যা করতে হবে, তা হচ্ছে তালা ভেঙে ঢুকতে হবে, ঘরবাড়িগুলো দখল করতে হবে, আলিগঞ্জে কোনো মালাউন ও দালাল থাকবে না। জিহাদিরা দখলের কাজ ভালোই করতে পারে, তাদের রক্তে রয়েছে দখলের প্রতিভা; নইলে আরব থেকে আফ্রিকা, হিন্দুস্থান থেকে ইন্দোনেশিয়া আমরা দখল করতে পারতাম না; একদিন এই প্রতিভার গুণেই আমরা ছোট্ট এই পৃথিবীটা দখল করবো, পারলে চানতারাও দখল করবো, পারবো ইনশাল্লা।
দখলি জিহাদির দখল করতে থাকে, আর জিহাদি বৈজ্ঞানিকেরা মঠের চারদিকে তার প্যাচাতে থাকে, বিস্ফোরকের ভূপ সাজাতে থাকে, ডাইনামাইট, গ্রেনেড পাততে থাকে, একশো জিহাদি মঠ বেয়ে ওপরে উঠে গিয়ে রিমোট কন্ট্রোল বোমা স্তরে স্তরে গাথকে থাকে। ওদের প্রতিভা আমাকে মুগ্ধ করে, আমি পিস্তল কাটা রাইফেল রিভলবার ছাড়া আর কিছু চালাতে জানি না, ক্ষুরও না; বোমা বানাতে শিখি নি, একবার শিখতে গিয়ে বিস্ফোরণে আমার প্রধান ও দুই তিন নম্বরের কয়েকজন ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলো, আল্লা আমাকে বাঁচিয়েছিলেন, তাই তো আমি সর্বহারা ছেড়ে জামাঈ জেহাদে আসতে পেরেছি। জিহাদিদের কুয়ৎ ও চেহারা দুটিই আমাকে মুগ্ধ করে–কুয়তে তারা সবাই সমান, চেহারায় বিপরীত। একদল জিহাদির মুখমণ্ডল সুরমা আঁকা, মুখগুলো শান্তিতে ভরা ভরা, দাড়িগুলো কালো মসৃণ রেশম দিয়ে তৈরি, কথা বলে ফেরেশতার কণ্ঠস্বরে; আরেক দলের চোখ ভেতরে ঢুকে গেছে, সেখানে সব সময় আগুন জ্বলে, তাদের গাল ভাঙা, দাড়িগুলো লোহার জালের মতো, কথা বলে ঘর্ঘর করে।
তবে কাজে, ক্ষৌরকর্মে, আগুন জ্বালানোতে, বোমা নিক্ষেপে, আর শরাবে ও ছহবতে দু-দলই সমান দক্ষ: এক বোতল শরাবের পরও ফজরের সালাতের কথা ভোলে না, সারারাত ছহবতের পরও টলে না। তারা মঠে মহৎ কাজ করছে, আওয়াজ তুলছে আল্লাহু আকবর’, ‘আলি আলি জুলফিকার’, ‘নারায়ে তকবির’, ‘শ্যামসিদ্ধি হবে আলিগঞ্জ’, ‘শ্যামসিদ্ধির মঠ ধ্বংস করো, ধ্বংস করো’, ‘জামাঈ জিহাদে ইছলাম জিন্দাবাদ’, ‘মালাউন ও দালালদের কতল করো’, ‘জাহেলিদের করল করো’, ‘মুর্তাদদের কতল করো’; আর আমি দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে লাল নীল খয়েরি হলদে সবুজ পাখি মঠের কোটির থেকে উড়ে যাচ্ছে, আবার এসে বসতে চাচ্ছে; অনেকগুলো বাচ্চা দিয়েছে, বাচাগুলো উড়তে পারছে না, চিৎকার করছে, অনেকগুলো গড়িয়ে নিচে প’ড়ে গেলো, পাখির রঙ আর রোদনে চারদিক সুন্দর ও সঙ্গীতমুখর হয়ে উঠতে থাকে। কে যেনো বলেছিলো আমাদের সবচেয়ে দুঃখের ভাবনাগুলোই সবচেয়ে মধুর সঙ্গীত; পাখিগুলোর ওড়াউড়ি ও মধুর রোদন শুনে এটা আমি প্রথম বুঝতে পারি, এবং হঠাৎ শুনতে পাই, ‘হুজুর, এর থিকা আমারে ভাগ দিয়ে দ্যান।’
পাখিগুলো আর মঠটির জন্যে হঠাৎ আমার কষ্ট হয়, মঠটিকে আমিও আর দেখতে পাবো না; যদি আমি আবার বালক হয়ে যাই, ঘাসফুল হয়ে যাই, বিকেলে যদি মঠটিকে আমার দেখতে ইচ্ছে করে, এক মাইল দৌড়ে এসে যদি দেখি মঠটি নেই, তাহলে কি আমার বুক ফেটে কান্না আসবে না? আমি কি চোখে অন্ধকার দেখবো না? আমি কি শূন্যতায় হারিয়ে যাবো না? আমার কি বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে হবে? একবার আমি ‘লা হাওলা’ পড়ি, হয়তো শয়তান আমার ওপর ভর করেছে, তাই আমি মঠ দেখছি, ভবিষ্যৎ আল আকসা দেখছি না। একবার আমার মহান নেতাকে মনে পড়ে, যিনি বায়তুল মোকাররমের দিকে তর্জানি নির্দেশ করে, অনেককক্ষণ স্তব্ধ থেকে, উচ্চারণ করেছিলেন মহাবাণী’চ্ছিল-না’, তিনিই সেটিকে ‘চ্ছিল’ করেছিলেন; আমিও কি তাঁকে, মহান নেতাকে, অনুসরণ করবো?
মঠটিকে না ভেঙে এটিকে মসজিদ বানিয়ে এর মাথার ওপরের ত্রিশুলটিকে ফেলে দিয়ে উড়িয়ে দেবো ‘আল্লাহু আকবর’ নিশানটি?
না, তা আমি পারি না; এটা উঁচু, কিন্তু এর ভূমিতে বেশি জায়গা নেই, দশজনও সালাত আদায় করতে পারবে না; এর নিয়তি হচ্ছে ধ্বংস হওয়া। রাহমানির রাহিম যাকে ধ্বংস করতে চান, তাকে আমি রক্ষা করতে পারি না। কিন্তু এর আগে এটিকে আমি এতো কাছে থেকে দেখি নি, দূর থেকে এটাকে স্বপ্ন মনে হতো, কাছে থেকে তা মনে হচ্ছে না; এর ধ্বংস অনিবাৰ্য।
মোবাইল বেজে ওঠে, ‘হুজুর, আমি মডটার দিকে চাইয়া আছি, আপনে কি আমাকে দ্যাকতে পাইতেছেন?’
আমি বলি, ‘না, অতো দূর দেখা যায় না।’
কণকলতা বলে, ‘দূরে থিকাও আমি আপনেরে দেখতে পাইতেছি, মড়টার থিকাও আপনেরে উচা লাগতেছে।’
আমি বলি, ‘তুমি ভুল দেখছো।‘
কণকলতা বলে, ‘ভুল দেখছি না, হুজুর, আপনে আমার বুকের ভিতর শ্যামসিদ্ধির মডের থিকাও উচা, তাই আপনেরে দেখতে পাইতেছি, আমি যুদি আপনের বুকে অই রকম উচা থাকতাম, তাইলে আপনেও আমারে দেখতে পাইতেন, আমি ত আপনের রাইভের জিনিশ।’
আমি বলি, ‘তুমি আমার সব সময়ের।’
কণকলতা বলে, ‘হাচা কইতেছেন, হুজুর? কন, হুজুর, হাচা কইতেছেন?’
আমি বলি, ‘হ্যাঁ।‘
কণকলতা বলে, ‘তাইলে আর অইডা খামু না।‘
আমি বলি, ‘কী খাবে না?’
কণকলতা বলে, ‘হুজুর, পাচ পুরিন্দা বিষ আইন্যা রাকিছিলাম, মনে করছিলাম যহন মডটা ভাইঙ্গা পরব, তখন খামু; আমি যুদি আপনের সব সোমের অই, তাইলে আর খামু না।’
আমি বলি, ‘কণকলতা, তুমি আমার জীবনলতা, মনে রেখো।’
কণকলতা বলে, ‘তাইলে দুনিয়ার সব মড ধ্বংস আইলেও আমি বিষ খামু না, হুজুর, আমি আপনের কেছে আহুম।’
