বাসায় ফিরে রাশেদ শোনে দুপুরে একটি ছেলে পাড়ার শান্তিশৃঙ্খলা কয়েক মিনিটের জন্যে বিপন্ন করে তুলেছিলো। মজুমদার সাহেবের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে সে ‘রাজাকারের বিচার চাই’ বলে চিৎকার করে, রাস্তাটিতে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। দিন যতোই যাচ্ছে যাকে তাকে রাজাকার বলা স্বভাবে পরিণত হচ্ছে কিছু ছেলের, পথে . পথে রাজাকার দেখতে পাচ্ছে তারা, পিতার মুখেও তারা হয়তো রাজাকার দেখতে পায়, দেশের অভিভাবকদের মুখেও দিনরাত রাজাকার দেখে। রাজাকার শব্দটা উচ্চারণ করতে রাশেদ পছন্দ করে না, কোনো কোনো পশুর নাম নিতে যেমন তার ঘেন্না লাগে; তবে ওই ছেলেদের রাশেদ দোষ দিতে পারে না, সেও তো তা-ই দেখছে, যদিও একাত্তরে সে এতো রাজাকার দেখে নি। একাত্তরের রাজাকারগুলো অনেক ভালো ছিলো আজকেরগুলোর থেকে, সেগুলোর ছদ্মবেশ ছিলো না, দেখলেই চেনা যেতো; আজকেরগুলো ব্ল্যাকম্যাজিক চলচ্চিত্রের শয়তানের মতে, প্রথম যখন দেখা হয় মনে হয় একান্ত আপনজন, কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তার ভয়ঙ্কর মুখটি দেখা দেয়;-রাশেদ এমন একটির সাথে মাঝেমধ্যে গল্প করতে দেখা হলে, কথা শুনে মনে হতো সে মহামুক্তিযোদ্ধা, কিছু দিন পরে রাশেদ বুঝতে পারে সে একটা রাজাকার, যদিও একাত্তরে সে রাজাকার ছিলো না। বিকেলে দরোজায় ঘণ্টা বাজে, রাশেদ দরোজা খুলে কয়েকটি তরুণের মুখোমুখি হয়; দেখেই রাশেদের রক্তে ঠাণ্ডা আতঙ্ক বইতে থাকে-হয়তো ভোরে সে কোনো অপরাধ করে এসেছে মজুমদার সাহেবের বাসায়, এখন এই বিধাতামণ্ডলির কাছে তার কারণ দর্শাতে হবে; কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধ আর। মুক্তিযোদ্ধার কথা বললে রাশেদ বিস্মিত হয়। যার সাথেই দেখা হয় আজকাল সে-ই। মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য গল্প বলে, তার সে যোগ্যতা নেই; ওই মহৎ উদ্যোগে, দশ কোটি মানুষের মতো, সে অংশ নিয়েছে শুধু বেঁচে থেকে; মুক্তিযুদ্ধের বইপত্রও বেশি পড়ে নি, পড়তে পারে নি, ওগুলো মুক্তিযুদ্ধের বই হয় নি বলেই তার মনে হয়। যে-কটি বই পড়েছে, তার প্রতিটি শেষ করেই মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে গেলেই কেউ মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধি করতে পারে না। ছেলেরা বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে একটি কথা তারা খুব শুনছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না তা কী, আসলেই তেমন কিছু আছে কিনা, ছিলো কিনা? রাশেদ খুব ব্ৰিত হয়, সে কি বলবে এটা সে নিজেও বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না; নাকি বলবে যারা এর কথা বলে তারাও বোঝে না, অন্তত বিশ্বাস করে না, তাদের মধ্যেও অমন কোনো চেতনা নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো কারো কাছে ক্ষমতা, কারো কাছে কোটি টাকা, ব্যাংক উপচে পড়া, গাড়ি, ব্যাংককে প্রমোদ, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা, আর হজ, ওমরা, মিলাদ। রাশেদ এসব কিছুই বলে না। তার বলতে ইচ্ছে হয় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা দুটিই তার কাছে একই সাথে স্বপ্নলোক ও বস্তুলোকের সামগ্রী; মুক্তিযুদ্ধ এক বাস্তব ঘটনা যা দেশ জুড়ে ঘটেছে, তবে তার চেয়ে বেশি ঘটেছে স্বপ্নলোকে, আর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছে বাস্তবে, সে বাস্তব মানুষ, কিন্তু তার বাস্তব রূপের থেকে স্বপ্নলোকের রূপই দখল করেছে আমাদের মন। তাকে যখন বাস্তবে দেখি, তখন স্বপ্ন। অনেকটা ভেঙে যায়, সে হয়ে ওঠে আমাদের মতোই সামান্য। শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা সে-ই যে কখনো বাস্তবলোকে ধরা দেয় না, চিরকাল থাকে স্বপ্নলোকে। কিন্তু রাশেদ এসব বলে না, সে শুধু জানতে চায় তার কাছে তাদের আসার আসল উদ্দেশ্য কী?
ছেলেরা তখন আসল উদ্দেশ্যটি প্রকাশ করে। বেশ ঝানু ছেলেই তারা, রাশেদকে আগে বাজিয়ে দেখে নিয়েই এগোতে চায়, কে জানে রাশেদও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তারা বলে যে মজুমদার সাহেব রাজাকার, একাত্তরে যশোরে কোথাও শান্তিকমিটির সভাপতি ছিলেন, এতেও তারা এতোদিন আপত্তি করে নি, আজো করছে না; তার কাজের মেয়েটি যে আত্মহত্যা করে নি এতে তাদের কোনো সন্দেহ নেই, তাকে খুন করা হয়েছে বলেও তারা মজুমদার সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু করছে না। কথা শুনে তাদের খুব চমৎকার ছেলে বলে মনে হয় রাশেদের, তার কাছে না এসে তাদের মায়ের বুকের পুষ্টিকর দুগ্ধ খাওয়া উচিত ছিলো এ-বিকেলবেলা, বা স্নানাগারে ঢুকে বিকেলটা তারা উপভোগ করতে পারতো। তারা জানায় তাদের এক বন্ধু দুপুরে ‘রাজাকারের বিচার চাই’ বলে চিৎকার করে বিপদে পড়েছে, তাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে হবে। ছেলেটি দুপুরে কয়েকবার চিৎকার দিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বাসায় ফিরে যায়, কেউ কেউ তার প্রশংসাও করে অন্তত একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে বলে; তবে বাসায় ফেরার কিছুক্ষণ পর, সে যখন মায়ের হাতে বাড়া ভাত খাচ্ছিলো মায়ের হাতের বাড়া ভাত না খেলে আজো সোনার বাঙলার সোনার ছেলেদের পেট ভরে না, পাড়ার যুবরাজরা তাদের বাসায় ঢোকে, মায়ের সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশ হলেও ভাবনা কম ছিলো, কিন্তু তাকে নিয়েছে যুবরাজরা, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যুবরাজরা পাড়ার রাস্তা মোটর সাইকেলের শব্দে সন্ত্রস্ত করে তুলছে, আর তারা ওই প্রতিবাদকারীর বিবেকসম্পন্ন বন্ধুরা, বিপন্ন বোধ করছে। রাশেদকে তারা একটি কাজের ভার দেয়, তাকে মজুমদার সাহেবের সাথে দেখা করে মুক্ত করে। আনতে হবে তাদের বন্ধুটিকে, আর মজুমদার সাহেব যদি চান তবে তারা খত লিখে দিতে প্রস্তুত যে তারা আর তাকে রাজাকার বলবে না। প্রতিবাদকারী ছেলেটির জন্যে।
