খুব মায়া হয় রাশেদের, ছেলেটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিজের বুকের মধ্যে ধারণ না করে প্রকাশ করে ফেলেছে, ও কখনো ক্ষমতায় যাবে না, শক্তিমান হবে না; ওর উচিত ছিলো ওর বন্ধুদের মতো চেতনা ধারণ করে মার বুকের পুষ্টিকর দুগ্ধ খাওয়া। রাশেদ কি এ-বিবেকসম্পন্ন ছেলেগুলোকে বলবে যে তোমাদের কথা শুনে মুগ্ধ হলাম, তোমরা তোমাদের পিতাদেরই যোগ্য সন্তান, আর কিছু দিন পর তোমরাও রাজাকার হয়ে উঠবে, যদি তোমরা একাত্তরে থাকতে তাহলে রাজাকার হতে? রাশেদ তা বলতে পারছে না, ওদের বুকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বইছে, যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বইছে রাজনীতিবিদদের বুকে। রাশেদের নিয়তি পরিহাসপরায়ণ, একাত্তরে সে রাশেদকে কোনো শান্তিকমিটির সভাপতির কাছে পাঠায় নি, কিন্তু এখন পাঠাচ্ছে যখন চারপাশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জ্বলছে আগুনের মতো। : রাশেদ মজুমদার সাহেবের দরোজায় ঘন্টা বাজালে এক পাড়াযুবরাজ দরোজা খুলে দেয়; এরাই এখন দেখাশোনা করছে মজুমদার সাহেবের, বাজারও সম্ভবত করে দিচ্ছে, ব্যাংকেও হয়তো যাচ্ছে। মজুমদার সাহেবের বসার ঘর থেকে এখনো নেতারা বিদায় নেয় নি, দিন ভরেই তারা সঙ্গ দিচ্ছে তাকে; রাশেদ বসার ঘরে ঢুকতেই গোটা দুয়েকের সাথে দেখা হয়ে গেলো, যেগুলোর সাথে অনেক আগে তার পরিচয়ের মতো ছিলো, একটা এখন উদ্দিন মোহাম্মদের একটা মন্ত্রীর সাথে সাথে ফেরে, তারও একটা উপ বা প্রতি হওয়ার খুব সম্ভাবনা, এককালে মাও ছাড়া কোনো গান জানতো না সে, এখন মহামান্য ছাড়া আর কিছু জানে না; আরেকটা এখনো অনবরত মুক্তিযুদ্ধের রূপকথা বলে। দুটিই পাজেরো করে এসেছে, কতো টাকা করেছে রাশেদ জানে না, চর্বির পরিমাণ দেখে কিছুটা অনুমান করতে পারে। যেটার প্রতি বা উপ হওয়ার সম্ভাবনা সেটা এরই মাঝে মন্ত্ৰীমন্ত্রী ভাব আয়ত্ত করে ফেলেছে, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ দেখানোর অভিনয় করছে। রাশেদ মজুমদার সাহেবের পাশে বসে কথাটি তোলে। একটা রাজাকারকে সে কিছু অনুরোধ করতে যাচ্ছে ভাবতেই অস্বস্তি লাগে রাশেদের, কিন্তু সে-মুহূর্তে সে শহর ভরে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পায়, বুটের আওয়াজ শুনতে পায়, শুনতে পায় পাশের বাড়ির দুটি ছেলেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে মিলিটারি, দূরে শুনতে পায়। একটি যুবতীর চিৎকার, হঠাৎ বোমার শব্দ শোনে এবং চারদিকে অন্ধকার নেমে আসে; তার মনে হয় ছোটোভাইটিকে ধরে নিয়ে গেছে মিলিটারি, সাত দিন ধরে কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, মা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, ওই দুষ্ট মুখটি দেখার জন্যে তার বুক ব্যাকুল হয়ে আছে, সে ভাইটিকে খুঁজতে খুঁজতে শেষে দেখা করতে এসেছে। শান্তিকমিটির সভাপতির সাথে। রাশেদ আর অস্বস্তি বোধ করে না; সে বলে দুপুরে যে-ছেলেটি বেয়াদবি করেছে, তার বেয়াদবির জন্যে রাশেদ খুব দুঃখিত, ছেলেটি আর। কখনো বেয়াদবি করবে না। মজুমদার সাহেব গম্ভীর হয়ে ওঠেন। রাশেদ বলে, ছেলেটিকে ধরে নিয়ে গেছে কয়েকটি যুবক, যুবকগুলো নিশ্চয়ই খুব ভালো, পাড়ার। ভালোমন্দ তারা তো দেখবেই; মজুমদার সাহেব পাড়ার অভিভাবক, তিনি যদি বলে। ছেলেটিকে ফেরত এনে দেন, তাহলে সবাই তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। কথাগুলো বলার সময় রাশেদের মনে হয় সান্ধ্য আইনের মধ্যে বসে কথা বলছে সে, চারপাশে মিলিটারি জিপের আর গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে, দূরে কোথাও আগুন জ্বলছে, পাশের বাড়িতে সবাই চিৎকার করছে। মজুমদার সাহেব ব্যাপারটি দেখার আশ্বাস দেন, আরো বলেন যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভেবে পাড়ার ছেলেরা যাতে নষ্ট না হয় রাশেদ যেনো একটু লক্ষ্য রাখে। রাশেদ তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসে, দুটি যুবরাজ তাকে দরোজা খুলে দেয়। একাত্তর একাত্তর লাগছে রাশেদের, যদিও একাত্তরে সে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে নি, কোনো শান্তিকমিটির সভাপতির সাথে দেখা করতে তাকে যেতে হয় নি; মিলিটারির ভেতর দিয়ে চলে গেছে, কয়েকটি রাজাকারের সাথে একবার ঝগড়াও করেছে, মনে। হচ্ছে এখন সে আরো গভীর একাত্তরে পড়েছে, যখন কোনো স্বপ্ন নেই, যখন কোনো আলো নেই। একাত্তরে স্বপ্ন ছিলো, পোকামাকড়ও স্বপ্ন দেখতো তখন, এখন মানুষও স্বপ্ন দেখে না। সন্ধ্যার বেশ পরে বিবেকসম্পন্ন ছেলেগুলো আবার আসে, রাশেদকে খবর দেয় যুবরাজরা তাদের বন্ধুটিকে বাসার সামনে একটি পাজেরো থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে, সে দাঁড়াতে পারছে না, কথা বলতে পারছে না, তার সারা শরীর কালো হয়ে। গেছে। রাজাকারকে রাজাকার বললে তুমি দাঁড়াতে পারবে না, কথা বলতে পারবে না, শরীর দাগে ভরে যাবে, তোমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রূপ উপভোগ করে ক’র জর্জরিত হয়ে উঠছে রাশেদ, চারদিকে তার রূপ দেখছে, সে-ই শুধু ওই চেতনা থেকে দূরে বলে মনে হচ্ছে, আর সবাই উজ্জীবিত ওই চেতনায়। অনেকের কাছে তাকে বারবার বুঝতে হচ্ছে আলহজ সেলিমাকে তার ওসব কথা বলা ঠিক হয় নি, বুদ্ধিমানের মতো বাঁচতে হবে এখন, প্রগতিশীল শুভানুধ্যায়ীরা তাকে বুঝিয়েছে রোজা নামাজ হজ জাকাতের সাথে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধ নেই, বিরোধ নেই জানালা লাগানো বোরখার সাথেও, এসবের সাথে মিলন ঘটিয়েই থাকতে হবে। তারাও রাশেদের মতো ভুল বুঝতো এক সময়, এখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারছে, নিয়মিত নামাজ পড়ছে, শুক্রবার দল বেঁধে প্রতিযোগিতা করে পড়ছে, মনে শান্তি পাচ্ছে। দেশের দিকে তো তাকাতে হবে, গরিব আর অশিক্ষিত মানুষদের মন জয় করতে হলে, এবং তাদের ঠকাতে হলে ধর্ম ছাড়া আর কোনো পথ নেই; তারা অন্য কোনো চেতনাই বোঝে না। তারা আর কিছু চায় না; না খেয়ে তারা থাকছে হাজার হাজার বছর ধরে, দরকার হলে আরো হাজার হাজার বছর তারা না খেয়ে থাকবে, আরো হাজার বছর তারা চিকিৎসা চায় না, ঘর চায় না, তারা চায় শুধু ধর্ম। ধর্মই শুধু শান্তি দিতে পারে। তারা যে খুব শান্তি পাচ্ছে তাদের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। রাশেদ দেখতে পাচ্ছে ছাত্ররাও খুব শান্তি পাচ্ছে, জিন্স পরে বিসমিল্লা বলে তারা বক্তৃতা শুরু করছে, কিছু দিন পর সালোয়ারও পরবে, সালামুআলাইকুম বলে শেষ করছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। ডক্টর জালালের মেয়েটিও কোনো ক্ষতি করে নি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার, ওই চেতনার ক্ষতি কেউ করতে পারে না। ডক্টর জালাল শহীদ হয়েছিলেন, চোদ্দো তারিখে আলবদররা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো, তার লাশটিও পাওয়া যায় নি; তবে তিনি একটা অমর। চেতনা রেখে গেছেন। তার লাশ না পাওয়া গেলেও তাঁর ছবি ছাপা হয় ডিসেম্বরে, ওই ছবি ছাপার মধ্যেই ধরা পড়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে আমরা দূরে সরে যাই নি, তাঁর মেয়েটি যা-ই করুক, আমরা যা-ই করি। ডক্টর জালাল শহীদ হওয়ার আগে থেকেই রাশেদ দেখে আসছে তার মেয়েটিকে, রিনাকে, পাঁচ-ছ বছর বয়স থেকেই, কোলেও নিয়েছে; দেখতে দেখতে সে বড়ো হয়ে উঠেছে, সুন্দর, বেশ মেধাবী, ডাক্তারি পড়ছে। ডক্টর জালালকে যখন বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় আলবদররা, রিনা তার কোলেই। ছিলো, মেয়েটিকে তিনি কোলে রাখতেই ভালোবাসতেন। বছর খানেক আগে রাশেদ তাকে দেখে অবাক হয়, আহতও বোধ করে; কালো বোরখা পরেছে রিনা, তার। বোরখায় জালের জানালা লাগানো, রাশেদ বুঝতেই পারতো না যদি না মমতাজ বলতো ওই বোরখার ভেতরে রিনা রয়েছে। রিনা নিজেই শুধু ধর্মকর্ম করছে না, মাকেও ধর্মকর্ম শেখাচ্ছে; মা শিখতে রাজি হচ্ছে না বলে মাকে সে ছেড়ে যাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। সে পাঁচ সাত বেলা নামাজ পড়ছে, রোজা রাখছে মাঝেমাঝেই; ডাক্তারি বইয়ের থেকে বেশি পড়ছে কোরানহাদিস, কিনতে হচ্ছে না, পাওয়া যাচ্ছে নানা দিক থেকে। এ-বছর সে পাশ করে বেরিয়েছে, কয়েক দিন আগে সে বিয়ে করেছে একটি আলবদরের ছেলেকে, বিয়ে করে বাসায় ফেরে নি, আলবদরটির বাসায় গিয়ে উঠেছে। ছেলেটা এখনো পাশ করে নি, ছেলেটাকে রাশেদ দেখেছে একদিন। বেশ দাড়ি রেখেছে সে, যদিও ওর আলবদর বাপটা এখনো দাড়ি রাখে নি, কিন্তু ছোঁকরাটা দাড়ির দৈর্ঘে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে। বেগম জালাল মেয়ের মুখ দেখেন নি, মেয়েও মায়ের মুখ দেখতে চায় না, মাকে তার মুসলমানই মনে হয় না। এটা তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিকাশ, এমন বিকাশই ঘটছে চারদিকে, এমন বিকাশ দেখেই শান্তিতে থাকতে হবে রাশেদকে। রাশেদকেও একটু রোজানামাজে মন দিতে হবে, পকেটে একটা টুপি রাখতে হবে।
