রাশেদ ঘুম থেকে উঠে দেখে বিলু আপার ভেজা শাড়িটা উত্তরের ঘরের পাশে একটি রশিতে ঝুলছে, তার পাশে ঝুলছে একটা ভেজা লুঙ্গি; বিলু আপার শাড়িতে একটা বড়ো কালচে দাগ দেখে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ঘরে ঢুকে দেখে বিলু আপা বিছানার ওপর স্থূপের মতো পড়ে আছে, রাশেদ ডাকতেই বিলু আপা মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়, রাশেদ তার মড়ার মতো মুখ দেখে চমকে ওঠে। তার গালে লাল দাগ, রাশেদ মুখ ঘুরিয়ে নিলো অন্য দিকে; বিয়ের পর মেয়েদের মুখে এমন দাগ সে আরো দেখেছে। রাশেদকে বসতে বলে বিলু আপা, নিজেও একবার বসার চেষ্টা করে, কিন্তু বসতে না পেরে আবার স্কুপের মতো শুয়ে পড়ে। বিলু আপার তো কোনো অসুখ ছিলো না, বিলু আপা তো এতো দুর্বল ছিলো না, বসার চেষ্টা করে বিলু আপা তো কখনো শুয়ে পড়ে। নি। রাশেদের মনে হয় বিলু আপা সম্পূর্ণ চুরমার হয়ে গেছে, তার মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, সে আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারবে না। দুলাভাইটিকে খুব প্রফুল্ল মনে হচ্ছে, মনে হচ্ছে বিজয়ী, সে কিছু একটা জয় করেছে এমন একটি ভাব সে রাশেদের কাছেও প্রকাশ করছে। সে বিলু, বিলু নাম ধরে বিলু আপাকে ডাকছে মাঝেমাঝে, রাশেদের তা ভালো লাগছে না; তার মনে হচ্ছে বিলু আপার নাম ধরে ডাকার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? সারা দিন বিলু আপা উতেও বসলো না, পড়ে রইলো স্কুপের মতোই; পরের রাতে রাশেদ আবার শুনতে পেলো বিলু আপার না, না, না, আর কান্না। ভোরে বিলু আপা দাঁড়াতেই পারলো না, সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে বিলু আপাকে। পাল্কি এসে গেছে। রাশেদদের বাড়ি থেকে বিলু আপা আর তার জামাইকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে; পাল্কিতে উঠোনোর সময় বিলু আপা দাঁড়াতেই পারলো না। বিছানা থেকে নেমে একবার দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলো, দাঁড়াতে পারলো না, মেঝেতে পড়ে যাচ্ছিলো, তাকে পাল্কিতে উঠোনো হলো ধরাধরি করে। বাড়ি পৌঁছোনোর পর রাশেদ দেখে সবাই খুব। খুশি, সেও খুশি হওয়ার চেষ্টা করলো, বিলু আপাকে নামানোর পর তাকে পিঁড়িতে বসাতে গেলে বিলু আপা গড়িয়ে পড়ে গেলো। ধরাধরি করে বিলু আপাকে শুইয়ে দেয়া হলো বড়ো ঘরের কেবিনে, স্কুপের মতো পড়ে রইলো বিলু আপা; তার সইরা, পুষু আর পারুল আপা, বসে রইলো পাশে। উত্তরের ঘরে বিছানা পাতা হয়েছিলো বিলু আপা আর জামাইর জন্যে, সেখানে গেলো না বিলু আপা; জামাইকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো, জামাইটিকে ম্লান দেখাতে লাগলো।
রাশেদকে ডাকছে বিলু আপার জামাই, ওই লোকটিকে দুলাভাই ভাবতে এখনো। রাশেদের কেমন যেনো লাগছে, তার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না রাশেদের, মনে হচ্ছে সে তাকে ছুঁলে সেও নোংরা হয়ে যাবে বিলু আপার মতো। বিলু আপাকে দেখতে ইচ্ছে করছে রাশেদের, তবে দ্বিধা হচ্ছে কেবিনে ঢুকতে, সেখানে মেয়েলোকেরা ফিসফিস করে কথা বলছে। পাশের বাড়ির বুড়িটি বলছে, মরদ জামাই অইলে অ্যামুনিই অয়, মাজা ভাইঙ্গা দেয়, জোয়াইনকাগ কি সবুর সইয্য অয়। রাশেদের ইচ্ছে করে পালিয়ে যেতে, কিন্তু পারে না সে; খেজুরগাছের গোড়ায় বসে কখনো, আমগাছে হেলান দিয়ে। দাঁড়িয়ে থাকে, কখনো গিয়ে বসে পড়ার টেবিলে। বইগুলোকে অচেনা মনে হয়। সন্ধ্যার পর বিলু আপাকে উত্তরের ঘরে নেয়ার কথা ওঠে; কেউ কেউ বলে জামাই একলা আছে, মেয়েকে ওই ঘরে পাঠানো দরকার, কিন্তু বিলু আপা যেতে রাজি হচ্ছে না। কেউ শুনছে না তার কথা, রাজি না হওয়ার অধিকার তার নেই, বসতে না পারলেও তাকে যেতে হবে, জামাই একলা রাত কাটাতে পারে না। জালালদ্দির বউ ভণ্ডকথা বলতে পারে গান গাওয়ার মতো, কিছু আটকায় না তার মুখে; সে লোকটিকে বলছে, নাতনি ত জামাইর লগে হুইতে চায় না, আমার নাতনিডারে ত খুইদ্যা হালাইছ, আইজ রাইতে আমারে লইয়াই হোও সোনারচান। লোকটিও কম যায় না, বলছে নাতনিরে লইয়া আসেন, দুইজনরে লইয়াই শুই, দুইজনের মাজাই ভাইঙ্গা দেই। তারা দুজনেই ভণ্ডকথায় মেতে ওঠে, রাশেদ আমগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে শুনছে তাদের কথা, তার ঘেন্না লাগছে, কিন্তু দূরে চলে যেতে পারছে না। লোকটিকে খুব অস্থির মনে হচ্ছে, একা একা থেকে সে অস্থির হয়ে উঠেছে; সে জালালদ্দির বউকে বলছে, নাতনিরে লইয়া আহেন, আর কতোক্ষণ একলা থাকব। জালালদ্দির বউ ছুটে গেলো বড়ো ঘরের দিকে, সে নিশ্চয়ই মাকে খবর দিতে গেলে যে জামাই উতলা হয়ে উঠেছে মেয়ের জন্যে, এখনি পাঠাতে হবে তাকে। রাশেদ বড়ো ঘরে গিয়ে দেখলো বিলু আপা রাজি হচ্ছে না, কিন্তু তাকে যেতে হবে; মা তাকে যেতে বলছে, অন্য মেয়েলোকেরাও বলছে যেতে, জামাই একলা থাকলে মেয়েলোকের গুনা হয়। তারা জোর করে বিলু আপাকে কেবিন থেকে উঠিয়ে নিয়ে এলো, বিলু আপা হাঁটতে পারছে না, পা ফেলতে কষ্ট হচ্ছে তার, সে পড়ে গেলো; তিনটি মেয়েলোক চেষ্টা করেও বিল আপাকে তুলতে পারছে না। জালালদ্দির বউ লোকটিকে ডেকে বললো, অ সোনারচান, নিজের জিনিশ নিজেই কান্দে কইরা লইয়া যাও। লোকটি সম্ভবত এরই জন্যে অপেক্ষা করছিলো, সে বেরিয়ে এসে পাজা কোলে করে তুলে নিয়ে গেলো বিলু আপাকে, বিলু আপা তার কোলে পড়ে রইলো একটা মৃত মেষের মতো।
কয়েক দিন বেড়িয়ে লোকটি বিলু আপাকে রেখে চলে গেলো, তাদের বাড়ি গেলো না, চাকুরি করতে শহরে চলে গেলো। এ-ক-দিন রাশেদ বিলু আপার দিকে তাকাতে পারে নি, এবার তাকিয়ে দেখলো বিলু আপা হাঁটতে না পারলেও মিষ্টি করে হাসছে, তাকে সুখী মনে হচ্ছে, তাতে রাশেদ আহত বোধ করলো অনেকটা, আবার ভালোও লাগলো। বিলু আপার শরীর থেকে অন্য রকম গন্ধ উঠছে, আগে বিলু আপার শরীরে গন্ধরাজের গন্ধ ছিলো, এখন সেখানে সেন্টের গন্ধ উঠছে, ওই গন্ধে চঞ্চল হয়ে উঠছে রাশেদের রক্ত। লোকটি দু-তিনটি বই দিয়ে গেছে বিলু আপাকে, একটি হচ্ছে সে-বইটি যেটি পড়তে গিয়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো রাশেদ, যাতে মেয়েটির চুল কেটে নিয়ে। গিয়েছিলো পুরুষটি আর মেয়েটি সংগ্রহ করে রেখেছিলো পুরুষটির জুতো, যে-বই রাশেদ শেষ করতে পারে নি বাবা কেড়ে নিয়েছিলেন বলে; রাশেদ বইটি দেখে আবার চঞ্চল হয়ে উঠলো। বইটি কি সে এখন পড়তে পারে? বিলু আপার কাছে চাইলে কি বিলু আপা তাকে দেবে বইটি? নাকি সে এখনো ওই বই পড়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে নি? তবে তার পড়তে খুব ইচ্ছে করছে। রাশেদ বিলু আপাকে না বলেই বইটি নিয়ে এলো, চুপ করে পড়তে বসলো টেবিলে, মনে মনে ভয় লাগতে লাগলো; তবে এবার আর ভালো লাগছে না, তার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করলো লেখক সম্পর্কে, কাহিনী সম্পর্কে; মনে হলো লেখক চান তাঁর পাঠকপাঠিকাঁদের খাঁটি মুসলমান করে তুলতে, রাশেদের। মনে প্রশ্ন জাগছে সে নিজে কি এমন পুরুষ হবে? না, সে এমন পুরুষ হবে না। লোকটি এক আস্ত মৌলভি, এমন লোক তার পছন্দ নয়; বউটিও কম নয়, সে এক মহিলা। মৌলানা। হতাশ হলো রাশেদ বইটি শেষ করে, এমন বাজে বই সে আর পড়বে না। মুসলমান লেখকেরা কেনো ভালো বই লিখতে পারে না, এমন একটি প্রশ্নও দেখা দিলো রাশেদের মনে। পরদিন রাশেদ আরেকটি বই নিয়ে এলো বিলু আপার বইগুলো থেকে, বইটা খুলেই একরাশ সুরা আর দোয়ার মধ্যে পড়ে গেলো; কথায় কথায় যে এতো দোয়া পড়তে হয়, তা জানা ছিলো না তার। এতে দোয়া পড়তে হলে সবাইকে মৌলভিসাব হতে হবে। প্রায় সব কিছুই তার মনে হলো হাস্যকর আর অপাঠ্য, পড়ার কিছু নেই বইটিতে; রাশেদ পাতা উল্টোতে লাগলো, এক জায়গায় এসে রাশেদ চমকে উঠলো, দেখলো লেখা রয়েছে, যদি আমি কাহাকেও সেজদা করিতে হুকুম করিতাম। তবে নিশ্চয়ই স্ত্রীদিগকে হুকুম করিতাম যে, তোমরা তোমাদের স্বামীগণকে সেজদা কর। পড়ে ভয় পেয়ে গেলোরাশেদ, সে কখনো এভাবে দেখে নি, সে মা ও বাবাকে সমানই দেখে এসেছে যদিও বাবাকে বেশি ভয় করেছে। কিন্তু বইটি বলছে পুরুষরা। বউদের কাছে অনেকটা আল্লার মতো। বিলু আপার কাছে ওই লোকটি অনেকটা আল্লার মতো? রাশেদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে, ভয় হচ্ছে পাতা উল্টোতে, কিন্তু পাতা উল্টোতেই তার চোখে পড়লো লেখা রয়েছে, পুরুষগণ (আপন আপন) স্ত্রীগণের উপর কর্তা, কেননা আল্লাহতাআলা একের উপর অন্যকে সম্মান দিয়াছেন। এর পর লেখা আছে, এই আয়াতে বুঝা যায় যে, পুরুষগণ সকল সময়েই আপন আপন স্ত্রীগণের সর্বাঙ্গের উপর কর্তা। অতএব তাহারা যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতে পারিবেন। স্ত্রীরও কর্তব্য এই যে, সর্বদা তাহার স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখিয়া তাহার হুকুম তালীম করিয়া চলিতে থাকে। তাহা হইলে মৃত্যুর পরেই সে বেহেশতে যাইতে পারিবে। মেয়েরা পুরুষদের দাসী? রাশেদ একবার ভাবলো, দেখলো তাই তো, তাদের গ্রামের সব মেয়েলোকই তো দাসীর মতো, তার চেয়েও খারাপ স্বামীদের কাছে। বিলু আপাও এখন ওই লোকটির দাসী, ওই লোকটি বিলু আপার ওপর যা ইচ্ছে তা করতে পারবে।
