আমি বলি, ‘তুমি ও তোমার দেহখানা আল্লাপাকের অদ্ভুত সৃষ্টি।’
বকুলমালা তার চাউল কলের চাকার থেকেও প্রখরভাবে চোখ ঘুরিয়ে বলে, ‘আল্লাপাকের অদ্ভুত সৃষ্টিটা পুরাপুরি দেখনের সাধ হইছে হুজুরের?’
আমি বলি, ‘খালি দেখলে কি হবে?’
বকুলমালা বলে, ‘আল্লাপাকের অদ্ভুত সৃষ্টি কি খালি দেখনের লিগা, সেইটার একটু রস না খাইলে আল্লাপাক বোজার হইব। হুজুরের কি ইচ্ছা?’
আমি বলি, ‘আল্লার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। তোমার রস তোমাদের খেজুর গাছের রসের থেকেও মিঠা হবে।’
বকুলমালা বলে, ‘হুজুররে কি খাজুরের রস খাওয়ান যায়?’
আমি বলি, ‘কিসের রস খাওয়াবে?’
বকুলমালা বলে, ‘খাড়ি আঙ্গুর বেদানার রস, পাক পাকিস্থানেও এই রকম আঙ্গুর বেদানার রস পাইবেন না, হুজুর।’
আমি বলি, ‘কয়েক গেলাশ খাওয়ার তিয়াষ হচ্ছে।’
বকুলমালা বলে, ‘তাইলে সন্ধ্যার পর আইসেন, কোনো অসুবিদা হইব না; তয় হুজুর, একটা কতা দিতে হইব।’
আমি বলি, ‘কী কথা?’
বকুলমালা বলে, ‘বাবার দোকান দুইডা আর চাউল কনডা একটু দেকবেন, হুজুর, আমাগো বাড়িডাও একটু দেখবেন, তাইলেই অইব।’
আমি বলি, ‘আমি কি দেখছি না?’
বকুলমালা বলে, ‘হুজুর, আপনে দেকছেন। বইল্যাই ত অহনও টিইকা আছি আপনের রহম থাকলে কোনো ডর নাই; এখন তা দিকে দিকে আপনের তালেবানরা মালাউনগো বাড়ি পুড়তেছে, মাইয়ালোকগো জিনা করতেছে, আর আপনেগো মেইন পার্টির সৈন্যদের কতা না অয় ছাইর্যাই দিলাম।’
আমি বলি, ‘তোমাদের বাড়িতে তো তা হয় নি।’
বকুলমালা বলে, ‘না, হয় নাই, বাবায় অবশ্য বলছে আমাগো ডর নাই, আপনের লগে বাবার খাতির আছে, বাবায় সামান্য কিছু আপনেরে দিছে, নাইলে আমিই আপনের কেছে যাইতাম।’
আমি বলি, ‘আল্লার রহমতে তোমাদের ডর নাই, আমি আছি; তবে তুমি আমার কাছে যদি আগেই যেতে তোমার বাবার একটি কড়িও দিতে হতো না।’
বকুলমালা বলে, ডরে যাই নাই, হুজুর, আপনের বকুলমালা পছন্দ না ট্যাকার থলি পছন্দ, তা বুজতে পারি নাই।’
আমি বলি, ‘আমি দুটোই পছন্দ করি, তবে তুমি গেলে তোমার বাবার থলেটা হয়তো নিতাম না, আমি দয়া করতেও পছন্দ করি।’
বকুলমালা বলে, ‘আইজ রস খাইতে আইসেন, হুজুর।’
সেই সন্ধ্যায় বডিগার্ড নিয়ে হরিপদর বাড়ি যাই, বকুলমালা আমাকে তার ঘরে নিয়ে যায়; ঘরটি বকুলমালার মতোই। মালাউনগুলো এতো বালামছিবতের মধ্যেও সব কিছু গুছিয়ে রাখে, এটা বেশ বিস্ময়কর।
তার দেহটি মালাউনদের কষ্টি পাথরের শিলামূর্তির মতো, আর তার শক্তি কালীমাতার থেকেও বেশি। ভাগ্য ভালো আমি তার স্বামী নই, নইলে সে আমার কলজেটা ছিড়ে রক্ত খেতো, তার জিভটা দিয়ে সে সারা দুনিয়ার রক্ত চেটে খেতে পারে, আমার কলজেটা তো সামান্য। বকুলমালা এখন আমার প্রিয় রক্ষিতা, স্বেচ্ছাবন্দিনী, এমনকি বাদি বলাই ভালো; এতে দোষ নেই, আমি পাক বইপত্র পড়ে দেখেছি, এতে কোনো গুনাহ নেই, এটা জায়েজ। তার কালো রঙটার প্রতি আমার একটা মোহ আছে, সৌন্দৰ্য শুধু শাদায়, এটা আমি বিশ্বাস করি না, বকুলমালার রঙ কালো কিন্তু দেহখানি তেলতোলে, আর সেটি মরা লাশের মতো নয়, ওই দেহের সংস্পর্শে দেহে কুয়ৎ জন্মে।
বকুলমালার সঙ্গে সঙ্গম করা ভৈরবীর সঙ্গে সঙ্গমের সমান।
বকুলমালার ছোটাবোন কণকলতাটিকে লতার মতো দুলতে ঝুলতে বুলতে ফুলে ফুলে ভরে উঠতে দেখতে দেখতে ওই লতার প্রতিও আমার একটু আগ্ৰহ জন্মে, গাছের ডালে ঝুলে থাকা স্বর্ণলতা চিরকালই আমাকে ব্যাকুল করেছে; তাই বকুলমালার সামনেই জড়িয়ে ধ’রে তাকে আমি আদর করি, এতেও কোনো দোষ নেই, বকুলমালাও এতে দোষ দেখে না; সতেরো বছরের কণকলতা বকুলমালার থেকে ভিন্ন; বকুলমালা রক্ত খেতে চায়, ও হয়তো ওদের দেবী কালীর বকুলমালারূপ, জিভা ভরে রক্ত, আর কণকলতা রক্ত খেতে দিতে চায়, কণকলতা গা বেয়ে ঝুলে থাকতে চায় স্বৰ্ণলতার মতো, ওর রঙটাও কণকলতার, ও সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতা।
বকুলমালা হচ্ছে মহাকালী, আর কণকলতা লক্ষ্মী বা সরস্বতী বা দুৰ্গা, হয়তো মরুভূমি থেকে বিতাড়িত লাৎ বা মানৎ।
তাই আজি কণকলতাকে নিয়ে আসতে বলেছিলাম হরিপদকে। কালীদেবীকে অনেক দেখেছি, একটু লক্ষ্মী সরস্বতী দুৰ্গা দেখার সাধ হয়।
হরিপদকে আমি বাইরের ঘরে বসিয়ে রাখি, আমার বডিগার্ডরা তাকে কোক পান সিগারেট দিয়ে আপ্যায়ন করবে।
হরিপদ বলে, ‘হুজুর, একটা কতা আছে আপনের লগে।‘
আমি অন্য দিকে নিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘বলো, কী কথা?’
হরিপদ বলে, ‘দেইখ্যেন, হুজুর, মাইয়াডার জানি প্যাট না অয়।‘
আমি বলি, ‘পিল খাওয়াও না?’
হরিপদ বলে, ‘কি কইলেন, হুজুর?’
আমি বলি, ‘পিল, মায়াবড়ি না সতী বড়ি, কী যেনো নাম। এখন মালাউন মাইয়াদের জন্মের দিন থেকেই পিল খাওয়া দরকার, নইলে তাদের পেট থেকে একের পর এক মমিন বেরোবে।’
হরিপদ বলে, ‘তা তা জানি না।’
আমি বলি, ‘তোমারই তো ওগুলো কিনে আনা উচিত, পিতার কর্তব্য পালন করা উচিত।‘
হরিপদ বলে, ‘বাপ হইয়া কি কইর্যা আমি মাইয়াগো খাইতে দেই?’
আমি বলি, ‘অসুবিধা কী? এটাই তো এখন প্ৰধান খাদ্য।‘
হরিপদ বলে, ‘হুজুর, কি যে কন।’
আমি বলি, ‘চিন্তা করো না, আমার ঘরে সুলতান আছে।‘
হরিপদ সুলতান চেনে না মনে হয় বা হয়তো চেনে, সে খুশি হয়।
হরিপদ বলে, ‘হুজুর, চৈদ্দ পুরুষের দ্যাশে আর থাকতে পারুম না মনে অয়। বাপদাদার ভিড়ামাডি ছাইরা চইল্যা যাইতে অইব মনে অয়।’
