আমি বলি, ‘শুকরিয়া।‘
তিনি বলেন, ‘ঢাকা এসেই প্লিজ ট্রাই টু মিট মি, ইট উইল বি মাই গ্রেটেস্ট প্লেজার টু সি ইউ ইন মাই অফিস অ্যান্ড ইন মাই প্যালেস ইন বারিধারা।’
আমি বলি, ‘ইনশাল্লা আসবো।’
আরো কতো মোবাইল, আরো কতো মোবাইল।
আমার ভয় হয় হয়তো শহিদ মোঃ হাফিজুদিনও মোবাইলে আমাকে বেহেশত থেকে কল করবে; তারও দুটি মোবাইল ছিলো।
মাইজদি থেকে, ‘মোবারকবাদ।’
নিউইয়র্ক থেকে, ‘কংগ্ৰেচুলেশন্স।’
চট্টগ্রাম থেকে, ‘ইছলাম জিন্দাবাদ।‘
সিডনি থেকে, ‘মারহাবা।‘
হেলসিংকি থেকে, ‘মোবারকবাদ।‘
ঢাকা থেকে, ‘কংগ্ৰেচুলেশন্স।’
লস এঞ্জেলেস থেকে, ‘নারায়ে তকবির।’
জাকার্তা থেকে, ‘কংগ্ৰেচুলেশন্স।’
কাতার থেকে, কংগ্ৰেচুলেশন্স।’
আবু ধাবি থেকে, ‘মোবারকবাদ’।
জেদ্দা থেকে ‘কংগ্ৰেচুলেশন্স।’
আবু ধাবি থেকে, ‘মোবারক বাদ।’
কাবুল থেকে, কংগ্রেচুলেশন্স।’
এবং ঢাকা থেকে, এবং ঢাকা থেকে, এবং ঢাকা থেকে, এবং আরো, এবং আরো, এবং আরো। কোনো ফোনই আমাকে অবাক করে না।
একটি ফোন আমাকে চমকে দেয়, ওটি আমি আশা করি নি। নম্বরটি আমার অচেনা, কোনো নাম ভেসে ওঠে না।
তাহলে কি শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন বেহেশতে থেকে কল করলো? ওখানকার নম্বর হয়তো ভিন্ন; ওখানে হয়তো গ্রামীণ ফোনের, সিটি সেলের, অ্যাকটেলের নেটওয়ার্ক নেই।
আমি বলি, ‘হ্যালো।’
সে বলে, ‘হুজুর, আমি আপনের বিবি। কণকলতা।’
আমি বলি, ‘তুমি!’
সে বলে, ‘হুজুর, আপনে ভাল আছেন তো?’
আমি বলি, ‘হ্যাঁ।‘
সে বলে, ‘আলহামদুলিল্লা, হুজুর, আপনেরে মোকারকবাদ ও ধন্যবাদ। আমরা ভাল আছি, বাবার কলডা, দোকান, আমরা ভাল আছি।‘
আমি বলি, ‘ভালো থাকবে।’
সে বলে, ‘আমারে ভুইল্যেন না হুজুর, আমি আপনের বিবি; আপনের কতা আমি দিনরাইত ভাবি, আপনের কতা ভাইব্যা। আমার কষ্ট অয়।’
আমি বলি, ‘এটা তোমার ফোন?’
সে বলে, ‘জি হুজুর, আমার শত সহস্ৰ কদমবুশি আর চুমা।’
কতকগুলো চুমোর শব্দ পাই, মোবাইলটিকে আমার কণকলতার জিভ ব’লে মনে হয়, আরেকটুকু হ’লেই আমার হুজুর রাজপথেই তালগাছ হয়ে উঠতো, কিন্তু দেখি আমার বুকটিও কাঁপছে, হাহাকার করছে।
আমি ওর নম্বরটি সেভ ক’রে রাখি।
দুপুরে, জোহরের নামাজের পর, ঈদগা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে।
সেখানে আমরা শহিদ মোঃ হাফিজুদিনের জানাজা পড়ি।
ওমরপুর ভেঙে পড়েছে শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিনের জানাজা পড়ার জন্যে।
আমার মনে হয়। পাক ফেরেশতারাও নেমে এসেছে; নইলে এতো লোক এলো কোথা থেকে? এখানে তো মালাউনরা আসে নি, তাদের দালালরা আসে নি; তাহলে যারা এসেছে, তারা সবাই কি জামাঈ জিহাদে ইছলামের? আমার তাই মনে হয়, সকলের বুকে এখন জিহাদ। সাধারণ মানুষ শুধু নয়, দারোগা পুলিশ অসি, ম্যাজিট্রেট, ইউএনও, ডিসি, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, উকিল, মুক্তার, চোর, ডাকাত, স্মাগলার কেউ বাকি নেই; সবাই এসেছে, তার জানাজার প্রাঙ্গণ গমগম করছে, আবার স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে; আমি মনে মনে মোঃ হাফিজুদ্দিনকে দেখতে পাই, তাকে বলি, ‘দ্যাখো, মোঃ হাফিজুদ্দিন শহিদ হয়ে তুমি কতো মহৎ হয়ে উঠছো, আমাদের জামাঈ জিহাদ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তুমি আমাদের প্রেরণা, কিন্তু তোমাকে আমি কখনো বিশ্বাস করি নি, তাই তুমি আজ শহিদ, তুমি অমর, তবে তুমি আমার কাছে কৃতজ্ঞ থেকো। তুমি জানো না কার বদৌলতে তুমি আজ অমর, তুমি আজ শহিদ, আজ আমাদের প্রেরণা। তুমি একটু বেশি এগিয়ে যেতে চেয়েছিলে, তবে শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন তোমার ঘিলু ছিলো না, তুমি সাম্যবাদ, সর্বহারা থেকে আসে নি, ইছলামেরও কিছু তুমি বুঝতে না, কোরান হাদিছ তুমি বুঝে পড়ে নি, অর্থ বোঝ নি, খোমেনির কিছুই তুমি পড়ে নি; তুমি খুন বুঝতে, রক্ত বুঝতে, পিস্তল বুঝতে, তার জন্যে আমি তোমাকে শ্ৰদ্ধা করি। তোমার কবর হবে ওমরপুরের প্রধান কবর, প্ৰধান দরগা, তোমাকে আমরা আমার ক’রে রাখবো, মিনার তুলবো; তোমার রক্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পবিত্র নগর, প্রতিষ্ঠিত হবে একটি পবিত্ৰ স্তান। ধন্য তুমি শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন, তোমাকে ছালাম।’
শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিনকে দাফন করার পর নিয়ম মতো শহরটিকে আমরাপুনরায় পরিশুদ্ধ, পাকপবিত্র, করি; জিহাদিরা যতোটা পবিত্র তাণ্ডব সৃষ্টি ক’রে তাদের সৃষ্টিকে উপভোগ করতে চায়, ততোটা আমি করতে দিই না; তবে ওমরপুর অপবিত্র থাকতে পারে না। আমরা দিকে দিকে ছুটি, ঘোড়ার যুগ থাকলে চেঙ্গিশ বা ইখতিয়ারের মতো ঘোড়া ছোটাতাম, কিন্তু আমাদের দুই পা চার পায়ের থেকে কম নয়, অন্য দুটি পা আমাদের হাতে পরিণত হয়েছে তলোয়ার পিস্তল ধরার জন্যে, আগুন লাগানোর জন্যে; জিহাদিরা মালাউন ও দালালদের ঘরে দোকানে আগুন লাগায়, ছেলেমেয়েদের নাচগানের কুফরি তিনটি স্কুলকে ছাইয়ে পরিণত করে—নাচগান জিনার সমান; কিন্তু কতল করার মতো যোগ্য মালাউন আর দালান পাওয়া যায় না।
ওরা পবিত্রপুর ছেড়ে আগেই পালিয়েছে, যারা পড়ে আছে তারা জিম্মি।
জিম্মিদের রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব, তাদের থেকে জিজিয়া আদায় করতে হবে, জিজিয়া ছাড়া আমাদের চলবে না, ধর্ম রক্ষার জন্য জন্যে জিজিয়া দরকার। ওমরপুর এখন পাক পবিত্র স্তান; তার বাতাসে ধুঁয়ো ও আগুনের গন্ধ, রক্তের গন্ধও আছে; কিন্তু তাতে কাফেরি নেই, মালাউন ও তাদের দালাল নেই। এই প্রথম আমি সম্পূর্ণ পাক নিশ্বাস নিই, আলহামদুলিল্লা। জিহাদিরা ক্লান্তিহীন পুরুষ, রক্ত ও আগুন তাদের প্রিয়, অনাহারে তারা দিনরাত জিহাদ করতে পারে, তাদের নিয়ে সারা দুনিয়াকে স্তানে পরিণত করা যাবে, তারা থামতে চায় না।
