মমতাজের একটি মামাতো না খালাতো না চাচাতো ভাই যেনো দেশে ফিরেছে, এক যুগ পড়ে ছিলো মানচেস্টার না ব্র্যাডফোর্ড না কার্ডিফ না কোথায়, দেখা করতে এসেছে রাশেদের সাথে, দেখেই রাশেদ মুগ্ধ হলো, অদ্ভুত জীবের মতো লাগছে তাকে। মাথায় লম্বা চুলও রেখেছে, আবার শরীর ভ’রে স্যুটকোটের বাহারও দেখার মতো, নতুন কিনেই গায়ে চাপিয়ে প্লেনে উঠেছে মনে হচ্ছে, ঝকঝক করার চেষ্টা করছে, কিন্তু মনে হচ্ছে বাঙলাদেশেরই কোনো মফস্বল, ভুরুঙ্গামারি ছাগলনাইয়া ঝালকাঠি, থেকে। এসেছে; বাঙলাটা আগের যে-আঞ্চলিক ছিলো এখন তার থেকেও আঞ্চলিক হয়েছে, মাঝেমাঝে ইংরেজি বলছে, তাও ওখানকার কোনো অঞ্চলের। আনন্দের কথা বাঙালি পৃথিবীর যেখানেই যাক বাঙালিই থাকে, নিউইয়র্ক শিকাগো লন্ডনকে বাঙলাদেশের মফস্বল শহরে পরিণত করে; পৃথিবীর বাইরেই থেকে যায়। জনাব দ্যাশে ফিরতেনই না, ফিরেছেন দয়া করে, বিবাহ করার জন্যে; তিনি একটি সতীসাধ্বী গৃহকর্মনিপুণা পরহেজগার বিবি সংগ্রহের জন্যে দ্যাশে ফিরেছেন। কোনো বিদেশিনী বা বাঙালি বা ভারতি মেয়েকে তিনি কেননা বিয়ে করলেন না, রাশেদ জানতে চায় তার কাছে; সে। অনেকটা নাউজুবিল্লা নাউজুবিল্লা করে ওঠে। দেশে থাকার সময় সে বিশেষ খাঁটি। মুসলমান ছিলো না, এখন বিলেতে মুসলমান ভাইদের সাথে খাঁটি মুসলমান হয়ে উঠেছে, দাড়ি এখনো রাখে নি হয়তো ফিরে গিয়ে রাখবেন, নামাজটা ঠিক মতো আদায় করেন, রোজা রাখেন। সে বলে যে বাঙালি মাইয়াগুলিন একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে ওই দ্যাশে, যার তার সাথে ঘুমোয়, বিদেশিদের সাথেই বেশি ঘুমোয়, ওই রকম। মাইয়ালোক তিনি বিয়ে করতে পারেন না। তিনি একটি অক্ষত মেয়েলোক চান, যার ভেতরে তিনিই প্রথম ঢুকবেন, হয়তো ঢোকার আগে খুঁজে দেখে নেবেন পাতলা পর্দাটা ঠিকঠাক আছে কিনা। কিন্তু তিনি যে এক যুগ ধরে ওখানে পড়ে আছেন, তিনি এতোদিন চালিয়েছেন কীভাবে, দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে ফুঁ দিয়েই কি চালিয়ে দিয়েছেন? গার্লফ্রেণ্ড টার্লফ্রেণ্ড কি একেবারেই জোগাড় করতে পারেন নি, এমনকি কোনো আইরিশ পতিতা, বা দু-একটা বাঙালি মেয়ে? তা তিনি জোগাড় করেছেন, তিনি একেবারে নপুংসক নন; একটা গ্রিক মাইয়ালোকের সাথে তিনি কয়েক মাস ছিলেন, একটা। ইউরেশীয় মেয়ের সাথেও তিনি ছিলেন বছরখানেক, দু-তিনটা বাঙালি মুসলমান মেয়ের সাথেও তিনি ঘুমিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে, স্বীকার করতে চাইছেন না, তবে তার হাসি থেকেই বোঝা যাচ্ছে। তিনি মাইয়ালোকের সাথে ঘুমোতে পারেন, কিন্তু নিকা করতে পারেন না; যে-মাইয়ালোক পরপুরুষের সাথে ঘুমোয় অমন নষ্ট মেয়েলোককে তিনি শাদি করতে পারেন না। তবে ওই মেয়েলোকগুলোকে কি তিনি বদল করেছেন, না ওই নষ্ট মেয়েলোকগুলোই তাকে ছেড়ে গেছে? মেয়েলোকগুলোই তাকে ছেড়ে গেছে, ওইগুলো খানকিই, একজনকে নিয়ে থাকতে পারে না; আর তাদের সাথে তিনি পেড়ে ওঠেন নি। বাঙালি মেয়েগুলোও ওখানে গিয়ে রাক্ষুসী হয়ে গেছে, কিছুতেই ক্ষুধা মেটে না; একটায় তারা তৃপ্তি পায় না, একটার পর একটা চায়, ঠোঁট চায় মুখ চায় আঙুল চায়; তিনি তা পারেন না। তাই তিনি দ্যাশে ফিরেছেন একটা খাঁটি বাঙালি মুসলমান পরহেজগার বিবি সগ্রহ করতে।
একটি বই কিনবে বলে চৌরাস্তাটায় গিয়েছিলো রাশেদ, বইটা পাওয়া গেলো না; তাতে খুব খারাপ লাগলো না তার, সে জানে বহু শ্রেষ্ঠ বই সে কোনোদিন প’ড়ে উঠতে পারবে না, হাতের কাছে পেয়েও বহু অমর বই সে পড়ে নি, এটা না পড়লেও তার জীবন অসম্পূর্ণ থাকবে না; তবে দোকানের তাক ভরে সাজানো রাশিরাশি রঙিন। মলস্থূপ, উপচে উছলে পিছলে পড়ছে, চারপাঁচটি বালকবালিকা এসেই একটার পর একটা মলস্তূপের নাম বলতে লাগলো, আরো মলতূপ যার নাম তারা জানে না বেরিয়েছে কিনা, কবে বেরোবে, কেনো বেরোচ্ছে না বারবার জানতে চাইলো। মলত্যাগকেরা কেনো আরো বেশি করে মলত্যাগ করছে না, তারা আরো বেশি মলত্যাগ না করলে এই বালকবালিকারা কী ভোজন করে বাঁচবে? রাশেদ দোকান থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরছিলো, কয়েকটি বোমা ফাটার শব্দ পেলো, ছাত্রাবাসগুলোতে ছাত্ররা গণতন্ত্রের প্রস্তুতি নিচ্ছে; শব্দ শুনলে একাত্তর থেকেই সে আঁতকে ওঠে, আজো আঁতকে উঠলো, কিন্তু অন্যদের মতো সেও আর ভয় পায় না। হাঁটতে হাঁটতে সে একটি মসজিদের পাশের ফুটপাতে এসে উঠলো; মসজিদটিকে ঘিরে নানা রকমের দোকান, কয়েকটা বইয়ের দোকানও আছে, মুসলমানদের এটা রাশেদের খুব ভালো লাগে যে তারা আধ্যাত্মিকতাকে পার্থিবতা দিয়ে ঘিরে রাখে; এক অনুরাগী যুবক বেশ আগে তাকে এখন দিয়ে যাওয়ার সময় সাবধানে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলো। সাবধানে যাওয়া কেননা সাবধানে কোনো কিছু করাই এখনো সে শিখে ওঠে নি, উঠবে বলেও মনে হচ্ছে না, তবে ছেলেবেলায় যেমন একটা গাবগাছের আর একটা তেঁতুলগাছের পাশ দিয়ে। যাওয়ার সময় হঠাৎ সাবধান হয়ে পড়তে কে একজন তাকে সাবধান করে দিয়েছিলো বলে, এখানে এলেও সে সাবধান হয়ে পড়ে, সেই ছেলেটিকে মনে পড়ে, আজো তেমন হলো। কয়েকটি যুবক তার দিকে এগিয়ে আসে, পোশাকে আর মুখাবয়বে দেখতে বেশ ধার্মিক, সামনের ছেলে দুটির গাল বেশ ভাঙা, কোনো অতিরিক্ত অনৈসলামিক কাজের। ফলে হয়তো এ-ধস নেমেছে, তবে হাল্কা দাড়িতে ঢেকে আছে বলে বেশ মানিয়েছে। একাত্তরে হয়তো তাদের জন্ম হয় নি, হলেও চারপাঁচের বেশি বয়স হবে না, তবে এখন। মনে হচ্ছে বারো তেরো শো বছর বয়স হবে, তারও বেশি হতে পারে। একটি ছেলে তাকে একটা সম্পূর্ণ সালাম দেয়, যা সে অনেক দিন শোনে নি, এখন সংক্ষিপ্ত সালামই রীতি, রাশেদ মাথা নেড়ে সালাম নেয়। সামনের ছেলেটি বলে, শুনছিলাম আপনে। মুসলমান না, এখন ত দ্যাখতে পাইতাছি মুসলমানই, তবে মুখ খুইল্যা হাত তুইল্যা সালাম লইতে শিখবেন। রাশেদ বিব্রত হয়ে দাঁড়ায়, ছেলেগুলোকে একবার দেখে নেয়, এবং বলে যে আজকাল ভুল সংবাদই বেশি প্রচার পাচ্ছে, তাতে কান দেয়া ঠিক নয়। আরেকটি ছেলে বলে, ভুল খবর আমরা রাখি না, খাঁটি খবরই রাখি, সাবধান হইয়া। যান, চইদ্দই ডিশেম্বর আবার আসব, লিস্টিতে নাম আছে। রাশেদ জানতে চায় তাকে কী করতে হবে? একটি ছেলে বলে, রোজানামাজ কইরেন, আর মুক্তিযুদ্ধ প্রগতিফ্রগতি। ছাইরা দেন। আরেকবার যখন সময় আসব পলাইবার পথ পাইবেন না। রাশেদ তাদের বলে পালানোর কথা সে কখনো ভাববে না, আরেকবার সময়ও আসবে না। রাশেদ, তাদের জিজ্ঞেস করে আধুনিক সময়ের মানুষ হয়ে তারা কেনো মধ্যযুগে চলে যাচ্ছে? ছেলেটি বলে, আমাদের সঙ্গে আপনেরেও মধ্যযুগে যাইতে হবে বাঁচতে চাইলে। রাশেদ বলে, তার সম্ভাবনা নেই, মধ্যযুগে যেতে হবে না বলেই সে বিশ্বাস করে, সে সামনের দিকেই যাবে। এমন সময় দুটি ছেলে রিকশা থেকে নেমে রাশেদের পাশে দাঁড়ায়, রাশেদ তাদের চেনে না, তবে তাদের দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে মনে হয় ৩০৩ রাইফেল দিয়ে তারা একটি দেশকে স্বাধীন করতে পারে, আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারে ৯৩। হাজার মধ্যযুগকে। তাদের দেখে মধ্যযুগের প্রতিনিধিরা মসজিদের চারপাশের দোকানগুলোতে ঢুকে পড়ে, রাশেদ ছেলে দুটিকে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে।
বিলু আপার জন্যে তেলইর পানি
বিলু আপা, আর পুষু আপা পারুল আপা, দিন দিন ক্লান্ত হয়ে উঠছে, আগের মতোই খিলখিল ফিসফিস করে তারা, তবে রাশেদের মনে হয় তাদের খিলখিল হাসিতে ক্লান্তি ধরেছে, ফিসফিস কথায় বিষণ্ণতা লেগেছে, শাড়ির পাড়ে বিষণ্ণ ক্লান্তি ভারি হয়ে ঝুলে আছে। তারা খিলখিল করার থেকে এখন ফিসফিসই করে বেশি, তাদের সব কথাই গোপন হয়ে উঠছে, একদিন হয়তো ফিসফিসটুকুও করবে না তারা, একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাবে। গ্রামে কোনো মেয়ের বিয়ে হলেই তারা আরেকটুকু ক্লান্ত হয়ে পড়ে; কোনো মেয়ের বিয়ের কথা হচ্ছে শুনলে খুব বিব্রত হয়ে পড়ে তারা, মুখ তুলে তাকায় না, মাটির দিকে চেয়ে থাকে, একটা দীর্ঘশ্বাস কোমলভাবে চেপে ফেলে। বিলু আপা যে কতো দীর্ঘশ্বাস চেপেছে তার হিশেব নেই কোনো, অথচ রাশেদ আজো একটাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে নি, চাপার কথাই ওঠে না; রাশেদ জানেই না কোথা থেকে কতো গভীর থেকে উঠে আসে দীর্ঘশ্বাসগুলো, আর কতোটা ঠাণ্ডা আর ভারি করে তোলে বুক। এগুলো যে খুব ঠাণ্ডা, বরফের থেকেও, তা বুঝতে পারে রাশেদ বিলু আপার মুখের দিকে চেয়ে। বাড়িতে যেই আসে সে-ই দু-এক কথার পরই তোলে বিলু আপার বিয়ের কথা, বিলু আপার এখনো যে বিয়ে হয় নি তাতে খুব অবাক হয়; শুনে মা এলোমেলো। কথা বলে, বিলু আপাকে আর ধারেকাছেই পাওয়া যায় না। রাশেদেরও খুব খারাপ লাগে এসব কথা শুনলে, সে একবার এক বুড়িকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলো;–বুড়ি এসেই ঘরের দরোজায় পিড়িতে বসে মাকে বলে যে মেয়েটাকে বিয়ে দেয়া হচ্ছে না কেননা, বিয়ে হলে তিন পোলার মা হতে পারতো, সে নিজে এ-বয়সে তিনটা পোলা বিহয়েছিলো। সে জানতে চায় মেয়েটাকে ঘরের থাম করে রাখার ইচ্ছে আছে কিনা। রাশেদের মার সম্পর্কে শাশুড়ি হয় বুড়িটা, তাই মা কিছু বলতে পারছিলো না, শুধু একটা জামাই দেখার কথা বলছিলো, বলতে গিয়ে মার কণ্ঠ ভারি হয়ে উঠছিলো; কিন্তু রাশেদ সহ্য করতে পারে নি, সে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছিলো বুড়িকে; বলেছিলো, এসব বলার জন্যে আপনি আমাদের বাড়ি আসবেন না। বিলু আপা তাতে সুখী হয়েছিলো মনে হয়, রাশেদকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো আমগাছের পাশে, বলেছিলো রাশেদ খুব ভালো, তবে ওই বুড়িটুড়ির মতো মানুষের সাথে ঝগড়া করার। দরকার নেই। মেয়েদের এসব কথা চিরকালই শুনতে হয়, মেয়েদের অপরাধের কোনো শেষ নেই। বিলু আপার যে বিয়ে হচ্ছে না এটা তো ভালোই লাগে রাশেদের; আর আজিজের কাছে ওইসব শোনার পর থেকে রাশেদের ইচ্ছে হয় বিলু আপার যেনো কোনো দিন বিয়ে না হয়। বিলু আপা একটা অচেনা লোকের সাথে শোবে এটা ভাবতে তার শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে, প্রথম যখন আজিজের কাছে শুনেছিলো তখন খুব বেশি ঘেন্না লেগেছিলো; এখন ঘেন্নাটা কমে এসেছে, বিয়ে হয়ে গেলে সে কষ্ট পাবে, কিন্তু। কষ্টটা সহ্য করতে পারবে, তবে বিয়ে যে হচ্ছে না এটা বেশ লাগছে তার। বিলু আপার ক্লান্তি আর বিষণ্ণতা রাশেদকে খুব কষ্ট দেয়, ভাত খেতে বসে তার মনে হয় বিলু আপার মাজা পেতলের থালাটি ভরে ক্লান্তির ছাপ লেগে আছে, সে বিলু আপার আঙুল দিয়ে মেখে দেয়া বিষণ্ণ ক্লান্তির ওপর ভাত মাছ দুধ রেখে খাচ্ছে। সে বিলু আপার ক্লান্তি খাচ্ছে বিষণ্ণতা পান করছে।
