রাশেদকে পাশের বাসায় যেতে হবে, মমতাজ বারবার বলছে গিয়ে দেখে আসতে, যদিও তার যাওয়ার ইচ্ছে করছে না; তবে মজুমদার সাহেব ও বেগম মজুমদারকে সহানুভূতি জানানো দরকার, প্রতিবেশীর প্রতি প্রতিবেশীর অন্তত এটুকু দ্ৰ দায়িত্ববোধ থাকা উচিত, আর সে না গেলে কেউ কেউ তা খেয়াল করতে পারে, গোপনে হলেও মনে করতে পারে মেয়েটির আত্মহত্যায় তার একটা সংগোপন ভূমিকা রয়েছে। তার বরং ইচ্ছে করছে, মমতাজকে আর পৃথিবীর সবাইকে না জানিয়ে, চোখ বন্ধ করে মেয়েটির মুখ একবার দেখতে। কিন্তু তাকে যেতে হবে, অপরাধীর মতো রাশেদ পাশের বাসায় গিয়ে ঢুকলো; এটা তার এক বড়ো সমস্যা, কোন পরিস্থিতিতে কেমনভাবে যেতে হয় তা সে বুঝে উঠতে পারে না, ভাবলো অপরাধীর মতো যাওয়াই উচিত হবে; কিন্তু কাউকেই অপরাধী মনে হচ্ছে না, কেউ তো অপরাধ করে নি, যে অপরাধ করেছে সে। অপরাধের ফল পেয়েছে, বারান্দায় লাশ হয়ে পড়ে আছে। তাকে দেখা যাচ্ছে না, কাপড়ে ঢাকা পড়ে আছে সে; রাশেদের একবার দেখার ইচ্ছে হলো, কিন্তু বুঝতে পারলো দেখতে চাওয়া ঠিক হবে না, কেউ দেখতে চাইছে না। বেগম মজুমদার আজ আরো বিস্তৃতভাবে বোরখা পরেছেন, নাকের নিচে তার গোঁফের রেখাঁটি স্পষ্ট দেখা। যাচ্ছে, তিনি ছোটো একটি বই হাতে গুনগুন করে দোয়াকলমা পড়ছেন, তাকে ঘিরে আছে শোকের পাকপবিত্র আবহাওয়া; মজুমদার সাহেবকে উদ্বিগ্ন দেখালেও তার হাসিটাকে পবিত্রই দেখাচ্ছে। তিনি আজ দাড়িটা মসৃণ করে ছাঁটার সময় পান নি, পেলে আরো পবিত্র দেখাতো। পুলিশ আর পাড়ার যুবরাজরা মেয়েটির লাশ কোথায় যেনো নিয়ে যাচ্ছে, হয়তো থানায় বা অন্য কোথাও; সে আত্মহত্যা করেছে, তাকে তো এসব জায়গায় যেতেই হবে। সে আর এ-বাসায় ফিরে আসবে না, তাকে আর বারান্দায় দেখা যাবে না, সে আর মাঝরাতে হঠাৎ একবার চিৎকার করে উঠবে না। তার রোগটাকে গত রাতে সে সারিয়ে ফেলেছে।
মমতাজ বিশ্বাস করছে না, পাড়ার লোকেরাও তার মতোই গোপনে গোপনে বিশ্বাস করছে না আত্মহত্যাটিকে, যেমন তারা কিছুই বিশ্বাস করছে না আজকাল যদিও তারা পাগল হয়ে উঠছে বিশ্বাস করার জন্যে; মেয়েটির পেট ফেড়ে একটা ছোট্ট বাচ্চাও পাওয়া গেছে-এমন কথাও রটছে। কিন্তু বাচ্চাটা কি প্রমাণ করে যে মেয়েটি আত্মহত্যা করে নি? বাচ্চাটা বড়োজোর প্রমাণ করে এটি একটি বাচ্চা, বা আরো কয়েক সপ্তাহ গেলে বাচ্চা হতে পারতো, এখনো ওটি এক টুকরো তুচ্ছ বস্তুই, যা মেয়েদের জরায়ুতে কখনো কখনো দেখা দেয়। ওই বস্তুটি অবশ্য প্রমাণ করছে যে মেয়েটির পেটে ওটির। আবির্ভাবের পেছনে একটা পবিত্রভূতের ভূমিকা ছিলো; হয়তো তাও করছে না, এমনও হতে পারে আজকাল নিজেদের আঙুলের ঘর্ষণেই কাজের মেয়েদের জরায়ুতে এসব বস্তু দেখা দিচ্ছে। মেয়েটি ফাঁসি দিয়ে মরেছে, দড়িটা বেশ উৎকৃষ্ট, ছিঁড়ে পড়ে নি, ভোরে নামাজ পড়তে উঠে বেগম মজুমদার দেখেন মেয়েটি বারান্দায় ঝুলছে। পুলিশ শুরুতে অন্য কথা বলার চেষ্টা করেছিলো, পুলিশের মতো কথা বলার চেষ্টা পুলিশ করবেই, কিন্তু প্রমাণ হয়ে গেছে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। প্রমাণ না হয়ে উপায় নেই, সকালে বাড়ির সামনের রাস্তায় গাড়ির যে-ভিড় হয়েছে তাতেই প্রমাণ হয়ে গেছে কাজের মেয়েটি নিশ্চিতভাবে আত্মহত্যা করেছে। মজুমদার সাহেবের ড্রয়িংরুম আর বারান্দা ভরে আছে প্রমাণে; সেখানে হাঁটছে, বসে আছে, কথা বলছে উদ্দিন মোহাম্মদের দুটি মন্ত্রী, আর পাঁচ-সাতটি দলের গোটা বিশেক নেতা, যাদের কেউ মুক্তিযুদ্ধ করছে এখনো, কেউ আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ গণতন্ত্র ও গণমানুষ ছাড়া কিছু বোঝে না, এবং পাঁচজন রয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধটুদ্ধ স্বাধীনতাটাধীনতায় বিশ্বাস করে না, একটা পাকস্থান বানানোর জন্যে লড়াই করে চলছে। পাড়ার যুবরাজরা রয়েছে ঘরবাড়ি ভ’রেই, মজুমদার সাহেবকে সহানুভূতি জানাচ্ছে তারা আন্তরিকভাবে; মজুমদার সাহেবকে থানায় যেতে হবে না, তবে ব্যাংকে যেতে হবে, যদিও তিনি নিশ্চয়ই যাবেন না, যুবরাজদেরই কেউ যাবে। বাড়িটি হয়ে উঠেছে এক বহুদলীয় সমাবেশস্থল; রাশেদ মনে করতো এরা মুখ দেখে না পরস্পরের, এখন মনে হচ্ছে পরস্পরের মুখ না দেখে এরা। থাকতে পারে না, মেয়েটি আত্মহত্যা করে ভোরবেলা এদের কাছাকাছি আসার ব্যবস্থা করেছে বলে মেয়েটির কাছে এরা যেনো কৃতজ্ঞ। মেয়েটি আত্মহত্যা না করলে আজ ভোরে মজুমদার সাহেবের বাসায় আসা হতো না রাশেদের, কয়েক বছর পাশাপাশি থেকেও আসা হয় নি; মেয়েটি ম’রে আজ ভোরবেলা রাশেদের হাতে জ্ঞানের অনেকগুলো নুড়ি তুলে দিয়েছে; বুঝিয়ে দিচ্ছে সে আর তার মতো সাধারণ মানুষের বিশ্বাসগুলো খুবই হাস্যকর, নেতারা কাজ করে নেতাদের মতে, সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অনুসারে করে না, করলে তারা নেতা হতে পারতো না।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বহু দিন পর দেখা হলো সেলিমার সাথে; রাশেদ তাকে প্রথম চিনতেই পারে নি, কাজের মেয়েটির কথা ভাবছিলো বলে বা মজুমদার সাহেবের বাসায় অভোগুলো নেতা দেখেছে বলে নয়, যখন চিনতে পারলো তখন একটা ধাক্কা খেলো। সেলিমাকে দেখা আনন্দের ব্যাপার ছিলো, সে নিজেও বুঝতো সেটা, ব্যবহারও করতো; বাহু একটু বেশি দেখাতো, ওর বাহু সুন্দর ছিলো, যদিও বুক দেখাতো না, ব্লাউজের নিচপ্রান্তের নিচের ঢেউগুলো তার সুন্দর দেখাতো। তার চেয়ে সুন্দর ছিলো। তার প্রগতিশীলতা, সমাজতন্ত্র আর মুক্তিযুদ্ধের কথা তার লাল ঠোঁট থেকে যখন ঝরতো চারপাশ রঙিন হয়ে উঠতো। সে পদার্থবিজ্ঞান পড়াতো, তারপর মার্কিনদেশে চলে যায়, অনেক বছর তার খবর রাখে নি রাশেদ। সেই সেলিমা দেশে ফিরেছে, ডক্টরেট করেছে, পদার্থবিজ্ঞান পড়াচ্ছে, হয়তো ক্লাশে গিয়ে আর পড়াচ্ছে না; সেলিমা এখন আপাদমস্তক কালো বোরখায় নিজেকে ঢেকেছে, গলায় কারুকাজকরা চাদর ঝুলিয়েছে, কথায় কথায় ইনশাল্লা আলহামদুলিল্লা বলছে, মওলানা সাহেব মনে হচ্ছে তাকে। তার মুখোমুখি বসতে কেমন কেমন লাগছে রাশেদের, বমি এসে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। ডক্টরেট করে সে মার্কিনদেশে থাকে নি, টাকাপয়সা সেও চেনে, সেখান থেকে পড়াতে চলে গিয়েছিলো রিয়াদে, পাঁচবার হজ করেছে, খুব পরহেজগার স্ত্রীলোক হয়ে ফিরে এসেছে, কেউ দোজখের দ্বারে এখন দাঁড়ালে সেখানে স্ত্রীলোকের সংখ্যা একটি কমেছে দেখতে পাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়টি একটি পরহেজগার স্ত্রীলোক পেয়ে ধন্য বোধ করছে, বিজ্ঞানের দরকার নেই, পরহেজগার স্ত্রীলোকই বেশি দরকার, যতো বেশি উৎপাদন হয় ততোই মঙ্গল। মার্কিনদেশে সেলিমার কোনো প্রেমকামিক ছিলো না, রাশেদের মনে প্রশ্ন জাগে, মার্কিন প্রেমকামিক? বাঙালি মেয়েরা বিদেশে গিয়ে বিদেশি প্রেমকামিকই পছন্দ করে, পুলকের পরিমাণ বেশি হয়, দেশি ছোঁকরাগুলো বেশিক্ষণ পারে না; আর দেশে ফেরার পর কোনো কেলেঙ্কারিও হয় না। রিয়াদে যাওয়ার আগে দেশে এসেছিলো সেলিমা বিবি হওয়ার জন্যে; গিয়ে পরহেজগার হয়ে ফিরেছে, বেহেশতে একটা স্ত্রীলোকের সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে, তবে বেহেশতে স্ত্রীলোকের জায়গাটা কোথায় রাশেদ এখনো ঠিক করে উঠতে পারে নি। কিন্তু প্রগতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যার কথা সেলিমা উঁচু গলায় বলতো? তার সারা শরীর ঢেকে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়, আর ভেতরটাও নিশ্চয়ই ওই চেতনায় পরিপূর্ণ। রাশেদ জানতে চায় এমন কিম্ভুত বদল ঘটলো কী করে? শুনে খুব ক্ষুব্ধ হয় আলহজ ডক্টর সেলিমা, কয়েকবার তওবা তওবা করে, তারপর বলে হজ করতে গিয়ে তার হৃদয়ে মহাপরিবর্তন ঘটেছে, বিজ্ঞান দিয়ে কিছু হবে না। সে এখন খাঁটি মুসলমান, রাশেদ যে মুসলমান হয়ে ওঠে নি এতে সে আঁতকে উঠে কয়েকটা দোয়া পড়ে ফেললো। আলহজ সেলিমাকে রাশেদ জিজ্ঞেস করে, এখন ক্লাশে কী পড়ান, রোজা নামাজ হজ জাকাত পতিসেবা? চিৎকার করে উঠে যায় আলহজ সেলিমা, সে একটা কাফেরের সাথে কথা বলতে চায় না।
