রাশেদ কি অমন এক পুরুষ হয়ে উঠবে? কর্তা হয়ে উঠবে? তার মাথায় এমন ভাবনা আসছে। না, সে বিয়েই করবে না; বিয়ের কথা মনে মনে ভাবলেও তার লজ্জা লাগে, কিন্তু সে যদি বিয়ে করে, তাহলে সে তার স্ত্রীর কর্তা হবে? না, তার তো স্ত্রীই থাকবে না; সে বিয়েই করবে না। রাশেদ বইটির পাতা উল্টোতে উল্টোতে এক জায়গায় একটি শব্দ পায়, ওই শব্দটি আগে সে শোনে নি,–ছোহবত–শুনতেই তার অদ্ভুত লাগে, কিছুই বুঝতে পারে না। একটু পড়তেই শব্দটির বাঙলা অনুবাদ পায় সে, সাথে সাথে তার হাত কাঁপতে শুরু করে, রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। কেউ যদি এসে পড়ে? বাবা এসে যদি দেখেন? এ-সম্পর্কে আগে সে কিছু পড়ে নি, রাশেদের ইচ্ছে হচ্ছে এক পলকে সবগুলো পাতা পড়ে ফেলতে, যতোই পড়ছে তার অদ্ভুত লাগছে, তার রক্তের ভেতরে খসখসে অনুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে। বইটিতে লিখেছে দুলহা-দুলহান আগে অজু করিবে; তারপর একটা দোয়া পড়িবে, তারপর ছোহবত করিবে। রাশেদের অদ্ভুত। লাগতে থাকে, তার শরীর চঞ্চল হয়ে উঠেছে, কিন্তু অজু আর দোয়ার কথা পড়ে মন খটখট করতে থাকে; এ-কাজও করতে হয় অজু করে দোয়া পড়ে? গ্রামের লোকেরা তো অজুই করতে জানে না, তারা এই ‘জান্নেবনাশশাইত্বানা ওয়া জান্নিবিশ’ জানে? রাশেদ এক জায়গায় পড়ে, ‘যাহারা হাসিখুশীতে ও রাজী রগবতে আপন আপন বিবিদের সঙ্গে একবার ছোহবত করিবে, আল্লাহতাআলা তাহাদের আমলনামায় দশ দশ নেকা করিয়া লিখিয়া দিবেন।‘ আল্লা এর সংবাদও রাখে, এতেও নেকা হয়? পাতা উল্টিয়েই রাশেদের চোখে পড়ে ‘ছোহবতের সময় বিবির শরমগাহের উপর দৃষ্টি করিলে এবং তাহাতে গর্ভধারণ করিলে সেই সন্তান টেরা চক্ষুওয়ালা হইবে’; ‘বিবির শরমগাহের দিকে দেখিয়া দেখিয়া ছোহবত করিলে এবং তাহাতে সন্তান জন্মিলে সেই সন্তান। বেতমিজ ও বেআদব হইবে।’ রাশেদ আর পড়তে পারে না, তার পৃথিবী ঘিনঘিনে হয়ে ওঠে; না, সে কখনো ছোহবত করবে না, ওই দোয়া সে পড়তে পারবে না। রাশেদ উঠে গিয়ে বইটি খুঁড়ে রাখে বিলু আপার বইগুলোর পাশে। সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে; পুকুরে সাঁতার কাটছে হাঁস, টলমল করছে পানি, রাশেদের পায়ের নিচে সবুজ ঘাস, উড়ে গেলো একঝাঁক উস্ফুল্ল কাক, ধলিবক এসে বসছে দূরের তেঁতুলগাছে–সুখী হয়ে উঠছে রাশেদ, তার পৃথিবী আবার হয়ে উঠছে সুন্দর।
কয়েক দিন ধরে হেডস্যার ও রাশেদের মধ্যে চলছে মধুর বিষণ্ণ অভিমানের পালা, বুক ভারি হয়ে আছে তার, সুখও লাগছে, মনে হচ্ছে একটা ভিন্ন জীবন যাপন করছে সে; যেনো সে সমান হয়ে গেছে হেডস্যারের, বন্ধু হয়ে গেছে তাঁর, মনে হচ্ছে তার সমান। হয়ে উঠেছে হেডস্যার, বন্ধু হয়ে উঠেছে তারা, বন্ধুদের মধ্যে অভিমান চলছে, কথা হচ্ছে। মনে মনে, মুখে কোনো কথা হচ্ছে না। হেডস্যারের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে, তাই রাশেদ ইস্কুলে এসে সেই যে পেছনের বেঞ্চে বসছে আর উঠছে না, আর হেডস্যার তাদের ক্লাশের পাশ দিয়ে বারবার যাচ্ছেন আসছেন, ঘুরে ফিরে ইস্কুল দেখছেন, একটু বেশি করেই দেখছেন ইস্কুল, কিন্তু তাদের ক্লাশের দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না। রাশেদ সব সময় বসে প্রথম বেঞ্চে, অভিমানপর্ব শুরুর পর থেকে বসছে শেষ বেঞ্চে, মাথা নিচু করে বসে থাকছে, স্যার ক্লাশে ঢুকে কোনো দিকে না তাকিয়ে ইংরেজি ব্যাকরণ পড়াচ্ছেন, রাশেদের দিকে একবারও তাকাচ্ছেন না। ক্লাশের সবাই প্রতিমুহূর্তে তাকাচ্ছে তাদের দিকে, দেখছে হেডস্যার রাশেদের দিকে তাকান কিনা, আর রাশেদ তাকায় কিনা হেডস্যারের দিকে, এবং না তাকিয়ে তারা কীভাবে থাকে। হেডস্যার। দেখতে বিশাল, কথা বলেন খুব উঁচু কণ্ঠে; তার গলা ইস্কুলের পশ্চিম থেকে পুব পর্যন্ত সমান শোনা যায়। সবাই জানে তিনি বেশি ভালো পড়াতে পারেন না, তবে ইস্কুল চালাতে পারেন সবচেয়ে ভালো; রসিকতা করতেও তিনি পছন্দ করেন ছাত্রদের সাথে, ধমকও দেন ভয়ঙ্কর। রাশেদ হেডস্যারকে ভালোবাসে, রাশেদের মনে হয় হেডস্যার। অসহায়, তার বিশাল শরীরে একধরনের অসহায় ভাব আছে বলে মনে হয় রাশেদের, এজন্যেই রাশেদের ভালো লাগে স্যারকে। হেডস্যার যে ভালোবাসে রাশেদকে, তা। সবাই জানে। একদিন স্যার ক্লাশে একটি ইংরেজি কবিতার কয়েকটি পংক্তি বলেন, কবিতাটি তাদের বইতে নেই, রাশেদ কবিতাটি পড়েছে একটি পুরোনো বইতে; স্যারের মুখে পংক্তিগুলো শুনে ঝলমল করে ওঠে রাশেদ, আনন্দে সে কবিতাটির পরের দু-তিনটি পংক্তি আবৃত্তি করে ফেলে। রাশেদ ভেবেছিলো স্যার খুশি হবেন; কিন্তু স্যার রেগে যান, রাশেদের মনে ভীষণ কষ্ট দিয়ে বলেন, আজ থেকে আপনিই এই ক্লাশে পড়ান, আমি যাই। স্যারের কথাশুনে খুব দুঃখ পায় রাশেদ; সে চুপ করে বসে থাকে, কোনো কথা বলে না, নাম ডাকার সময়ও সাড়া দেয় না। স্যার মুখ তুলে রাশেদের। দিকে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নেন। সেই থেকে শুরু হেডস্যার ও রাশেদের অভিমানের পালা। এ-অভিমান কি শেষ হবে না? রাশেদ পেছনের বেঞ্চে বসে বসে হাঁপিয়ে উঠছে, পাগল হয়ে উঠছে সামনের বেঞ্চে বসার জন্যে, কথা বলতে না পেরে দম বন্ধ হয়ে। আসছে তার; কিন্তু সে সামনের বেঞ্চে বসবে না, কোনো কথা বলবে না স্যারের ক্লাশে। আমি কি কোনো অপরাধ করেছিলাম, রাশেদ নিজের সাথে কথা বলে মাঝেমাঝে, আমি তো আনন্দে বলে ফেলেছিলাম ওই লাইনগুলো, তার জন্যে আমার তো ওই অপমান পাওয়ার কথা ছিলো না; আমি আগে কথা বলবো না স্যারের সাথে, স্যার বললেই কথা। বলবো আমি। সেদিন রাশেদ শেষ বেঞ্চে বসে আছে, হেডস্যার পড়াচ্ছেন ইংরেজি ব্যাকরণ, মন দিয়ে শুনছে রাশেদ; স্যার একটি উদাহরণে পড়লেন ‘আর্কিটেক্ট’, শুনে। চমকে উঠলো রাশেদ। স্যার বাক্যটি শেষ করেই বললেন, রাশেদ, তুমি কি কোনো। দিন কথা বলবে না? স্যার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়াচ্ছেন, বইটি তাঁর হাতে, স্যারের কথা শুনে সবাই তাকালো রাশেদের দিকে। রাশেদ তো অনেক দিন ধরেই কথা বলতে চায়, এখন সময় এসেছে, কিন্তু সে কি এখন মারাত্মক কথাটি বলবে, যা তার মনে আসছে? তাতে কি স্যার সুখী হবেন? নাকি আরো রেগে যাবেন? রাশেদ দাঁড়ালো, সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে; মৃদু স্বরে বললো, স্যার, ওই শব্দটি হচ্ছে ‘আর্কিটেক্ট’। চমকে উঠলেন স্যার, চমকে উঠলো সবাই; স্যার বইটি খুলে আরেকবার পড়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তিনি উচ্চারণ করলেন না শব্দটি। অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি, তাদের ক্লাশটিতে নীরবতা ভারি হয়ে উঠলো পাথরের মতো। স্যার একটু বিচলিতভাবে বেরিয়ে গেলেন ক্লাশ থেকে, মাথা নিচু করে শেষ বেঞ্চে বসে রইলো রাশেদ, আর সবাই নিশ্ৰুপ হয়ে বসে রইলো। এমন নীরবতা তাদের জীবনে আর আসে নি। কিছুক্ষণ পর তার ঘর থেকে ফিরে এলেন হেডস্যার, সরাসরি হেঁটে এলেন রাশেদের কাছে, ক্লাশের সবাই নিশ্বাস বন্ধ করে ফেলেছে, স্যার জড়িয়ে ধরলেন রাশেদকে। হু হু করে কেঁদে ফেললো রাশেদ। রাশেদকে জড়িয়ে ধরে প্রথম বেঞ্চে এনে বসিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি সব সময় প্রথম বেঞ্চে বসবে, ওটিই তোমার স্থান। মাথা নিচু করে বসে রইলো রাশেদ, তার মনে গুনগুন করতে লাগলো, সব সময়, সব সময়।
নরকভ্রমণ
অধ্যাপিকা উপস্ত্রীটির সাথে দিন ভালো যাচ্ছে না রফিকের, এক সময় যে ছিলো রাশেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যার সাথে আজকাল দেখা হয় না, বা দেখা হয় যখন রফিক হঠাৎ খারাপ থাকতে শুরু করে;-সহযোগী অধ্যাপিকা সহযোগিতা করছে না, ডাকে সাড়া। দিচ্ছে না, টেলিফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না, আসবে বলে কথা দিয়ে আসছে না, বড়ো একবাক্স রাজার গায়ে ছাতা ধরছে, সে একটা প্রভাষক বালককে খাচ্ছে টের পাচ্ছে। রফিক, বালকটি অনেক বছর বেকার থাকার পর এখন খুব কর্মময় জীবন যাপন করছে, আর অস্থির হয়ে উঠছে রফিক; এবং বিশে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায়, রাশেদ যখন বেরোতে। যাচ্ছে, হঠাৎ এসে উঠেছে একটি মহৎ ভাবনা বুকের ভেতর পুষতে পুষতে। রফিক শহিদ মিনারে যেতে চায়, অনেক বছর তার ওই শুচিকর জায়গাটিতে যাওয়া হয় নি, অঢেল ময়লা জমে গেছে বুকের নর্দমায় নর্দমায়, ময়লা কিছুটা সে সাফ করতে চায় শহিদ মিনারে গিয়ে। রাশেদই কি আর শহিদ মিনারে যায়, সে-ই কি আর সাহস করে ওখানে যেতে? রফিক একটি মাঝারি মাপের আমলা হয়েছে, আর ভালো কাজ করেছে একটি যে বিয়ে করে নি, যদিও তার বিয়ে করার কথা ছিলো সবার আগে, আর বিয়ে করবে বলেও মনে হচ্ছে না; তার চারপাশে যতো দিন আছে রূপসী দয়াবতী বিষণ্ণ। প্রসন্ন বিধবারা আর অতৃপ্ত আপারা, ততো দিন রফিক বিয়ে করে উঠতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। আপা বলেই এ-সহযোগিণীর সাথে তার সম্পর্ক শুরু হয়েছিলো যখন। সে একটি মহাবিদ্যালয়ে পড়াতো, আজো আপাই বলে; রাশেদ রফিকের সাথে আপামণির বাসায়ও গিয়েছিলো একবার, দেখেছিলো রফিক অশেষ শ্রদ্ধা করে আপামণিকে, আপার ঝিমধরা স্বামীটিও তার বিনয়ে গলে যাচ্ছিলো, আর রফিক রাশেদ ও আপার স্বামীটিকে ড্রয়িংরুমে চা ও সামরিক আইনে ব্যস্ত রেখে ভেতরে টেলিফোন করতে গিয়ে মৃদু চুমো খেয়ে আসছিলো আপাকে, রফিকের ঠোঁট দেখে রাশেদের তাই মনে হচ্ছিলো। বিয়ে করে নি বলে রফিক একটি স্বাধীনতা উপভোগ করে, যেখানে ইচ্ছে সেখানে থাকতে পারে, থাকেও, এখন আছে সাংসদাবাসে, তার এক আত্মীয়। উদ্দিন মোহাম্মদের সাংসদ হয়ে একটি বড় কক্ষ পেয়েছে, যদিও সেখানে সাধারণত থাকে না। রফিক দরকারে ওই কক্ষটি ব্যবহার করে; উদ্দিন মোহাম্মদের দলে তার সমাজতন্ত্রী আত্মীয়টি যোগ দিয়েছিলো বলেই রফিক স্বর্গের স্বাদ পাচ্ছে। আপামণির একটা রোগ রয়েছে, যার নাম সতীত্বরোগ; প্রতিবারই সে একটি কথা বলে রফিককে, আমাকে কিন্তু তুমি অসতী ভেবো না, আমি অন্যদের মতো নই; রফিক আপামণিকে। জানায় যে তার মতো সতী রফিক কখনো দেখে নি, তখন আপার মুখটিকে অক্ষত। সুন্দর লাজুক নববধূর মুখের মতো দেখায়। রফিকের এক প্রিয় সুখ ওঠার পর আপার স্বামীটিকে ফোন করা; মজা করার জন্যেই এটা শুরু করেছিরো রফিক, পরে এটা তার প্রধান সুখ হয়ে দাঁড়ায়; প্রথম যেদিন ওঠার পর সে নম্বর ঘোরাতে শুরু করেছিলো। লাফিয়ে উঠে আপা তাকে মেঝের ওপর ফেলে দিয়েছিলো, কিন্তু অশ্বীটিকে বশ মানিয়ে নিয়েছিলো রফিক, চড়তে যে জানে সে পড়ে গেলেও আবার উঠতে জানে; তার পর থেকে আপা এটি উপভোগ করতে থাকে, টেলিফোন সেটটি দূরে থাকলে সে প্রস্তুতি হিশেবে সেটটি এনে রাখে বিছানার পাশে, পুলকের পূর্বমুহূর্তে সে চিৎকার করে, টেলিফোন টেলিফোন, রফিক নিশ্চল হয়ে আপার স্বামীকে ফোন করে, ব্যবসা কেমন চলছে তার সংবাদ নেয়, সামরিক আইন গণতন্ত্র সমাজ রাষ্ট্র নীতি সততা রাষ্ট্রধর্ম হিন্দি সিনেমা এনজিও পান নারী পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে আলোচনা করে, আপার সংবাদও নেয়; চোখ বন্ধ করে আপা তখন অধিত্যকাপর্ব যাপন করতে থাকে, আর রফিক খোদা। হাফেজ বলার সাথে সাথে প্রচণ্ডভাবে বিস্ফোরিত হয় আপা। পুলক কাকে বলে আপা তা জানতো না তিনটি মেয়ে একটি ছেলে জন্ম দেয়ার পরও, রফিকই তাকে তা শেখায়, এবং এক সময় সে তিনটি চারটি পাঁচটি দশটি পনেরোটি বিশটি পুলকে চুরমার হয়ে যেতে থাকে। সেই আপা এখন একটি প্রভাষককে খাচ্ছে, রফিকের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না, রফিকের মনে হচ্ছে মনের খোড়লে খালে নর্দমায় বড়ো বেশি ময়লা জমে গেছে; তার মনে পড়েছে শহিদ মিনারকে।
