আমি বলি, ‘সন্ধ্যার পর পাজেরো যাবে, তুমি তাঁতের শাড়ি পরে আসবে, এক কৌটো সিঁদুর নিয়ে এসো।’
কণকলতা বলে, ‘আইচ্ছা, হুজুর, আমি আপনের পায়ে পইর্যা রইলাম।’
জিহাদি বৈজ্ঞানিকদের কাজ শেষ
জিহাদি বৈজ্ঞানিকদের কাজ শেষ হয়ে গেছে, তারা সবাই নেমে এসেছে মঠ থেকে, আমি মঠটিকে দেখি।
জিহাদিদের প্রধান বৈজ্ঞানিক এসে বলে, ‘হুজুর, কাম শ্যাষ অইয়া গ্যাছে, অহন খালি সুইচ টিপলেই অইব, সব চুরমার অইয়া যাইব।’
আমি বলি, ‘আলহামদুলিয়া, বিছমিল্লা বলে ঠিক মতো সব করেছে তো?’
প্রধান বৈজ্ঞানিক বলে, ‘আলহামদুলিয়া, সব কাম ঠিক কইর্যা করছি; এইডা অইল আমার সবচেয়ে বড় কাম, সব ঠিক মতন করছি, যা বাসাইছি তা দিয়া পাচ দশটা টুইন টাওয়ার হালাই দেওন যায়।’
আমি বলি, ‘আলহামদুলিল্লা, তোমার জন্যে আছে জান্নাতুল ফেরদাউছ।’
সে বলে, ‘অহন সুইচ মারুম, হুজুর?’
আমি বলি, ‘আলহামদুলিল্লা, আমি বড়ো সড়কে গিয়ে দাঁড়াই, সেখান থেকে আমি দেখতে চাই কাফেরের পতন, মূর্তির ধ্বংস; আমি মোবাইল করলেই তুমি সুইচ টিপবে, দেরি করবে না, আলহামদুলিল্লা।’
প্ৰধান বৈজ্ঞানিক বলে, ‘বিছমিল্লা, আলহামদুলিয়া।’
আমার বডিগার্ডদের ও মোঃ আবু লাদেনকে নিয়ে আমি আধমাইল দূরে সড়কের ওপরে গিয়ে দাঁড়াই, বেশ দেখা যাচ্ছে, হয়তো ধ্বংসের সৌন্দৰ্য আমি দেখতে চাই, হয়তো সৌন্দর্যের ধ্বংস আমি দেখতে চাই; মঠটিকে আমি শেষবারের মতো দেখি, আর দেখবো না, আমার বুক কেঁপে ওঠে, সুখে না কষ্টে আমি বুঝতে পারি না। আবছা রঙের মতো, দালির রঙের দাগের মতো, পাখিরা উড়ছে মঠটিকে ঘিরে, আমার মনে হয়। আমিই উড়ছি, কখনো মনে হয় উড়ে উড়ে পাখিগুলো খুশিতে বলছে, ‘আলহামদুলিল্লা, সোভানাল্লা’; সবুজের ভেতর থেকে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া হে মঠ, হে পৌত্তলিকতা, হে উজ্জা, হে লাৎ, হে মানৎ, তুমি আর থাকবে না, তুমি অবিনশ্বরী নও, তুমি তুচ্ছ।
আমি আর কখনো এক মাইল দৌড়ে এসে তোমার দিকে তাকিয়ে থেকে বিকেল ও সন্ধ্যা মাথায় ও বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরবো না; আমি আর ঘাসফুল নাই, আমি আজ তোমার থেকে বৃহত্তর, মহত্তর; তোমার পক্ষে চিরকাল বৃহৎ মহৎ থাকা সম্ভব নয়, নতুন বৃহৎ ও মহতেরা নিয়মিতই দেখা দেয়। ধ্বংস না করে বৃহৎ মহৎ হওয়া যায় না।
পাখিগুলো পাগলের মতো উড়ছে; ওই পাখিগুলো কি তায়রান আবাবিলা? না, তাহলে তাদের মুখে প্রস্তরখণ্ড থাকতো, ওগুলোর চঞ্চু থেকে বুলেটের থেকেও প্ৰচণ্ড প্রস্তরখণ্ড পড়তো; ওগুলো শুধুই রঙ, শুধুই সুর, শুধুই ব্যৰ্থতা, শুধুই ক্ৰন্দন; কবুতর, শালিক, টিয়ে, ময়না। ওগুলো ঘাসফুলের থেকেও তুচ্ছ। আমি একবার কষ্ট বোধ করি, একবার সুখ বোধ করি। একটি বালক আমার বুকের ভেতর দিয়ে বার বার দৌড়ে আসতে থাকে, মঠটির দিকে তাকিয়ে থাকে, মুগ্ধ হয়ে আবার বাড়ি ফিরে যেতে থাকে।
তবে কোনো ভাবালুতায় আচ্ছন্ন হলে আমার চলবে না; আমি আর বালক নই, আমি সাম্যবাদ থেকে সর্বহাৱা থেকে জামাঈ জিহাদে ইছলাম। আমি বুকে একবার শুনি ‘আল্লাহু আকবর’, আরেকবার শুনি ‘আলহামদুলিল্লা’। আমি দেখতে পাই একটির পর একটি ভেঙে পড়ছে ধ’সে পড়ছে জাহেলিয়ার মূর্তি।
আমি মোবাইলে বলি, ‘জিহাদি মোঃ আব্দুর রহমান।’
সে বলে, ‘জি, হুজুর?’
আমি বলি, ‘আল্লার রহমতে সব ঠিক আছে?’
সে বলে, ‘আলহামদুলিল্লা, সব ঠিক আছে, হুজুর।’
আমি বলি, ‘তাহলে বিছমিল্লা বলে সুইচ টেপো।’
সে বলে, ‘আলহামদুলিল্লা, বিছমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।’
আমি শুধু শুনি হাজার হাজার পাখির আর্তনাদ ও দেখি বিপন্ন রঙের ওড়াউড়ি; আমি এতো রঙের ওড়াউড়ি দেখবো, এতো হাহাকার শুনবো, কখনো ভাবি নি; সুরে ও সঙ্গীতে আমার বুক ভ’রে ওঠে।
সৃষ্টি করতে সময় লাগে, ধ্বংস করতে সময় লাগে না; আমার চোখের সামনে ছাই হয়ে নিচের দিকে পড়তে থাকে মঠ, আমি একবার বলি, ‘সোভানায়া, আলহামদুলিল্লা’। মঠটি পুরোপুরি প’ড়ে যাওয়ার পর, ছাই হওয়ার পর, আমি মহাশূন্যতা দেখতে পাই, একটি বালক আর কখনো এটি দেখতে এক মাইল দৌড়ে আসবে না। ওই বালকের মৃত্যু হয়েছে। দূর থেকে শুধু শুনতে পাই ‘আল্লাহু আকবর’, ‘আলি আলি জুলফিক্কার’, ‘নারায়ে তকবির’, ‘শ্যামসিদ্ধি হলো আলিগঞ্জ’, ‘শ্যামসিদ্ধির মঠ ধ্বংস হলো, ধ্বংস হলো’, ‘জামাঈ জিহাদে ইছলাম জিন্দাবাদ’, ‘মালাউন ও দালালদের কতল করো’, ‘জাহেলিদের কতল করো’, ‘মুরতাদদের কতল করো’।
কিন্তু তখনো আকাশে অনেক রঙ উড়ছে, আমি দেখতে পাই, পাখিদের আর্তনাদের মধুর সুর শুনতে পাই।
অনেকগুলো পাখির বাচ্চ উড়তে গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে মঠটির মতোই। জিহাদিরা সেখানে নিশানের পর নিশান উড়োচ্ছে—‘আল্লাহু আকবর’-এর নিশান, ‘আলিগঞ্জ’-এর নিশান; নিশানগুলো খুবই উঁচু বাঁশের ওপর, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে-মহাশূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তার পাশে ওগুলো বামনের মতো। আমি বিশাল উচ্চ মহাশূন্যতা দেখতে পাই, মনে হয় মহাশূন্যতা দাঁড়িয়ে আছে। মঠের মতো, ওখানে এখন মহাশূন্যতার মঠ; আর তাকে ঘিরে উড়ছে নানান রঙ, নানান সুর; পাখিরা উড়ছে কেঁদে কেঁদে, ওগুলো বুঝতে পারছে না কোথায় বসবে; ওগুলোর বাচ্চাগুলো যে ছাই হয়ে গেছে, তা তারা বুঝতে পারছে, পাখিরাও বোঝে। আমার বুকে একটি নিঃসঙ্গ পাখি কাঁদতে শুরু করে, আমি বুকে তার ডানার করুণ স্পর্শ বোধ করি।
