আমি বলি, ‘তুমি এসব জানলে কী করে?’
কণকলতা বলে, ‘হুজুর, জানুম না ক্যা? এই পাক দ্যাশে থাকুম আর ইছলাম জানুম না, তা কি কইর্যা অয়? আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতোয়ানির রাজিম, লাই লাহা ইল্লাল্লা মুহম্মদের রছুলুল্লা। আলহামদুলিল্লাহে রাব্বিল আলামিন, আররাহমনির রাহিম, মালিকি ইয়াওমিদ্দিন, ইয়াকানা বুদু ওয়া ইয়াকানাস্তাইন।’
আমি বলি, ‘তুমি কাফের নও, খাটি মুছলমান, বেহেশতের আওরাত।’
কণকলতা বলে, ‘হুজুর, আমার বাপের দোকান দুইডা আর কলডা জানি না পোড়ে, আমাগো ঘরবাড়ি জানি না পোড়ে।’
আমি বলি, ‘পুড়বে না, আল্লার রহমতে পুড়বে না।‘
কণকলতার দেহটি কণকলতার মতোই; একবার ছেঁড়াফাড়া ভাঙাচোরার পরই ও ঘুমিয়ে পড়ে, মেয়েটির মনে হয় এইবারই প্ৰথম, আমার হুজুরকে প্রবেশ করাতে বেশ পেরেশান হ’তে হয়, তবে ওই পেরেশানিটাই হলো বেহেশতের সুস্বাদ, মেয়েটা কণকলতার মতোই নরম, শুধু গলতে জানে, গলতে গলতে কণকলতার ধারা হয়ে যায়। বকুলমালা শুধু চায়, আমার রক্ত শুষে খায়, ও জীবন্ত কালী, আমি না পারলেও পারার চেষ্টা করি, বকুলমালা হেসে বলে, ‘একবারেই কাহিল হুজুর? আমার যে আরও দশবার লাগিব’; এই কণকলতা কিছু চায় না; একে শেফালি ফুলের মতো পিষে ফেলা যায়, ওকে নিয়ে শিউলির বিছানায় ঘুমোনো উচিত। পিষে ফেলেছি, ও এখন ঘুমোচ্ছে, ঘুমোলেও ক্ষতি নেই, আমার কাজ আমি করেছি, আবার যদি পারি তখন আমার কাজ আমি করতে পারবো–কয়েকবার পাকিস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারবো। মনে মনে পাক সার জমিন সাদ বাদ গানটা গাইবো, যদিও গানটা আমার ঠিক মনে নেই; শাইতোয়ানির রাজিম বলে কিছু বললেও চলবে।
ঢাকা থিকা জিহাদিরা আইসছেন
এক বডিগার্ড দরোজায় টোকা দিয়ে বলে, ‘হুজুর, ঢাকা থিকা জিহাদিরা আইসছেন।’
আমি বলি, ‘জিহাদিদের বসতে বলো, কোক ফান্টা সেভেন আপ দাও।’
আমি ওজু করে, পাজামাপাঞ্জাবি পারে বাইরে বেরোই, দেখি একদল জিহাদি ব’সে আছে, তিরিশজনের মতো।
জিহাদিদের আমি যতোই দেখি ততোই বিস্মিত হই।
আমাকেও পুরোপুরি ওদের মতো হ’তে হবে, সাম্যবাদ ও সর্বহার করেও আমি ওদের মতো হয়ে উঠতে পারি নি, কিন্তু পারতে হবে; খুন করার সময় ওরা ছুরির থেকেও ধারালো আর নিষ্ঠুর, ছহবতের সময় ওরা লোহার মতো শক্ত, শক্ত হতেও সময় নেয় না, ক্ষরণেও সময় নেয় না, আবার শক্ত হয়, বিছমিল্লা বলে আবার শুরু করে; এবং বিনয়ের সময় ওরা পা ধ’রে ছালাম করতেও দ্বিধা করে না, পায়ে পড়ে যায় অবলীলায়, পচা ময়লার মতো প’ড়ে থাকে।
এটা খুবই দরকার, দীক্ষিত করতে হ’লে এমনই দীক্ষা দরকার।
ওরা সবাই মাদ্ৰাছার তালেবেলেম, ওরাও পরীক্ষা দেয়, পরীক্ষায় নকল করার সময় ওরা আশমানি কেতাবের পাতা জুতোর ভেতর ঢুকিয়ে নেয়, একটুও ভয় পায় না, যদিও সাম্যবাদ করার পরও এটা আমি কোনো দিনই করতে পারবো না, আবার খুনের সময় ওরা দশগুণ শিমার ও মুহম্মদি বেগ, ছুরি হাতে পথে পথে ছুটতে পারে।
আমার এক দোস্ত, হারামজাদা এক সময় সাম্যবাদ করতো, পরে বিসিএস দিয়ে আমলা হয়ে গেছে, তবে ওর বাড়িটা এক সময় ছিলো আমার বড়ো আশ্ৰয়, কিছু হ’লেই গিয়ে ওর বাসায় উঠতাম। একদিন গিয়ে দেখি হারামজাদা বাসায় নেই, হারামজাদার না কি অনেক মিটিং।
ভাবি বলেন, ‘কি হে মহামতি কার্লমার্ক্স, কমরেড লেনিন, কমরেড স্ট্যালিন, কমরেড চে গুয়েভারা, খতমি হক সাহেব? বিপদ হয়েছে না কি?’
ভাবিটি বাঙলার ছাত্রী ছিলেন, পরিহাস করতে পারেন যখন তখন; তাঁর পরিহাস আমার ভালোই লাগে, আর বুকে একটু কষ্ট লাগে।
আমি বলি, ‘না, ক্ষুধা লেগেছে; আর ওই ট্রেইটরটা কই?’
ভাবি বলেন, ‘ট্রেইটরটা তার উপজেলায় মাদ্ৰাছার হিশেবে করতে গেছে, আর ফাজিল দাখিল কামিল কাহিল কুহিল পরীক্ষার সেন্টার দেখতে গেছে।’
আমি বলি, ‘ট্রেইটরটা এখন মাদ্ৰাছা নিয়েই আছে?’
ভাবি বলেন, ‘ক্ষুধা কেমন লেগেছে?’
আমি বলি, ‘দুই চারটি হাতি খেতে পারি।’
ভাবি বলেন, ‘তাহলে খেয়ে ঘুম দিন, সন্ধ্যায় ট্রেইটরের সঙ্গে দেখা হবে।’
অনেক দিন পর পেট ভ’রে ভাত খাই। মুরগির গোস্ত, লাউডগা দিয়ে কই মাছ, গোলশা, চিংড়ির ভর্তা দিয়ে কয়েক থাল ভাত খেয়ে একটি লম্বা ঘুম দিই, সন্ধ্যার পর উঠে দেখি ট্রেইটরটা এসেছে। দেখি ট্রেইটরটার সব কিছুই আগের থেকে ভালো, বউটা ভালো—ভাবিকে আমি আগে থেকেই চিনি, তাঁর জন্যেই তো সাম্যবাদীটা ট্রেইটর হয়ে গেলো,–চেহারাটা আরো ভালো হয়েছে, জিপটাও ভালো, একটা মেয়ে হয়েছে, সেটিও ভালো।
সাম্যবাদ। আমাকে ভালো কিছু দেয় নি।
আমি বলি, ‘আই ট্রেইটর, তুই না কি এখন মাদ্ৰাছায় মাদ্ৰাছায় ঘুরিস?’
ট্রেইটর বলে, ‘এই ইছলামেরর পাণ্ডাগুলো আমাকে পাগল ক’রে দিচ্ছে, ইচ্ছে হয় আবার সর্বহারা হয়ে যাই।’
আমি বলি, ‘কী হয়েছে?’
ট্রেইটর বলে, ‘সাত দিন ধ’রে আমার কাজ পড়েছে আমার উপজেলায় আসলে কটি সরকারি মাদ্ৰাছা আছে, কজন হুজুর আছে, তার হিশেবে বের করা। তারপর আবার এখন ফাজিল কামিল দাখিল কাহিল কুহিল পরীক্ষা চলছে, ওই সব পরীক্ষার হলে গিয়ে নকল ধরতে হচ্ছে।’
আমি বলি, ‘কী দেখছিস?’
ট্রেইটর বলে, ‘সন্ধ্যার পরই তুই তা দেখতে পাবি।’
সমাজের সঙ্গে তো আমার কোনো সম্পর্ক ছিলো না, সমাজ কীভাবে কাজ করে তা আমি জানি নি; আমি জানতাম সমাজ হচ্ছে শ্রেণীদ্বন্দ্বের ব্যাপার, আর আমাদের কাজ হচ্ছে শোষণকারীদের শোধন ও নিধন করা। এর জন্যে দরকার অস্ত্ৰ, কাটা রাইফেল, চাইনিজ রাইফেল, স্টেনগান, গ্রেনেড, বোমা, মাইন প্রভৃতি, এবং নিউজপ্রিন্টের অজস্র ইশতেহার। সন্ধ্যা হতে হয় না, বিকেলেই দেখি টুপি দাড়ি নিয়ে একদল ঢুকছে ট্রেইটরের ড্রয়ি রুমে।
