারাপ লাগল দীপনাথের।
বীথি ভারী সুন্দর হাসেন। দাঁত ঝকঝকে এবং হাসলে মাত্র অর্ধেক দেখা যায়, বাকি অর্ধেক ঠোঁটে ঢাকা থাকে। সব মিলিয়ে বীথি অতীব কাম-উত্তেজক। তাকিয়ে থেকে দীপনাথ নিজের অসহনীয় উত্তেজনা টের পায়। ভিতরে গর্জন করছে এক ঘুম-ভাঙা বাঘ। আশ্চর্য। কোনওদিন মণিদীপাকে দেখে ঠিক এরকমটা হয়নি। অথচ বীথির বয়স মণিদীপার চেয়ে অনেক বেশি।
বাড়িতে আর কারও সাড়াশব্দ নেই। বীথি বললেন, এ সময়ে কেউ বাড়িতে থাকে না। ছোট ছেলে টিউটোরিয়ালে যায়। মেয়ে এখন লখনউতে-ওদের স্কুলের এক্সকারশনে গেছে।
আপনি হয়তো বিশ্রাম করতেন, অসময়ে আমরা এলাম।—ভদ্রতা করে দীপনাথ বলে।
ওমা! বিশ্রামই তো করছি। কারও কারও সঙ্গে বসে কথা বলাটাও বিশ্রাম।
কথাগুলোর তেমন মানে নেই, শুধু শুনতে ভাল। দীপনাথকে এখানে সুখেন আনলেন কেন তা সে বুঝতে পারছিল না এখন পর্যন্ত। তবে অপেক্ষা করছিল।
ঘণ্টাখানেক গেলে বীথি বললেন, যা গরম পড়েছে, একটু ঠান্ডা বিয়ার খান। ফ্রিজে আছে। ঘুগনিটাও গরম করে আনি।
না-না, করল দীপনাথ। বীথি শুনলেন না। ফলে আবার বিয়ার এবং মাংসের ঘুগনি পেটে চালান হল।
মাঝপথে হঠাৎ সুখেন উঠে বললেন, কাছেই একজন লোকের সঙ্গে দেখা করে আসছি। একটু বসুন দীপনাথবাবু, মিনিট চল্লিশ।
আমিও বরং উঠি।
না। বসুন না, গল্প করি।–বীথি বললেন।
খুবই ভয়-ভয় করল দীপনাথের। সেই সঙ্গে জেগে উঠল ঘুমন্ত লোভ, কাম, সবকিছু। সদর দরজা বন্ধ করে এসে বীথি বললেন, চলুন আমার বাসাটা আপনাকে ঘুরে দেখাই।
কী হবে বা হতে পারে তা যেন জানত দীপনাথ। একটা চমৎকার মধুর ফাঁদের মতো ব্যবস্থা। সে যে ফাঁদে পা দিচ্ছে তাও জলের মতো পরিষ্কার। সুখেনটা রাসকেল। কিন্তু এই অভিজ্ঞতাটারও যেন দরকার ছিল দীপনাথের।
বীথি তাকে শোওয়ার ঘরে নিয়ে এলেন। চমৎকার ঘর। মস্ত খাটে নরম বিছানা। মৃদু সবুজ আলো জ্বলছে।
আলোটা কি থাকবে?–বীথি ব্যবসায়িক গলায় জিজ্ঞেস করেন।
থাক।
বীথি সাবধানে জানালার পরদাগুলো টেনে দিলেন।
ঘরের মাঝখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে দীপনাথ ভাবল, এত সহজ! এত সহজ! অথচ এত সুন্দরী!
২৭. বেজি জাতটা কিছুতেই পোষ মানে না
বেজি জাতটা কিছুতেই পোষ মানে না। যতই পোষো, যতই আদরে রাখো, সুযোগ পেলেই শালারা জঙ্গলে পালিয়ে যাবে। যাবে তো যাবেই, আর আসবে না।
