সবাইকে সে ঢুকতে দেয় না, অধিকাংশই দাড়িয়ে থাকে বাড়ির বাইরে গাছতলায়; কেউ কেউ গাছতলায় গামছা পেতে নামাজ পড়তে থাকে।
ট্রেইটর ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই জনদশেক বুড়ো মওলানা মৌলভি তার পায়ে পড়ে যায়, তার পায়ে চুমো খায়, সেজদা দেয়ার মতো পড়ে থাকে। আমি সর্বহারা হ’লেও এতে একটু কেঁপে উঠি; কিন্তু আমার ট্রেইটরটা এরই মাঝে সমাজকে বুঝে ফেলেছে, সে কাঁপে না, সে তাদের পা থেকে উঠতে বলে না, যেনো তার পা দুটি ওদের পড়ে থাকার জন্যেই সরকার বাহাদুর দিয়েছেন; ট্রেইটর একবার আমার দিকে তাকায়, যেনো বলছে, ‘দ্যাখো।‘
ট্রেইটর, যদিও জানে এরা কারা, তবু বলে, ‘আপনারা কারা?’
তারা এবার মাথা নিচু ক’রে দাঁড়ায়, দাঁড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বলে, ‘ছার, হুজুর, আমরা আপনের অধীনের মাদ্ৰাছার হুজুর।’
ট্রেইটর বলে, ‘আপনারা কেনো এসেছেন?’
হজুররা বলে, ‘ছার, আমরা শুনছি আপনে আমাগো মাদ্ৰাছা ভিজিটে গেছিলেন, আমরা সেই সোম এবাদত বন্দেগি করতেছিলাম, তাইতে আপনে আমাগো পান নাই, ছার আপনে আমাগো বাচান।’
ট্রেইটর বলে, ‘তখন তো এবাদতের সময় ছিলো না।’
হুজুররা বলে, ‘ছার, আমরা সব সোমই আল্লার এবাদত বন্দেগি করি, এবাদত বন্দেগি সব সোমাই করন যায়।’
ট্রেইটর বলে, ‘কিন্তু আপনাদের তো বেতন দেয়া হয় পড়ানোর জন্যে, সব সময় এবাদতের জন্যে নয়।’
হজুররা বলে, ‘ছার, আল্লা রছুলের পরই আপনে আমাগো মালিক, এইবার আমাগো মাফ কইর্যা দ্যান, আল্লায় আপনেরে ভেস্ত দিবো।’
ট্রেইটর বলে, ‘আমার উপজেলায় কাগজেকলমে ১৫০টি মাদ্ৰাছা আছে, আমি ভিজিটে গিয়ে দেখেছি আছে পাঁচটি; অন্য কোনোটির নাম হিজল গাছের ডালে, কোনোটির নাম আমগাছের ডালে, কোনোটির নাম মুদিদোকানের চালে, ওই সব মাদ্রাছা আমি দেখতে পাই নি।‘
হজুররা বলে, ‘হুজুর, আমরা গুনাহর কাম করছি, আমাগো মাফ কইর্যা দেন, নাইলে পোলাপান লইয়া মরুম।’
ট্রেইটর বলে, ‘কিন্তু বেহেশতে তো ভালো থাকবেন, হুর আর গেলমান পাবেন বলে শুনেছি।’
গেলমান শব্দটি আমি ওই প্ৰথম শুনি, বুঝতে পারি ট্রেইটর বিসিএস হওয়ার জন্যে অনেক কিছু শিখেছে গাইড বই প’ড়ে।
হজুররা বলে, ‘কে ভেস্ত পাইব আর না পাইব, তা কি কওন যায়, ছার? তয় দুনিয়ায় ভাতকাপড় না আইলে বাচন যায় না। দুনিয়ায় বউ পোলাপান ভাত না পাইলে হুরে গোলমানে কি হইব?’
ট্রেইটর বলে, ‘১৫০টি মাদ্ৰাছায় আপনারা কতোজন হুজুর আছেন?’
হজুররা বলে, ‘গড়ে পাঁচজন কইর্যা ধরলেও ৭৫০জন আছি, হুজুর।’
ট্রেইটর বলে, ‘আপনাদের বেতন কতো?’
ট্রেইটর বলে, ‘চার হাজার ক’রে ধরলে ৭৫০জনের বেতন কতো হয়?’
তারা হিশেবে করতে শুরু করে, হিশেবে করে উঠতে পারে না; কিন্তু আশ্চৰ্য, তারা কোটি কোটি ছোয়াব সহজে হিশেব করতে পারে।
হজুররা বলে, ‘হিছাব করতে পারতেছি না, হুজুর।’
ট্রেইটর বলে, মাসে তিরিশ লক্ষ টাকা, আর ওই টাকাটা আপনারা ফাঁকি দিয়ে নিচ্ছেন; দেশকে ফাঁকি দিচ্ছেন, আল্লাকে ফাঁকি দিচ্ছেন।’
হজুররা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, নাউজুবিল্লা।’
ট্রেইটর বলে, ‘আমি রিপোর্ট দিচ্ছি যে পাঁচটি মাদ্ৰাছা রেখে অন্যগুলো বন্ধ করে দিতে, কারণ ওগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই।’
হুজুররা আবার ট্রেইটরের পায়ে পড়ে হুহু ক’রে কেঁদে ওঠে।
ট্রেইটরটা বয়সে আমার সমান, ওর পায়ে পড়ছে এতোগুলো হুজুর, যারা ওর পিতার সমান, এটা দেখে ট্রেইটরটাকে আমি শ্ৰদ্ধা করতে শুরু করি। আমি অবশ্য ট্রেইটর হতে পারবো না, রাইফেল হাতে নিয়ে শ্রেণীশক্ৰ খতম করতে গিয়ে আমি নিজেকে অনেক আগেই খতম করেছি।
হজুররা বলে, ‘ছার, পোলাপান লইয়া আমরা মারা যামু, আপনে আমাগো বাচান, আপনে আমাগো বাপের মতন।’
ট্রেইটর বলে, ‘আমার তো কিছু করার নেই, সরকার জানতে চেয়েছে, আমার কাজ হচ্ছে সত্য রিপোর্ট দেয়া, মিথ্যে বললে তো আমি দোজগে যাবো। আপনারা কি চান আমি দোজগে পুড়ি?’
আবার হুজুররা তার পায়ে পড়ে, হুহু ক’রে কেঁদে ওঠে।
হজুররা বলে, ‘না, না, হুজুর, আপনে দোজগে যাইবেন না, আমরা বালবাচ্চা লইয়া মইর্যা যামু, আমগো বাচান। ‘
আমি দেখি ট্রেইটর খুব পাকা হয়ে উঠেছে, বুড়ো হুজুরগুলো ওর পায়ে পড়ছে, হুহু ক’রে কাঁদছে, কিন্তু সে অটল থাকছে সততায়। ট্রেইটর বিস্ময়কররূপে সৎ হয়ে উঠেছে, সততায় সে অটল।
ট্রেইটর বলে, ‘কী ক’রে বাঁচাবো, বলুন, আপনারা তো ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করছেন, আল্লার বিরুদ্ধে কাজ করছেন, আমাদের পাক আল কোরানে তো মানুষকে সৎ থাকতে বলা হয়েছে।’
হজুররা বলে, ‘হুজুর, আমরা মমিন মুছলমান থাকতে পারি নাই, আল্লাপাকের কোছে গুনাহ্ করছি, তয় আপনে আমাগো বাচাইতে পারেন, আল্লা রজুলের পরই আমাগো কাছে আপনে৷’
ট্রেইটর বলে, ‘কী করে বাঁচাবো?’
হুজুররা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে আলোচনা করে। একটি ব্যাপার আমাকে বেশ বিস্মিত করে, আমরা দুজন সোফায় বসে আছি, কিন্তু ট্রেইটর ওই বুড়োগুলোকে একবারও বসতে বলে নি। হুজুররা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে মনে হয়, আমরা দুজন তখন চা খাচ্ছি।
এক হজুর বলে, ‘ছার, হুজুর, আমাগো একটা আরজি আছে আপনের কাছে, আপনে মাফ করলে আরজিটা আপনারে কইতে পারি।‘
ট্রেইটর বলে, বলুন।’
হজুর বলে, ‘আপনের শ্ৰদ্ধেয় বন্ধুর সামনেই বলুম?’
