আমি কেঁপে কেঁপে উঠছি, আগামীকাল, একদা ছোটো ঘাসফুল ধ্বংস করবে আকাশচুম্বি বিশালকে, ওই মঠ তা জানে না। মঠটি কি এখন আমার পায়ে এসে পড়তে পারে না? কাঁদতে পারে না হরিপদ বা দুর্গার মতো? আবেদন জানাতে পারে না, ‘হুজুর, আমাকে বাঁচান, আপনের পায়ে পড়ি।’
মঠ, তুমি আকাশচুম্বি হ’লেও, অতিশয় তুচ্ছ এই ঘাসফুলের কাছে; অবশ্য আমি আর ঘাসফুল নই, অগ্নিকুণ্ড, অনেক বছর আমি ঘাসফুল দেখি নি, দেখতেও চাই না। আমার সুদক্ষ বিস্ফোরকবিদরা সব পরিকল্পনা ঠিক করে রেখেছে, তারা জানে কয়েক মুহূর্তে কীভাবে বিশালকে ধ্বংস করতে হয়। বিস্ফোরকবিদেরা ট্রেনিং পেয়েছে দেশে ও বিদেশে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলে আর পাক পাকিস্থানে, তারা জিহাদের বিজ্ঞানী।
আমি অবশ্য মাঝেমাঝে ভাবি ওই তুচ্ছ মঠটিকে ধ্বংস করতে কাফেরদের বিস্ফোরক ও নিয়মকানুন লাগবে কেনো?
একটি পাক কালাম কি আমরা খুঁজে বের করতে পারিনা যেটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক বজ্র ছুটে এসে ওটির মাথায় আঘাত হানবে, এবং টুকরো টুকরো হয়ে যাবে কাফেরদের মঠ? আল আজহার কী করে? খোমেনিরা কী করেন? তারা এখনো কেনো সেই কালামটি খুঁজে বের করতে পারে নি? আমি বিশ্বাস করি ওই কালাম আছে, শুধু আমরা বের করতে পারছি না; অথচ নাছাৱারা তার সাহায্যে এটম বোমা হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করেছে, তার ভয়ে মানুষ কঁপিছে। আমি জানি হাইড্রোজেন বোমার থেকেও শক্তিশালী কালাম আছে, আমরা এখনো সেটি খুঁজে বের করতে পারি নি।
আমার ঘুম আসছে না, আমি শান্তি পাচ্ছি না।
কণকলতাকে আমি ফোন করি; সে বলে, ‘হুজুর, অহন তিনডো বাজে, অহনও আপনে ঘোমান নাই, আপনের কী হইছে, হুজুর?’
আমি বলি, ‘তুমিও তো ঘুমেও নি।’
কণকলতা বলে, ‘হুজুরের হারডা গলায় পইরা হুইয়া রইছি, ঘুমাইতে ইচ্ছা করতে আছে না, হুজুর থাকলে আর ঘুম কি; হারডারে মনে হইতেছে হুজুরের হুজুর হুজুরের জিবলা হুজুরের ঠোট।’
আমি বলি, ‘আমার ঘুম আসছে না; আমার গলায় তো কণকলতার হার নেই, আগুনের মালা বুকের মধ্যে।’
কণকলতা বলে, ‘আপনের কী হইছে, হুজুর? তালগাছ ঘুমাইতে দিতেছে না?’
আমি বলি, ‘না, তার থেকেও বড়ো।‘
কণকলতা বলে, ‘হেইডা কি, হুজুর?’
আমি বলি, ‘কাল শ্যামসিদ্ধির মঠটি ধ্বংস করা হবে, ওটি আর দেখবে না।’
কণকলতা হাহাকার করে উঠে বলে, ‘কন কি হুজুর? এইর থিকা আমারে খুন কইর্যা হালান, চুরমার কইর্যা হালান, বলি দিয়া হালান।’
আমি বলি, ‘সবই রাহমানির রাহিম আল্লার ইচ্ছা, পাক স্তান পাক সার জমিন সাদ বাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, কাল ওখানে শূন্যতা থাকবে, যেমন এখন আমার বুকে শূন্যতা।’
কণকলতা বলে, ‘হুজুর, আপনের পায়ে পড়ি, তার বদলে আমারে বলি দেন, ভাগা দিয়া দ্যান, ওইডার দিকে আমি সকাল বিকাল চাইয়া থাকি।’
আমি বলি, ‘তার বদলে এখন নতুন কিছুর দিকে চেয়ে থাকবে।’
কণকলতা বলে, ‘নতুন জিনিশটা কি, হুজুর?’
আমি বলি, ওখানে একটি আল আকসা মসজিদ উঠবে, মসজিদের টাকাও পেয়ে গেছি, তার দিকে তাকালে তোমার চোখ ভরে যাবে।’
কণকলতা হাহাকার করে, ‘তার বদলে আমারে বলি দ্যান, হুজুর, আপনে কইলে আমি ভোরেই আসুম, ওই মডের নিচে আমারে বলি দিয়েন।’
আমি বলি, ‘তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।’
কণকলতা বলে, ‘অহন, হুজুর?’
আমি বলি, ‘কাল সন্ধ্যার পর তোমাদের বাড়ি আমার পাজেরো যাবে, তুমি চলে এসো; আমরা পাক সার জমিন উদযাপন করবো।’
কণকলতা বলে, ‘আইচ্ছা, হুজুর।’
আমি বলি, ‘আল্লা হাফেজ।’
কণকলতা বলে, ‘আল্লা হাফেজ, হুজুর, আপনের লিগা আমার মন কান্দে।’
তারপরও সে ফোন রাখে না, চুমোর পর চুমো খেতে থাকে; তার জিভ আর ঠোঁটের চাপে আমার মোবাইল কাঁপতে থাকে।
আমি আবার মঠটিকে দেখতে থাকি, যেনো শেষবারের মতো দেখছি; কাল ওটি আমার পায়ের নিচে পড়ে থাকবে। পাখিগুলোকে দেখতে পাই, ডানার পর ডানা উড়ছে, সুখের পর সুখ ভাসছে, রঙ আর রঙ ছবি আঁকছে। কিন্তু এখন আর আমি ছবি আঁকা পছন্দ করি না, ছবি নাপাক, আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি; কিন্তু আমি মঠটি ঘিরে রঙের ছবি দেখতে থাকি।
আমি একবার উঠে সালাত আদায় করি; আল্লার কাছে জামাঈ জিহাদে ইছলামের জন্যে রহমত চাই।
সিভাস রিগ্যালের একটি বোতল বের করি।
এক গেলাশ গিলতে গিলতে আমার কণকলতাকে মনে পড়ে।
তার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, তার দুটি স্তন পাকা গন্ধমের মতো পেয়ারাগাছের ডালে বুলিতে দেখি, তার শরীরটিকে আমার একটি কোমল সোনালি মাংসের মঠ মনে হয়, একদিন কি ওই মাংসের মঠও আমার চুরমার করতে হবে? আমি মনে মনে পাক সার জমিন গানটা গাই। দেখতে পাই আমার দিল পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, পাখি ডাকতে শুরু করেছে, মোরগ অপূর্ব স্বরে আল্লার নাম নিচ্ছে, সোবে সাদেকের শাম্স্ উঠছে, মুয়াজ্জিন ডেকে বলছে, নিদ্রার থেকে সালাত উত্তম, ফেরেশতারা আল্লা আল্লা জিকির করছে, আমি সেই শব্দ শুনতে পাই। আমার অবশ্য ঘুম হয় নি, অনেক রাত হবে না; একরাত ঘুম না হ’লে আমার অনেক রাত ঘুম হয় না। আমি গিয়ে সবার সঙ্গে সালাত আদায় করি।
আলি আলি জুলফিক্কার
সকাল আটটার মধ্যেই,–ফজরের সালাতের পর জিহাদিরা বেশি দেরি করে নি, তারা জিহাদে কখনো দেরি করে না; মাদ্ৰাছা-ই-মদিনাতুন্নবির প্রাঙ্গণ ও সামনের সড়ক কয়েক হাজার জিহাদির ‘আল্লাহু আকবর’, ‘আলি আলি জুলফিক্কার’, ‘নারায়ে তকবির’, ‘শ্যামসিদ্ধি হবে আলিগঞ্জ’, ‘শ্যামসিদ্ধির মঠ ধ্বংস করো, ধ্বংস করো’, ‘জামাঈ জিহাদে ইছলাম জিন্দাবাদ’, ‘মালাউন ও তাদের দালালদের কতল করো’, ‘মুরতাদের খতম করো’ আওয়াজে কেঁপে কেঁপে হেলে দুলে উঠতে থাকে; প্রত্যেক জিহাদির কণ্ঠ বজ্র হয়ে উঠেছে—যে-বজ্রের আওয়াজ মানুষ কখনো শোনে নি, তাদের হাত হয়ে উঠেছে খোলা তলোয়ার, যা দিয়ে একদা তারা মিসর সিন্ধু স্পেন বসরা বাগদাদ সমরকন্দ ইরান তুরান বঙ্গ বিশ্ব জয় করেছিলো, এবং আবার জয় করবে।
