এরপর শুরু হয় আমাদের প্রকৃত জিহাদ।
আমাদের জিহাদিরা উচ্চকণ্ঠে উঠছে ‘আল্লাহু আকবর’, ‘নারায়ে তকবির’, ‘ভৈরব হলো ওমরপুর’, ‘ভৈরব নাম ধ্বংস হলো’, ‘ইছলাম জিন্দাবাদ’, ‘হজরত ওমর জিন্দাবাদ’, ‘ইছলাম কায়েম করো’, ‘মুরতাদরা ধ্বংস হোক’ আওয়াজ তুলতে তুলতে বাজারের দিকে ছুটতে থাকে; জিহাদি মোঃ হাফিজুদিন আগে আগে এগোতে থাকে, সব সময়ই সে অগ্রপথিক, আমি আছি মাঝে, নেতাকে এখানেই থাকতে হয়। তারা দিকে দিকে বোমা ছুঁড়তে থাকে, মালাউনদের দশবারোটি দোকানে পেট্রোল ছড়িয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়, মালাউনদের দালালদের দোকানে আগুন লাগিয়ে দেয়,–হরিপদর দোকান আর চাউল কল ঠিক থাকে–আমি আগেই নির্দেশ দিয়েছি। কয়েক জিহাদিকে ওগুলো পাহারা দিতে, আমি কথা দিলে কথা রাখি, যদি কথা দিই বুকের ভেতর থেকে; মোঃ হাফিজুদ্দিন গুলি করতে দক্ষ, দু-একটি গুলি না করলে, তাতে দু-চারটি খুন না হ’লে, সে সুখ পায় না। সে তার সুখকর কাজগুলো করতে থাকে।
আমি দেখতে পাই সে আগুনের মতো ঝড়ের মতো উটের মতো ছুটছে, গুলি করছে; দু-তিনটি মালাউন ও মালাউনদের একটি দালাল তার গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো: লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে আমার দিল ভরে উঠলো, লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যের মতো সুন্দর দৃশ্য আর নেই।
আমাদের জিহাদিরা ‘আল্লাহু আকবর’, ‘নারায়ে তকবির’, ‘ভৈরব হলো ওমরপুর’, ‘ভৈরব নাম ধ্বংস হলো’, ‘ইছলাম জিন্দাবাদ’, ‘হজরত ওমর জিন্দাবাদ’, ‘ইছলাম কায়েম করো’ আওয়াজ তুলছে, বোমা ছুঁড়ছে, গুলি করছে, আগুন জ্বালাচ্ছে: দাউদাউ আগুন উঠতে থাকে, আগুনের সৌন্দর্য দেখে আমি মুগ্ধ হই, মহিমা বুঝতে পারি; বোমা ও গুলির শব্দে চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে, যেনো অনবরত বজ্র এসে পড়ছে। শহরের ওপর।
মহান পরিবর্তনের সময় এমন ঘটনা চিরকালই ঘটেছে, চিরকালই ঘটব; রোমে ঘটেছে, গ্রিসে ঘটেছে, ভারতে ঘটেছে, আরবে ঘটেছে, বঙ্গদেশেও ঘটেছে, সিন্ধুতে ঘটেছে; আজ ঘটেছে ভৈরবে, বদলে যাচ্ছে ভৈরব, যেমন বদলে গিয়েছিলো উতরিব। দু-তিনটি মালাউন ও মালাউনদের একটি দালাল লুটিয়ে পড়েছে–আমি ওদের চিনি, তাতে কিছু যায় আসে না, তবু তো ওদের আমরা মাটিতে জ্যান্ত চাপা দিই নি, যদিও চাপা দিলেই আমার মন শান্তি পেতো; ওগুলোর হিশেবে কেউ পাবে না; আমাদের জিহাদিরা তাদের ব্লাড প্রুফ বস্তায় ভরে ফেলেছে, অন্য কেউ তাদের দেখতে পায় নি।
তাদের আমরা চিরকালের জন্যে নামপরিচয়হীন ক’রে দেবো।
তারপরই ঘটে বৃহত্তম ঘটনাটি। মোঃ হাফিজুদিন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আমি এবার দৌড়ে তার কাছে যাই, দেখি তার হাত, মাথা উড়ে গেছে; জিহাদি মোঃ হাফিজুদ্দিন শহিদ হয়েছেন।
কে করতে পারে এই কাজ, কে আমাদের দিতে পারে একজন চিরঅমর শহিদ? আমি তা জানি, আর কেউ তা জানে না। যে-কজন জানে, তারাও কোনোদিন জানবে না; তারা চুপ থাকবে চিরকাল। অনেক মহান ঘটনা সামান্যরা কখনোই জানে না, তা জানা নিষিদ্ধ।
আমি জিহাদি মোঃ হাফিজুদিনের লাশের ওপর চিৎকার করে পড়ি, রক্তে ভিজে যাই; এবং বলি, ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন জিন্দাবাদ’।
আমার সঙ্গে সঙ্গে সব জিহাদি। আওয়াজ তোলে গর্জন করে বজের আওয়াজ তোলে ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদিন জিন্দাবাদ’, ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন জিন্দাবাদ’, ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদিন জিন্দাবাদ’। দিকে দিকে সাড়া পড়ে যায়; শহর আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে যায়, কুঁকড়ে যায়, আকাশ ভেঙে পড়তে চায়, সূৰ্য গনগন করতে থাকে, সূৰ্য গ’লে পড়তে চায়। আমাদের জিহাদের এক অসাধারণ শাম্স্ দুপুরের আগেই ডুবে গেছে, ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে; এতে মানুষ ও প্রকৃতি কেউ আর আগের মতো স্বাভাবিক থাকতে পারে না।
জোহরেই মাগরেব নেমেছে, কিছুই আগের মতো থাকবে না।
জিহাদিরা মসজিদ থেকে খাট এনে শাদা কাফন জড়িয়ে শহিদ হাফিজুদিনের ছিন্নভিন্ন লাশ খাটে রাখে, লাশ যতো ছিন্নভিন্ন হয় ততোই অমর হয়।
আমরা তার লাশ কাউকে দেখতে দিই না, তাতে রহস্য কমে যাবে; শহিদকে অমর করে রাখতে হলে তাকে রহস্যময় ক’রে রাখতে হয়। জিহাদিরা আওয়াজ তুলতে থাকে ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন জিন্দাবাদ’, ‘আল্লাহু আকবর’, ‘নারায়ে তকবিয়’, ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিনের রক্ত বৃথা যেতে দিব না’,
এই আওয়াজ ওমরপুরের আকাশকে কাঁপিয়ে তোলে, শহরটি বারবার কেঁপে কেঁপে ওঠে, পাশের নদীতে উচ্চ ঢেউ ওঠে, গাছপালার ভেতর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়, সমস্ত বাড়িঘরের ভেতর দিয়ে আগুনের ঘূর্ণি সৃষ্টি হয়।
শহিদ মোঃ হাফিজুদিনের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আমি একটি বক্তৃতা দিই। আমি বলি, ‘বিছমিল্লাহির রাহমানের রাহিম, সমস্ত প্ৰশংসা আল্লার প্রাপ্য, জিহাদি ভাইয়েরা, আমাদের সামনে এখন শহিদ মোঃ হাফিজুদিনের পাক লাশ, শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন মরেন নাই, তিনি শহিদ হয়েছেন, ইসলামের জন্য চিরকাল মোঃ হাফিজুদিনের শহিদ হয়েছেন, আমরাও তাঁর মতো শহিদ হবো। আমরা শরিয়া কায়েম ক’রে ছাড়বো। শহিদ হওয়ার মতো গৌরবের আর কিছু নেই। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে গৌরবান্বিত শহিদ মোঃ হাফিজুদ্দিন।’
জিহাদিরা আওয়াজ তুলতে থাকে ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদিন জিন্দাবাদ’, ‘আল্লাহু আকবর’, ‘নারায়ে তকবির’, ‘শহিদ মোঃ হাফিজুদিনের রক্ত বৃথা যেতে দিব না’, ‘মালাউনদের খতম করো’, ‘মালাউনদের দালালদের খতম করো’, ‘মুরতাদদের খতম করো’।
