ওই সুন্দরের আগুনে যদি তার চোখ পুড়ে যেতো, রক্ত ছাই হয়ে যেতো, সুখ পেতো রাশেদ; কিছুই না পুড়ে তার ভেতরে লাখ লাখ চোখ নিশ্চল হয়ে তাকিয়ে আছে ওই সৌন্দর্যের দিকে। চোখ কেনো আরো বেশি করে দেখতে পারে না, চোখ দিয়ে কেনো ছুঁয়ে দেখা যায় না, কেনো স্বাদ নেয়া যায় না চোখ দিয়ে? যদি তার চোখ ছুঁয়ে দেখতে পারতো ওই সৌন্দর্যকে, জিভের মতো স্বাদ নিতে পারতো ওই সৌন্দর্যের, তাহলে হয়তো সে এমন কিছু অনুভব করতে, যাকে বলা হয় সুখ। রাশেদ মামাবাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, হাঁটতে থাকে নিজেদের গ্রামের দিকে, সে দেখতে পায় দুলছে ধবধবে যুগল চাঁদ, বন জুড়ে দুলছে যুগল ফল। আমি আর আগের মতো নেই, রাশেদ মনে মনে নিজেকে শোনায়, আগের মতো কখনো হবো না, আমি এখন অনেক কিছু জানি, আমি অনেক কিছু দেখেছি, আমি আরো অনেক কিছু জানবো, আরো অনেক কিছু আমি : দেখবো। আজিজকে সে বলবে তার এ-অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা? না, সে বলবে না। কাউকে; সে নিজের ভেতরে বইবে অলৌকিক সৌন্দর্য, অভাবিত অভিজ্ঞতা; কারো কাছে সে তার সুন্দরকে প্রকাশ করবে না। অনেক দিন ধরেই রাশেদ টের পাচ্ছে এমন সুন্দর আছে, যা রক্তমাংসের সাথে বাঁধা; কচুরিফুলের বা মেঘের বা পদ্মার পশ্চিম পাড়ে সূর্যাস্তের সৌন্দর্যের সাথে রক্তমাংসের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু যে-সুন্দর সে আজ দেখেছে, তার জন্ম তার রক্তে তার মাংসে, তা তার রক্তমাংসের সাথে জড়ানো। সে নিজেকে বহন করতে পারছে না, তার রক্তমাংসে সুন্দর যে-চাপ সৃষ্টি করেছে, তাতে সে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো বিলু আপার, রাশেদের পছন্দ হয় নি, কিন্তু সে কারো কাছে তার অপছন্দ প্রকাশ করে নি; তাহলে হয়তো বিয়ে হবে না, তখন মা কষ্ট পেতে থাকবে বাবা কষ্ট পেতে থাকবেন বিলু আপাও কষ্ট পেতে থাকবে, আর কষ্ট পেতে। থাকবে সে নিজে, নিজেকে তার মনে হবে অপরাধী। লোকটিকে দেখতে একেবারেই ভালো লাগে নি রাশেদের, বা এমনও হতে পারে বিলু আপাকে বিয়ে করতে চায় এমন কোনো লোককেই তার পছন্দ হয় না; আর বিলু আপা তো দেখেই নি লোকটিকে; মেয়েদের দেখতে হয় না, সব পুরুষই মেয়েদের জন্যে সুন্দর, দশজনের মধ্যে একজন, রাজপুত্র। বিলু আপা একদিন রাশেদকে জিজ্ঞেস করেছিলো, লোকটি দেখতে কেমন রে; রাশেদ তার কোনো উত্তর দেয় নি, বিলু আপা বুঝেছিলো রাশেদ কেনো উত্তর দিচ্ছে না, তখন সে বলেছিলো, আমার ভাগ্যে কি আর রাজপুত্র আছে? তবে বিলু আপাকে সুখীই মনে হচ্ছিলো, বিয়ে হচ্ছে এটাই সুখ, ক-দিন খুব ফিসফিস করেছিলো পুষু আপা আর পারুল আপা বিলু আপার সাথে, রাশেদ তাতে কান দেয় নি, তার মনে হয়েছিলো। মেয়েরা একই বিষয়ে দিনের পর দিন ফিসফিস করতে পারে। বিলু আপাকে আর আমগাছের পাশে দাঁড়িয়ে দিগন্তের ওই পারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না, এতেই সুখ পাচ্ছিলো রাশেদ। লোকটি বিলু আপার থেকে অনেক বড়ো হবে, তেরো-চোদ্দ বছরের বেশি হবে, হাসতেই জানে না, আইএ ফেল, রাশেদের পছন্দ হয় নি, কিন্তু সে কোনো কথা বলে নি। লোকটিকে দুলাভাই বলতে হবে, খুব লজ্জা লাগবে রাশেদের, প্রথম প্রথম হয়তো সে লোকটিকে দুলাভাই বলতেই পারবে না। বিলু আপার বিয়ে হয়ে গেলো, রাশেদ সাথে গেলো বিলু আপার শ্বশুরবাড়িতে; পাল্কি থেকে বিলু আপাকে। নামানোর সময় রাশেদ শুনতে পেলো মেয়েরা বিলু আপাকে কালো বলছে, শুনে। রাশেদের মুখ শুকিয়ে গেলো, মনে হচ্ছিলো সে কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না। বিলু। আপার শাশুড়ি বউ নামাতেই এলো না, কয়েকটি মেয়েলোক বিলু আপাকে নামিয়ে নিয়ে গেলো উত্তরের ঘরটিতে। বিলু আপা কি তখন কাঁদছিলো, কিন্তু রাশেদের কান্না পাচ্ছিলো। অনেক পরে রাশেদ গেলো বিলু আপার কাছে, বিলু আপা বুড়ো ঘোমটা দিয়ে বসে আছে, যে-ই আসছে সেই বলছে, ভাইটা দেহি সোন্দর, বইনটা এমন কালা অইল ক্যামনে, শুনে খুব রাগ হচ্ছিলো রাশেদের; একবার সে বলে ফেললো, আপা। কালো নয়, আপনারা কালো বলেন কেনো? বিলু আপার স্বামী বললো, কালরে কাল বলব না ত কী বলব? কান্না পাচ্ছিলো রাশেদের, খুব অপমান লাগছিলো তার; বিলু আপা কাঁদছিলো, রাশেদ বিলু আপাকে এমনভাবে কোনো দিন কাঁদতে দেখে নি। এতো খারাপ দিন রাশেদ আর কাটায় নি, সে ভেবেছিলো খুব আনন্দ হবে, কোনো কিছুই। তাকে আনন্দ দিতে পারছিলো না, যদিও সবাই তাকে খুবই আদর করার চেষ্টা করছিলো। তার ইচ্ছে করছিলো বিলু আপার পাশে বসে থাকতে, কিন্তু বেশিক্ষণ বসতে অস্বস্তি লাগছিলো, সে সারাক্ষণ বাড়ি ভরে হাঁটছিলো, কখনো বসে বসে কষ্ট চাপার। চেষ্টা করছিলো কালরাত, কালরাত কথাটি রাশেদ শুনতে পাচ্ছে বারবার। কোনো বাড়িতে বিয়ে হলেই কথাটি শোনা যায়, শুনে ভয় লাগে, আজ তার আরো ভয় লাগছে। বর-বউ যে-রাতে প্রথম একসাথে থাকে, সেটাকে বলে কালরাত। সেটা খুব ভয়ের রাত, জিন এসে ভর করতে পারে বর-বউর ওপর, এমনকি সাপ এসেও কামড় দিতে পারে বলে শুনেছে রাশেদ। দুলাভাইর দুলাভাই হয় এমন একটা লোক ঘিনঘিনে রসিকতা করার চেষ্টা করছে রাশেদের সাথে, বলছে, আমার শালাডা ত বিয়াইর বইনরে লইয়া থাকব রাইতে, বিয়াই থাকবা কার লগে, আমার লগেই থাইক্ক। রাশেদ এখন জানে কালরাতে কী হয়। বিলু আপা উত্তরের ঘরে থাকবে, কালরাত হবে ওই ঘরে, শুনছে রাশেদ; তার দুলাভাইটিকে একটু খুশি খুশি দেখাচ্ছে, কিন্তু রাশেদের কষ্ট হচ্ছে ভয় লাগছে। বিলু আপা আর বিলু আপা থাকবে না আজ রাতের পর, মনে হচ্ছে রাশেদের, বিলু আপা। নোংরা হয়ে যাবে, সাথে সাথে যেনো নোংরা হয়ে যাবে রাশেদও। বেশ রাত হয়ে গেছে, ঘুমোতে পারছে না রাশেদ, তখন রাশেদ বিলু আপার কান্না শুনতে পায় উত্তরের ঘর থেকে। বিলু আপা চিৎকার করে ওঠে নি, তাহলে রাশেদ লাফিয়ে উঠতো, কিন্তু রাশেদ শোনে খুব কষ্টের একটা কান্না ভেসে আসছে পাশের ঘর থেকে। রাশেদ অন্ধকারে কান পাতে, শুনতে পায় বিলু আপা না, না, না করছে, আর কাঁদছে, আর দুলাভাইটি খুব জোরে ধমক দিয়ে উঠছে। রাশেদ শুধু শুনতে পাচ্ছে বিলু আপার কান্না, তার ঘুম আসছে না, সে ঘুমোতে পারবে না। কারা যেনো অন্য ঘর থেকে বেরোলো, রাশেদ দু-তিনজন। মহিলার কণ্ঠ শুনতে পেলো; তারা উত্তরের ঘরের দরোজায় গিয়ে দুলাভাইর নাম ধরে ডাকলো। এক মহিলা বলছে, শুনতে পাচ্ছে রাশেদ, এমন বুড়া মাইয়া আবার : কালরাইতে কান্দে নি, আমাগ ত বিয়া অইছিল বার বচ্ছর বয়সে, আমরা ত কান্দি নাই, কালরাইতেই ত যা করনের করছিল, রাইত ভইরাই করছিল, লউয়ে বিছনা ভাইস্যা গেছিল। আরেক মহিলা বলছে, অ নাতি, আমরা ভাবছিলাম এর মইদ্যে যা করনের কয়বার কইর্যা হালাইছ, অহন দেকছি তুমি মরদ অও নাই, আগে আমাগ কইলেই ত আমরা রান ফাঁক কইর্যা ধরতাম, লউয়ে চাদ্দইর ভিজাইতে না পারলে আবার মরদ। কিয়ের। আরেক মহিলা বলছে, রাজি না অইলে পাও বাইন্দা লইতে অয়, মাইয়া মানুষ গরুর লাহান, পাও বাইন্দা জবই করন লাগে। তারা সবাই উত্তরের ঘরে ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে রাশেদের। রাশেদের ভয় হচ্ছে তারা সবাই মিলে এখন বিলু আপাকে হয়তো বাঁধবে। রাশেদ বিলু আপার কান্না শুনতে পাচ্ছে, না, না শুনতে পাচ্ছে। মহিলারা ঘর। থেকে বেরিয়ে এলো। এক মহিলা বলছে, চিৎ কইর্যা আতপাও বাইন্দা দিয়া আইলাম, অহনও যদি জোয়াইনকা না পারে তাইলে অর খুডাডা ভাইঙ্গা হালামু। আরেক মহিলা বলছে, যা মাইয়া তাইতে ত টু করনেরও কতা না, রজ্জইবারই মরনের কতা, এই। মাইয়ারে কাবু করতে অইলে অর খাড়নের জোর থাকব না। তখন রাশেদ একটা তীব্র চিৎকার শুনতে পায়, রাশেদ দু-হাতে কান বন্ধ করে বালিশে মাথা চেপে ধরে।
