বিলু আপা কি দেখতে খারাপ? রাশেদের তো তা মনে হয় না, বিলু আপাকে রাশেদের মনে হয় সবচেয়ে সুন্দর, অমন সুন্দর সে বেশি দেখে নি, কুমড়োডগার মতো। সুন্দর বিলু আপা। তার গায়ের রঙের কথা ওঠে, রঙটা ফরশা নয় বলে অনেকেই সুন্দরী মনে করে না তাকে; গাল ভাঙা নাক বাঁকা ঠোঁট উল্টোনো মেয়েদেরও সবাই মনে করে সুন্দরী গায়ের রঙ ফরশা হলে, কিন্তু বিলু আপা এতো সুন্দর তবু তাকে সুন্দরী মনে। করে না লোকেরা রঙটা ফরশা নয় বলে। ফরশাই কি সুন্দর? পাশের বাড়ির বউটি দেখতে বাঁশপাতার মতো, গালে একটা দাগ, কিন্তু রঙটা ফরশা, তাই সবাই তাকে সুন্দরী বলে, আর সেও গর্ব করে; রাশেদ তার দিকে তাকাতেই পারে না, মনে হয় একটি শাদাপেত্নী দেখছি। অনেক মাস কোনো প্রস্তাব আসে নি বিলু আপার জন্যে, বছরখানেক আগে একটি এসেছিলো, রাশেদই বাতিল করে দিয়েছিলো সেটা। একটি প্রস্তাব এসেছিলো অনেক দূরের গ্রাম থেকে, রাশেদকে তারা নিয়ে গিয়েছিলো বাড়িঘর দেখাতে, রাশেদ বাড়িঘর আর লোকটিকে দেখে এসে বিয়েতে মত দেয় নি। তার। কিছুই পছন্দ হয় নি, লোকটিকে পছন্দ হয় নি একেবারেই। রাশেদ মাঝেমাঝে ভাবে লোকটি কি খুব খারাপ ছিলো? কখনো তার মনে হয় খুব খারাপ ছিলো না, আবার মনে হয় খুব খারাপ ছিলো, ওই লোকটি বিলু আপার পাশে ঘুমোবে এটা ভাবতে তার ঘেন্না। লেগেছিলো। লোকটি রাশেদকে খুব আদর করেছিলো, বাজারে নিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিলো, নতুন শার্ট বানিয়ে দেবে বলে দর্জির দোকানে নিয়ে গিয়েছিলো, দর্জিটা খুব সুন্দর একটা কাপড় বের করেছিলো, কিন্তু রাশেদ রাজি হয় নি মাপ দিতে; তাদের বাড়িতে দু-তিন দিন থাকার জন্যে রাশেদকে বারবার অনুরোধ করেছিলো, রাশেদ থাকে নি। রাশেদ রাজি হলে বিলু আপার বিয়ে হয়ে যেতো এতোদিনে, তাহলে তার ক্লান্তি থাকতো না বিষণ্ণতা থাকতো না। রাশেদের মনে হচ্ছে একটা অপরাধ করে ফেলেছে সে, আবার মনে হচ্ছে না ওই লোকটির সাথে বিয়ে হতে পারে না বিলু আপার। বিলু আপা কি মনে মনে রাশেদকে দোষ দেয়? না, বিলু আপা রাশেদকে দোষ দিতে পারে না, বিলু আপা তো তাকে বলেছে সে পছন্দ না করলে বিলু আপাও পছন্দ করবে না, রাশেদ পছন্দ করলেই তার পছন্দ হবে। বিলু আপা নিজের পছন্দ মতো কিছুই করে না, মার আর বাবার পছন্দ মতো করে, এমনকি রাশেদের পছন্দ মতো করে। তার কি পছন্দ নেই? বিলু আপা বলে মেয়েদের আবার পছন্দ কি? বিলু আপা চার বছরের বড়ো। রাশেদের থেকে, কিন্তু রাশেদের মনে হচ্ছে বিলু আপা রাশেদের থেকে ছোটো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন; আগে বিলু আপার কথা মতো চলতো রাশেদ, এখনো বিলু আপা ‘চলতে চায় রাশেদের কথা মতো; সব কিছুতেই বলে, তুই বল। রাশেদ যা বলে তাই নাহয়, তাই করে বিলু আপা, রাশেদকে কিছু করতে আর বলে না।
পুব পাড়ার মরির বিয়ে হতে যাচ্ছে, সংবাদটি রাশেদ জানতো না, জানার কথা নয়; খুব গরিব ওরা, ওদের বাড়িতে রাশেদ কখনো যায় নি, মেয়েটির নামও শোনে নি, এই প্রথম শুনলো। রান্নাঘরের উত্তর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো রাশেদ, শুনতে পেলো বড়ো আম্মা মাকে বলছে পুব পাড়ার মরির বিয়ে হবে তিন চার দিনের মধ্যে; তবে মাকে একটি সংবাদ দেয়ার জন্যেই সে কথাটি বলছে না, বলার পেছনে লুকিয়ে আছে একটি উদ্দেশ্য, যা তার গলার স্বরে ধরা পড়ছে। সে বুড়ো মানুষ, তার কেউ নেই; সে থাকে রাশেদদের সাথেই, তারা তাকে বড়ো আত্মা বলে, সারা গ্রাম ভরে সে ঘোরে, যা পায় তাই নিয়ে। আসে, ভীষণ আদর করে রাশেদ আর তার ভাইবোনদের। বিলু আপার বিয়ের জন্যে। তারও চিন্তার শেষ নেই। সে বলছে মরির বিয়ে হবে, মরির তেলইর–গায়েহলুদের পানি চুরি করে এনে সে-পানি দিয়ে গোশল করাতে হবে বিলু আপাকে, তাহলে বিয়ের। ফুল ফুটতে দেরি হবে না। শুনে রাশেদ খুব আহত বোধ করে। কোনো মেয়ের তেলইর, পানি দিয়ে যে-মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না তাকে গোশল করালে নাকি তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়। তার, এমন কথা রাশেদ শুনেছে, কিন্তু সে কখনো ভাবতে পারে নি বিলু আপাকেও অমন পানি দিয়ে গোশল করতে হবে। বিলু আপা কি রাজি হবে মরির তেলইর পানি। দিয়ে গোশল করতে? রাশেদ যদি মেয়ে হতো, সে কি রাজি হতো অন্যের তেলইর চুরি করা পানি দিয়ে গোশল করতে? কথাটি শুনে কাঁপছে রাশেদ, আর কেমন লাগছে বিলু। আপার, সে তো রান্নাঘরেই আছে বলে মনে হচ্ছে। বিলু আপাও কি তাড়াতাড়ি বিয়ে। হওয়ার জন্যে গোশল করতে চায় মরির তেলইর পানি দিয়ে? মরি যদি খা-বাড়ির মেয়ে হতো, তাহলে না হয় কথা ছিলো; মরির বাবা কামলা খাটে, তার মেয়ের তেলইর পানি দিয়ে গোশল করতে হবে বিলু আপাকে? মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে রাশেদের মা জানতে চাইছে কীভাবে পাওয়া যাবে পানি, কে এনে দেবে, আর চুরি করে পানি আনতে গিয়ে ধরা পড়লে খুব লজ্জার কথা। বড়ো আম্মা মাকে বলছে পানি সে-ই চুরি। করে এনে দেবে, চুরি করেই এই পানি আনতে হয়, চেয়ে আনলে কাজ হয় না। ধরা পড়লে অবশ্য খুব অপমান। তেলইর দিন উঠোনে বালতি করে পানি আর তার পাশে তেল হলুদ দুর্বা কী সব দুপুর ভরে রেখে দেয়া হয়; সেখান থেকে পানি চুরি করে আনতে হয়, এনে সে-পানি দিয়ে সন্ধ্যার পরে বড়ো ঘরের পশ্চিম কোণে দাঁড় করিয়ে গোশল করাতে হয় আইবুড়ো মেয়েকে। মাকে বড়ো আম্মা কথা দিচ্ছে সে তেলইর দিন ঠিকই পানি নিয়ে আসবে, কেউ তাকে দেখতে পাবে না। রাশেদের ভয় লাগতে থাকে বড়ো আম্মা পানি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে, সবাই জিজ্ঞেস করছে কার জন্যে সে পানি চুরি করছে, সে বিলু আপার নাম বলছে, সবাই বিলু আপাকে আইবুড়ি বলে গাল দিচ্ছে।
