মোঃ হাফিজুদিন বলে, ‘বুক থিকা আমার একটা পাত্থর নাইম্যা গেল।’
আমি বলি, ‘তুমি কি সক্রেটিসের নাম শুনেছো?’
মোঃ হাফিজুদ্দিন বলে, ‘না, হুজুর।‘
আমি বলি, ‘সে দুনিয়ার এক মহাজ্ঞানী ব’লে পরিচিত, তাঁরও দুটি কচি গেলমান ছিলো, তাদের মধ্যে তাকে নিয়ে মারামারি লাগতো।’
মোঃ হাফিজুদ্দিন বলে, ‘হুজুর, আমারগুনি মারামারি করে না।’
মালাউনটার আসার কথা ছিলো
মালাউনটার আসার কথা ছিলো, সে এলো না; কাল ওর দোকান আর চাউল কল কীভাবে পুড়বে, সে দৃশ্য আমি দেখতে থাকি।
এমন সময় দেখি মালাউনটা কথা রেখেছে, দশটার দিকে সে এসেছে, সঙ্গে তার মেয়ে কণকলতা।
কণকলতাকে আমি প্ৰথমে চিনতে পারি নি, হরিপদর সঙ্গে বোরখাপরা একটি মেয়েলোক দেখে চমকে উঠেছিলাম। হরিপদ পাল আর মূর্তিটুর্তি বানায় না, ওতে আর পয়সা নেই, দুর্গাটুর্গা বানালেই তো রাতে গিয়ে আমার জিহাদিরা ভেঙে দেয়। বাজারে ওর বড়ো দুটি দোকান রয়েছে, একটি চাউল কলও আছে; আমি জানি হুণ্ডি করে সে টাকা পাঠায় চন্দননগরে, আমাকেও বেশ দেয়; না দিয়ে ওর উপায় নেই। তাই ভালো আছে।
হরিপদীর বিধবা মেয়েটির ওপরই আমার প্রথম চোখ পড়েছিলো।
তার ওপর সবারই চোখ পড়ে, যেমন রাস্তার পাশে কালীমূর্তির ওপর চোখ না পড়ে পারে না। মোটাগোটা, দারুণ মাজা, দারুণ দুধ, দারুণ ঠোঁটযুক্ত শক্ত কালো ঝকঝকে তাজা মেয়ে; একটা মারাত্মক কালী, কাজেও কালীর মতোই, জিভ দিয়ে বুকের সব রক্ত শুষে নিতে পারে; বাইশ-তেইশ বছর হবে। ওকে দেখে আমার মনে হয় ও যদি রাস্তার পাশে কালীমন্দিরে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, তাহলে ও আসল কালীকেও ছাড়িয়ে যেতো; তখন পুজোরীর সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যেতো। তবে আমরা কালীমন্দিরগুলো চুরমার করে দিয়েছি, দেশে কোনো মন্দির থাকবে না; তাই ও মন্দিরে না দাঁড়িয়ে চাউল কল দেখাশোনা করছে। দেবীরা এখন নানা পেশায় নিয়োজিত।
একদিন হরিপদার চাউল কলেই ওকে প্রথম দেখি।
হরিপদ নাম রাখতে শ্ৰী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাহেবের মতোই প্ৰতিভাবান, ফুল পুষ্প মালা লতা ছাড়া আর কিছু সে বোঝে না; এই মেয়েটার নাম রেখেছে সে বকুলমালা, ওকে দেখলেই ওর গায়ে কালো বকুলের গন্ধ পাওয়া যায়। আমি কখনো কৃষ্ণবকুল দেখি নি, কিন্তু বকুলমালা হচ্ছে কৃষ্ণ বকুলের মালা, হয়তো আফ্রিকায় বা দক্ষিণ ইন্ডিয়ায় ফোটে। বকুলমালা বিএ পাশ, যেটা আমি সাম্যবাদে সর্বাহারায় যোগ দেয়ার জন্যে করতে পারি নি, একটা মুর্খ বুড়োর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিলো, সেটা ওর ওপর উঠতে পেরেছিলো কি না জানি না, না পারারই কথা, ওর ওপরে উঠতে হলে হিলারি তেনজিং দরকার, তবে বছরখানেকের মধ্যেই চিতায় ওঠে।
বকুলমালা এখন রক্তজবার মতো লাল টকটকে শাড়ি পরে চাউল কলি দেখাশোনা করে; রক্তজবার লাল আর ওর কালীর কালো মিলে এক রোজকেয়ামতের রঙ সৃষ্টি হয়; কলের ভেতরে একপাশে তার ছোটো অফিস ঘর, বেশ আছে মনে হয়। ওকে ঠিক রাখার জন্যে, সুখে রাখার জন্যে একটা কলই দরকার, হরিপদ তা বুঝতে পেরেছে।
আমি ঢুকতেই সে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আচ্ছালামুয়ালাইকুম, আসেন হুজুর।’
আমি বলি, ‘ওয়ালাইকুমছালাম।‘
বকুলমালা বলে, ‘হুজুর, আপনে একদিন আসবেন, এইটা আমি জানতাম; কত দিন আপনের দিকে চাইয়া রাইছি, একবারও আপনে চান নাই। আপনে কি সব সোম আল্লার দিকেই চাইয়া রন নি?’
আমি বলি, ‘তুমি আমাকে চেনো না কি? আর এতো সুন্দর ছালাম দিতে কখন শিখলে?’
বকুলমালা বলে, ‘আপনেরে চিনিব না, কী যে কন। ভগবানরে না চিনতে পারি, আপনেরে না চিন্না পারি না।’
আমি বলি, ‘কেনো?’
বকুলমালা বলে, ‘আপনে জামাঈ জিহাদে ইছলামের বড় নেতা, বড় হুজুর, আপনেরে চিনুম না? আর ছালামের কতা কন, এখন ত আমরা বারো আনি মুছলমান হয়েই গেছি–লাই লাহা ইল্লাল্লা মুহম্মদের রছুলুল্লা। আরো শোনবেন?–আলিফ লাম মিমা জালোকাল কিতাবা লা রায়বা ফিহা হুদাল্লিল মুত্তাকিন।’
বছর দশেক আগে এটা আমি বলতে পারতাম না।
আমি বলি, ‘মাশাল্লা, চমৎকার, মারহাবা।’
বকুলমালা বলে, ‘হুজুর আপনেরে আমি পছন্দ করি, আপনে দেখতে অন্য জিহাদিগো মতন না, আপনে হিরোগো মতন।’
বকুলমালা রক্তজবার মতো হাসতে থাকে, মেয়েটিকে অসামান্য মনে হয়, আমার সঙ্গে এতো সহজে কেউ রসিকতা করতে পারে না।
আমি বলি, ‘তোমার কথায় বড়ো রস, তুমি বড়ো সরস।‘
বকুলমালা বলে, ‘হুজুর, আল্লার রহমতে আমার সব কিছুতেই রস, চাউল কলের ঝকঝক্কিার মইদ্যে তা বোজন যাইব না।’
আমি বলি, ‘তোমার পুরো মুছলমানই হওয়া উচিত, তোমার মুখে কালাম শুনে আমি মুগ্ধ হচ্ছি, মুছলমান হয়ে যাও না কেনো? আল্লা তোমাকে রহমত দেবেন।’
বকুলমালা বলে, ‘তা ত হইতে চাইছিলামই, ভাইগ্যে হইল না। আল্লা ত রহমত দিল না।’
আমি বলি, ‘কেনো? আল্যা সব সময়ই রহমত দেন।‘
বকুলমালা বলে, ‘কলেজে পড়নের সময় একটা মুছলমান ক্লাশমেটের সঙ্গে প্যাট ভইর্যা এক বছর প্রেম করছিলাম, ভাবছিলাম মুছলমান হইয়া যামু, নিজের নাম রাকুম মোছাম্মৎ উজমাতুন্নেছা।’
আমি বলি, ‘বেশ চমৎকার নাম রেখেছিলে, রাখলে না কেনো?’
বকুলমালা বলে, ‘আহা, আমার লাভার মোহাম্মদ তমিজুদ্দিন মিয়া, যে আমারে অনেকগুনি কালাম শিগাইছিল, সে আমার প্যাট বানাই দিয়া কাঁইট্যা পড়লো, আমি একলা গিয়া চিৎ অইয়া এম আর করলাম। তারপর একটা মূর্খ খোজা বুড়ার সঙ্গে বিয়া হইল, সেইটার ত জোর আছিল না, দারাইত ত না, তবে হে আমারে বেশি কষ্ট দেয় নাই, আমারে মইর্যা বাচাইলো।’
