রাশেদ ভেবেছিলো বিলু আপা রাজি হবে না মরির তেলইর পানি দিয়ে গোশল। করতে, তার ঘেন্না লাগবে, অপমান লাগবে। রাশেদ খুব উদ্বেগের মধ্যে থেকেছে দুটি দিন, বড়ো আত্মা যদি ধরা পড়ে, বিলু আপা যদি রাজি না হয়, তখন কেমন হবে; আর যদি বড়ো আম্মা ঠিকই পানি নিয়ে আসে, বিলু আপাও রাজি হয় ওই পানিতে গোশল করতে, তাহলেও তার রক্তে কাঁটা বিধতে থাকবে। তখন সন্ধ্যা গম্ভীর হয়েছে, রাশেদ পড়ার টেবিল থেকে শুনতে পাচ্ছে বড়ো আম্মা আর মা ডাকছে বিলু আপাকে। সন্ধ্যার পরেই রাশেদ ঘরের পশ্চিম কোণায় দেখেছে এক বালতি পানি, তার পর থেকেই তার মন অস্থির হয়ে আছে, সে পড়তে পারছে না, খুব অপমান লাগছে। বিলু আপা বড়ো আম্মা আর মায়ের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না, ঘরের কেবিনে চুপ করে বসে আছে; বড়ো, আম্মা কেবিনে ঢুকছে বিলু আপাকে বের করে আনার জন্যে, রাশেদ পড়তে পারছে না, তার রক্ত ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে নিঝুম হয়ে যাচ্ছে আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসছে বিলু আপা রাশেদ দেখতে পাচ্ছে তার পড়ার টেবিল থেকে, তার ইচ্ছে হচ্ছে উঠে গিয়ে বিলু আপাকে জড়িয়ে ধরে ফেলতে, যাতে সে গোশল করতে যেতে না পারে। বড়ো আম্মা তাকে ধরে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, মায়ের হাতে একটি পেতলের ঘটি, ওই ঘটিটিতেই হয়তো রয়েছে মরির তেলইর পানি, যে-পানি বড়ো আম্মা ছিটিয়ে দেবে বিলু আপার মাথায় মুখে শরীরে, তারপর গোশল করিয়ে দেবে বালতির পানি দিয়ে। বিলু আপা যদি হাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় ঘটির পানিটুকু? রাশেদ তাতে খুব খুশি হবে, কিন্তু বিলু আপা তো ছুঁড়ে ফেলে দেবে না, সে তত শেষে সবই মেনে নেয়। বিলু আপা। গোশল করে ঘরে ঢুকে যখন চুল আঁচড়াচ্ছে তখন রাশেদ তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো, . তার মুখটিকে বিষণ্ণ দেখালেও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে বিলু আপা বিশ্বাস করছে। এতে তার বিয়ে হবে। রাশেদের মুখ দেখেই বিলু আপা বুঝতে পেরেছে রাশেদ কিছু জানতে চায়; বিলু আপা বললো, মেয়েদের কতো কিছুই করতে হয়, আরো কতোবার যে পরের পানিতে নাইতে হবে। বিলু আপার কথাই ঠিক হলো, গ্রামে পর পর কয়েকটি মেয়ের বিয়ে হলো, বড়ো আম্মা প্রত্যেকটি মেয়ের তেলইর পানি চুরি করে আনলো, আর গোশল করাতে লাগলো বিলু আপাকে। এখন আর বিলু আপাকে ডেকে কেবিন, থেকে বের করতে হয় না, সন্ধ্যার বেশ পর মা বিলু আপাকে পানিভর্তি ঘটটি দেয়, আর বিল আপা নিজেই গিয়ে পোশল করে ঘরের পশ্চিম কোণায় দাঁড়িয়ে। গোশলের পর বিলু আপা চুল আঁচড়ায়, কিন্তু রাশেদ আর তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় না; কিন্তু বিলু আপা তার পড়ার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে, তোর এতে খুব খারাপ লাগে, নারে? রাশেদ মাথা নিচু করে থাকে, তার ভেতর থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চায়, রাশেদ চেপে ফেলে। বিলু আপা রাশেদকে একটি অমূল্য সম্পদ উপহার দিয়েছে এর মাঝে, সেটি দীর্ঘশ্বাস, আর দিয়েছে তা চেপে ফেলার বিস্ময়কর শক্তি।
রাশেদ গিয়েছিলো মামাবাড়ি বেড়াতে, সেখানে সবুজ উদ্ভিদের সবুজ জ্যোত্সার মধ্যে সে দেখতে পায় এমন এক দৃশ্য, যা অলৌকিক মনে হয় তার, এবং এই প্রথম সে দেখে অলৌকিককে; তার চোখ মন শরীর ভরে যায়, যা দেখার স্বপ্ন সে দেখে আসছে। রক্তের ভেতরে, কিন্তু দেখতে পায় নি, সে তার চেয়ে অনেক বেশি দেখতে পায়। কোনো দেবতাকে দেখলেও সে এমন শিহরিত হতো না। মামাবাড়ি তার ভালো লাগে ওই গ্রামের গাছপালার সবুজ আলো-অন্ধকারের জন্যে; ওই গ্রাম গাছপালার, মানুষের নয়, মানুষ থাকে গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে গাছপালার আদরে, রাশেদ ওই গ্রামে ঢুকলেই গাছপালা তাকে আদর করতে শুরু করে। দীর্ঘ মোমবাতির মতো শুপুরিগাছগুলোর শীর্ষে জ্বলছে সবুজ শিখা, ঘরগুলো ঢাকা পড়ে আছে নারকেল আর খেজুরগাছের। আঁচলের নিচে, আমগাছ বাড়িয়ে দিয়েছে বড়ো বড়ো ডাল, শিমুলগাছ ওপরে উঠে গেছে। সব গাছ ছাড়িয়ে, কালোসবুজ পাতা ছড়িয়ে স্তব্ধ নিঝুম হয়ে আছে গাবগাছ, বাঁশবনে শনশন শব্দ হচ্ছে, বেতগাছ এলিয়ে আছে, গোঁড়ালেবুগাছের ঝোঁপ থেকে ভেসে আসছে সবুজ গন্ধ, আর রয়েছে গভীর সঙ্গল, যেখানে লুকিয়ে থাকলে খুঁজে পাওয়া যায় না। দুপুর পেরিয়ে গেছে, চারপাশে কোমল নিশ্ৰুপ বিকেল, রাশেদ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। একলা হাঁটছিলো; একটা নতুন পথ তৈরি করতে করতে সে হাঁটছে, তার ভালো লাগছে ডাল ডিঙ্গিয়ে আর ডালের নিচ দিয়ে মাথা গলিয়ে চলতে। সে কোথায় যাবে জানে না, হয়তো যাবে না কোথাও, বা যাবে এষাদের বাড়ি। মামাবাড়ি এলেই এষাকে তার মনে পড়ে, মামাবাড়ি এলেই ছোটোবেলা থেকেই সে খেলে এষা আর ফাতুর সাথে। এষা আর ফাতু খুব বড়ো হয়ে গেছে, হঠাৎ বড়ো হয়ে গেছে তার থেকে; ওরা শাড়ি পরে এখন, অথচ রাশেদ হাফপ্যান্ট ছাড়ে নি, বিয়ের জন্যে অপেক্ষা করছে ওরা। সামনে। বেতগাছ দিয়ে ঘেরা একটা জায়গা, ঢুকে বসে থাকলে কেউ দেখতে পায় না, মাসখানেক আগেও রাশেদ সেখানে বসে অনেক কিছু ভেবেছে, জায়গাটায় বসলেই ভাবনা আসে। আজো সে কিছুক্ষণ বসবে সেখানে, দেখবে ভাবনা আসে কিনা, নিশ্চয়ই। আসবে, নীরব জায়গায় আজকাল একলা বসলেই তার ভাবনা আসে। ওই নিবিড় নিচুপ জায়গাটিতে কারা যেনো বসে আছে; রাশেদ উঁকি দেয় বেতপাতার সরু ফাঁক দিয়ে, দেখে এষা আর ফাতু মুখোমুখি বসে আছে। শাড়ি পরেছে তারা, তাদের ওপরের। দিকটা সম্পূর্ণ উদোম, এষার শরীর ধবধব করছে, এষা কোমলভাবে নাড়ছে ফাতুর দুধ, ফাতু চোখ বুজে আছে, ফাতুও কোমলভাবে ছুঁইছে এষার দুধ, এষা চোখ বুজছে। হাত সরিয়ে এষা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকছে ফাতুর বুকের দিকে, কী যেনো বলছে, ফাতু। মিষ্টি করে হাসছে; ফাতু এষার দুধে একবার ঠোঁট চুঁইয়ে জড়িয়ে ধরলো এষাকে। রাশেদের মনে হলো এই প্রথম সে দেখলো সৌন্দর্য, গোলাপের থেকে আগুনের থেকে চাঁদের থেকে শিশিরের থেকে সুন্দর এ-সৌন্দর্য। ওই সৌন্দর্যকে ঘিরে সময় থেমে। আছে। তার ইচ্ছে হচ্ছিলো অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থেকে এ-দৃশ্য দেখতে বা তার সব ইচ্ছে তখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো;-তার ভেতরে জ্বলে উঠলো মোমের শিখা, গলতে শুরু করলো, ফুটতে লাগলো শিউলি, ঝরে ঝরে পড়তে লাগলো মাটিতে। তার চোখ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে, তার প্রতিটি রক্তকণা অন্ধ হয়ে যাচ্ছে; রাশেদ বসে পড়লো, চিবোতে লাগলো একটা ঘাস ছিঁড়ে; সে এষাদের বাড়ি যাবে না, মামাবাড়িও যাবে না, তার খুব দূরে যেতে ইচ্ছে করছে, নদীর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে, মেঘের ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে নিজের রক্তকণিকার থেকে কোটি কোটি মাইল দূরে যেতে।
