ট্রেইটর বলে, ‘বলুন।’
হুজুর বলে, ‘আমাগো তিরিশ লোকের থিকা পনর লাক আপনে রাইকা দেন, বাকিটা আমাগো দেন, তাতেই আমরা বালবাচ্চা লইয়া বাচতে পারুম।‘
ট্রেইটর বলে, ‘রিপোর্ট আমি দু-একদিনের মধ্যে দেবো, তার আগেই আপনারা সব ব্যবস্থা করবেন।’
‘জি হুজুর’ বলে হুজুররা ট্রেইটরের পায়ে চুমো খেয়ে, বারবার পদধুলো নিয়ে, অনেকে আমার পায়েও চুমো খেয়ে, খুশিতে ‘আলহামদুলিল্লা’ বলতে বলতে বেরিয়ে যায়।
আমি একদল জীর্ণ মেরুদণ্ডহীন ভাঙা গাধাকে বেরিয়ে যেতে দেখি।
ট্রেইটর আমাকে বলে, ‘এরা দরকার হ’লে পায়ে চুমো খেতে পারে, দরকার হ’লে খুনও করতে পারে, তবে ওরা আমাকে খুন করবে না; ওরা সেজদা দিতে দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।’
আমি ট্রেইটরের দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হই, সম্ভবত শিক্ষা নিই।
আমি সাম্যবাদ করেছি, সর্বহারা করেছি, খুন করেছি, শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি, কিন্তু এতোটা দক্ষতা কখনো দেখাতে পারি নি, আমলারা দক্ষতায় পবিত্ৰ শয়তানের থেকেও নিপুণ; কিন্তু আমার মধ্যে দক্ষতা দেখানোর একটি স্বপ্ন জেগে ওঠে। কিন্তু কী করে আমি এটা পারবো? আমার নেতারা একের পর শ্রেণীসংগ্ৰাম ছেড়ে একনায়কদের বুটের নিচে পড়ছে, আমি বুটের কাছাকাছিও যেতে পারছি না; কিন্তু আমি ব্যর্থ হতে দিতে পারি না। আমাকে। আমি তো খারাপ ছাত্র ছিলাম না, স্টার ছিলো মাধ্যমিকে উচ্চমাধ্যমিকে, আর আমার এই প্রিয় ট্রেইটর আমার থেকে খুব বেশি ভালো ছাত্র ছিলো না; মনোয়ারা নামে একটি তরুণী তাকে তুলে আনে সাম্যবাদ, সর্বহারা থেকে, নিজেদের বাড়িতে আশ্রয় দেয়; তখন মনোয়ারা বাঙলায় অনার্স পড়তো, গ্রিনরোডে তাদের বাসা ছিলো; ট্রেইটরটি ওই বাড়িতে ঢুকে আর বেরোয় নি। মনোয়ারা তাকে শ্রেণীসংগ্রামের থেকে বেশি দিয়েছে; আমাকে কোনো মনোয়ারা উদ্ধার করে নি, পৃথিবীতে আমার জন্যে কোনো মনোয়ারা আনোয়ারা সালেহা জন্মে নি; একটি আগুন আমার বুকে জ্বলছিলেই; আমাকে একদিন নিয়ন্ত্রক হ’তে হবে।
কিছুক্ষণ পরে দেখি মঞ্চে অন্য মঞ্চনাটক, আমলারা নিপুণ অভিনেতা।
পিয়ন সংবাদ দিতেই আমার প্রিয় ট্রেইটর দৌড়ে গিয়ে আঙিনা থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোককে নিয়ে আসে। এবারও আমি অবাক হই, একদল বুড়ো হুজুরকে যে পদতলের বেশি দেয় নি, সে-ই একজন ভদ্রলোককে দৌড়ে বাইরে গিয়ে ‘স্যার, স্যার’ ব’লে নিয়ে আসে! ট্রেইটর তাঁকে বারবার ‘স্যার, স্যার’ বলছে দেখে আমিও উঠে সালাম দিই।
তাঁকে সালাম দিতে আমার কোনো দ্বিধা হয় না; বেশ শুভ্ৰ সুন্দর মার্জিত মানুষ, কথা বলছেন চমৎকার বাঙলায়, মুখে সুন্দর শাদা দাড়ি।
তাঁকে দেখেই আমার মনে দাড়ি রাখার স্বপ্ন জাগে, তাঁর মতো দাড়ি; যখন বুড়ো হবো তখন আমাকে হয়তো তাঁর মতো দেখাবে। ভদ্রলোক কে, আমি জানি না; কিন্তু আমার ট্রেইটর তাঁকে বিনয়ের সঙ্গে ‘স্যার, স্যার’ করছে দেখে বুঝি তিনি শক্তিমান কেউ। কিন্তু তাঁর কথায় কোনো শক্তির আভাস পাচ্ছিলাম না, পাচ্ছিলাম একটু মহত্ত্বকে, যা আমি কোনো দিন পাই নি। ভদ্রলোকের সঙ্গে আরো কয়েকজন এসেছে, তাদেরও আমার বেশ ভদ্ৰ মনে হয়।
ট্রেইটর ভদ্রলোককে পরিচয় করিয়ে দেয় আমার সঙ্গে।
বলে, ‘স্যার, আমার উপজেলার সবচেয়ে মান্যগণ্য ব্যক্তি, স্যারকে আমি শ্রদ্ধা করি’, আর আমার সম্পর্কে বলে, ‘আমার প্রিয় বন্ধু।’
ট্রেইটর বলে, ‘স্যার, আমাকে ডাকলেই আমিই যেতাম আপনার কাছে, আপনি কেনো এতো কষ্ট করে এলেন?’
ভদ্রলোক বলেন, ‘আপনাকে ডাকা অনুচিত হতো, আপনাকে ডাকার মতো পাওয়ারেও আমি নেই, আমি এসেছি আমার একটি দরকারে।’
ট্রেইটর বলে, ‘কী দরকার, স্যার?’
ভদ্রলোক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় পাঁচটি মাদ্ৰাছা আছে, আজ ওদের পরীক্ষা ছিলো। আপনি না কি পরিদর্শনে গিয়ে সব ছেলেকে বহিষ্কার করেছেন?’
ট্রেইটর বলে, ‘জি, স্যার, বহিষ্কার করেছি; কেন্দ্ৰ বন্ধ করে দিয়েছি।’
ভদ্রলোক বলেন, ‘এবারের মতো ওদের একটু মাফ করে দিন।’
ট্রেইটর বলে, ‘জি, স্যার, মাফ ক’রে দেবো, যদি আপনি বলেন; কিন্তু তারা যে-অপরাধ করেছে, তা একটু আপনাকে শুনতে হবে।’
ভদ্ৰলোক বলেন, ‘কী অপরাধ করেছে?’
ট্রেইটর বলে, ‘স্যার, গিয়ে দেখি ওরা সবাই জুতোর ভেতরে কোরান হাদিসের পাতা ঢুকিয়ে নিয়ে এসেছে; আমি ওদের জুতো খুলে রেখেছি, জুতোয় ওদের নাম লিখে রেখেছি। চলুন স্যার, জুতোগুলো আপনাকে দেখাবো।’
ভদ্রলোক ‘নাউজুবিল্লা’, ‘আস্তাগাফেরুল্লা’ বলে চিৎকার ক’রে দাঁড়িয়ে যান, বলেন, ‘ওইগুলি কাফেরের থেকে কাফের, পাক কিতাবের পাতা ওরা জুতার ভিতর ঢুকিয়ে এনেছে? ওইগুলোকে আপনি শাস্তি দিন, আমার কিছু বলার নেই, আমি নিজেই ওইগুলোকে জুতা দিয়ে পিটাবো।’
শান্ত স্নিগ্ধ ভদ্রলোক আগুনের মতো দাউদাউ ক’রে ওঠেন।
তার কিছু দিন পরই আমি জামাঈ জেহাদে যোগ দিই। আমি বুঝতে পারি ওখানে গেলে আমি নেতা হতে পারবো।
আমি ঢাকা থেকে আসা জিহাদিদের সঙ্গে কথা বলি, টাকার বান্ডিলটি নিয়ে ভেতরে রাখি, ভৈরব দিবসে কী করতে হবে, সব বুঝিয়ে দিই: ওরা সহজেই বোঝে, বুঝতে বুঝতেই ওরা এসেছে। ওরা ওদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এসেছে, আর ওরা নিজেরাই অস্ত্ৰ। ওদের জন্যে খাওয়ার, থাকার ব্যবস্থা ঠিক করা আছে; ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেছি, মাদ্রাছার দশজন তালেবানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ওদের খাওয়ানোর, দেখাশোনা করার। মাদ্ৰাছার পশ্চিমে মসজিদে ওরা থাকবে, যেনো মুসাফির; ওরা প্ৰথমে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে।
