শহিদ মিনারে গিয়ে সাফ হতে চায় রফিক, ভেতরটাকে ধুয়েমুছে ধবধবে করে। তুলতে চায়, আরেকবার দেখতে চায় ভেতরটা পরিষ্কার হলে সুখ লাগে কিনা; রাশেদের নিজেরও সাফ হওয়া দরকার, বিস্তর ময়লা জমে গেছে তারও ভেতরে;–কোথায় ময়লা জমে নি নষ্টভ্রষ্ট দেশে?–রাশেদের ভয় হতে থাকে যদি গিয়ে দেখতে পায়, রাশেদ ভাবনাটাকে ভিন্ন পথে চালানোর জন্যে ভিন্ন ভালো মহৎ কিছু ভাবার চেষ্টা করে, সে কি ভিন্ন ভালো মহৎ কিছু ভাবার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে?-আবার ভয়ানক ভাবনাটি এসে তার ওপর ভর করে, যদি গিয়ে দেখতে পায় মিনারের মনেও ময়লা লেগেছে? কেনো লাগবে না? মিনার তো মানুষেরই হৃদয়, সেই মানুষের ভেতরে ময়লা জমলে হৃদয় কেনো ময়লা হবে না, কেনো শুভ্র থাকবে? শহর আবর্জনায় ঢেকে গেলে মিনার কী করে এড়াবে আবর্জনা? মিনার, তোমার কোনো শক্তি আছে? তুমি শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে পারো, যদি আমাদের থাকে, সে-প্রতিভা, সেই সব বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির কথা; আমরা যখন পশু হয়ে উঠি, হয়ে উঠি দশকে দশকে, তখন আমাদের কিছু স্মরণে থাকে না। আমরা কি পশু হয়ে উঠছি না, নিজেকে জিজ্ঞেস করে রাশেদ, পশুর কি স্মৃতি বিশ্বাস প্রতিশ্রুতি থাকে অনেক বছর পর অনেকক্ষণ ধরে রফিকের সঙ্গ ভালো লাগছে রাশেদের, সুস্থ লাগছে, রফিকের ভেতর থেকে হঠাৎ-বেরিয়ে-পড়া কাতরতা কোমল। করে তুলছে রাশেদকে। রাশেদ কোমল হতে চায়, শিউলির মতো পাতার ওপরই ঝরে ভিজতে চায় শিশিরে, ছেলেবেলায় যেমন ঝরতো। রাত এগারোটার মতো হবে হয়তো তখন, মিনারের পশ্চিমের চৌরাস্তাটিতে গিয়ে পৌঁছোয় তারা, পুরোনো অভ্যাসে জুতো খুলে হাতে নেয়, হাতে নিয়েই বুঝতে পারে তারা মানাচ্ছে না সেখানে, গ্রাম্য মনে হচ্ছে তাদের; অন্য কারো হাতে জুতো নেই, সবাই ভদ্রলোকের মতো জুতো পরে আছে। অতীত থেকে দুটি মানুষ গিয়ে পৌঁচেছে নতুন কালের উৎসবে, তারা বুঝতে পারছে না উৎসবের রীতিনীতি, নিজেদের আগন্তুক মনে হচ্ছে। আমার মনেই শুধু ময়লা জমে নি, রফিক বললো, দেখছি সবার মনে থেকেই ময়লা উপচে পড়ছে, এতে ময়লা মিনার সহ্য করবে কীভাবে? উত্তরের দেয়ালটিতে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা বাণীগুলো পড়ে হো হো করে উঠলো রফিক, বললো, এ-বাণীগুলোতেও দেখছি প্রচুর ময়লা, এই সব পুরোনো বাণী আজো অর্থ প্রকাশ করে? দুটি বানান ভুলও ধরলো। বললো, বাঙালির বুক থেকে নতুন কোনো বাক্য বেরোয় নি, যা এখানে জ্বলজ্বল করতে পারতো? নতুন বাক্য কোথা থেকে বেরোবে, বেরোলেও সে-সব স্বীকার করবো কেননা, পুরোনো বাক্যই সত্য আমাদের কাছে, ওই পুরোনোকে পেরিয়ে আরো পুরোনোতে ফিরে যেতে হবে। রফিক আবার বললো, একটি মেয়েও যে দেখছি না? শহিদ দিবস এখন পুরুষদের দিবস? মেয়ে দেখা যাবে কেননা, দেশটা এখন অনেক বেশি পাকিস্থান হয়ে গেছে, যখন এটা পাকিস্থান ছিলো তখনো মেয়েরা আসতো, এখন আসে না, আসতে পারে না, দেশটা খাঁটি মুসলমানের দেশ হয়ে যাচ্ছে; একদিন হয়তো পাকিস্থানকে পেরিয়ে ইরান-আফগানিস্থান হয়ে উঠবে। তখন ফুল দেয়া যাবে না, মিলাদ পড়াতে হবে, বা এটিকে ভেঙে ফেলে একটা মসজিদ বা মাজার তোলা হবে। সেই আলপনা কই, সুর কই, বিষণ্ণতা কই, বেদনা কই, সুখ কই? এমন সময় কোলাহল শোনা গেলো, দৌড়োতে শুরু করলো। লোকজন, কয়েকটি বোমা ফাটলো; রাশেদ আর রফিক ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে। যাচ্ছিলো, কোন দিকে যাবে বুঝতে না পেরে দৌড়োতে লাগলো। তারা খুব হাঁপিয়ে উঠেছে, আর দৌড়োতে পারছে না, মনে হচ্ছে বহু দূর চলে গেলে তারা শান্তি পাবে, হয়তো পাবে না, তবু বহু দূর চলে যেতে হবে। তখন রফিক প্রস্তাবটি দিলো, তার। সাথে সাংসদাবাসে যাওয়ার; বললো, স্বর্গে থাকা হলো না, ময়লাও সাফ হলো না, চলো এবার নরকে যাই।
তারা যখন গিয়ে পৌঁছোলো তখন দেরি হয়ে গেছে, তবে উৎসব শুর হয় নি, দুটি মন্ত্রী জুয়ো ছেড়ে উঠতে চাইছে না বলে শুরু হতে পারছে না। জুয়ো খেলা চলছে দুটি টেবিলে, একটি করে মন্ত্রী আছে প্রত্যেক টেবিলেই, সঙ্গে খেলছে কয়েকটি সাংসদ আর আমলা, তাদের ঘিরে আছে আরো কয়েকটি আমলা আর সাংসদ। মন্ত্রী দুটিকে আর। আমলাগুলোর প্রায় সব কটিকেই চেনে রাশেদ, সাংসদগুলোকে চেনে না। একটা মন্ত্রী অনেক আগে তাকে ভাই ভাই করতো দেখা হলে, শ্রেণীসংগ্রাম বিপ্লব আবৃত্তি করতো, আজ তার দিকে তাকালো না, তাকাবার সুযোগ পেলো না, আমলাগুলো তাকে যেভাবে স্যার স্যার করছে তাতে সে রাশেদকে হয়তো আজ ভাই বলতে চায় না, বেঁচে গেলো রাশেদ, ভাই ভাই শুনতে আর ভালো লাগে না; আরেকটি রফিকের সহপাঠী ছিলো ইস্কুলে, প্রবেশিকায় ফেল করেছিলো একবার বা দুবার, নাম করেছিলো দু-তিনজনকে মাটির ওপরভাগ থেকে সরিয়ে দিয়ে, মাটির সাথে মানুষের সমন্বয় ঘটিয়ে, এখন মন্ত্রী হিশেবে নাম করছে, আরো নাম করবে। আমলা কটা নতুন যুগ্মসচিব হয়েছে, ঝিলিক, বেরোচ্ছে চোখমুখ থেকে; একটির বউ কিছু দিন আগে একটি সচিবের ঘরে গিয়ে উঠেছে বলে তাকে একটু বিষণ্ণ দেখাচ্ছে; তারা নিঃসন্দেহে খুবই যোগ্য, মন্ত্রী দুটিকে স্যার স্যার করে পাগল করে তুলছে; রাশেদ জুয়ো খেলা না বুঝলেও বুঝতে পারছে। বদমাশ মন্ত্রী দুটি পেরে উঠছে না প্রতিভাবান আমলাগুলোর সাথে, ওরা প্রথম শ্রেণী পেয়েছিলো বিএ (অনার্স)-এ;–রাশেদ জানে বাঙলাদেশের আমলাগুলোর মতো। প্রতিভাবান আমলা পৃথিবীতে নেই,–আমলাগুলো তো পুষিয়ে দিচ্ছে স্যার স্যার বলে, হয়তো অন্যভাবেও পুষিয়ে দেবে। রাশেদ আধঘণ্টা আগে বোমার মধ্যে পড়েছিলো, এখন মনে হচ্ছে বোমায় যদি একটা হাত ছিঁড়ে দুটি পা উড়ে গিয়ে সে পড়ে থাকতো। চৌরাস্তায়, তাহলে অনেক সুস্থ থাকতো। ময়লা সাফ করতে বেরিয়ে ময়লা জমে উঠছে বেশি করে তার ভেতরে, সে এতো ময়লা নিয়ে কী করে উঠে দাঁড়াবে? জুয়ো শেষ। হলে আরেকটি কক্ষে যেতে হলো, সেখানে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে; বিদেশি গান বাজছে কান ছিঁড়েফেড়ে, টেবিলে ঝকঝক করছে সারি সারি বোতল, অল্প অল্প নাচছে দশবারোটি উঠতি অভিনেত্রী/মডেল, একটা বিজ্ঞাপনসংস্থা আজ রাতের জন্যে। উপহার দিয়েছে এই সজীব শিল্পকলাগুলো, একুশের মহৎ উৎসবে সামান্য উপহার দিতে পেরে সংস্থাটি নিজেকে ধন্য মনে করছে নিশ্চয়ই। হয়তো অনেক কাজ পেয়েছে সংস্থাটি, ভবিষ্যতে আরো অনেক কাজ পাবে, আরো অনেক শিল্পকলা উপহার দেবে।
