অমন খারাপ বই, যে-বই পড়তে তার খুব ইচ্ছে হয়, তেমন বই অনেক দিন আর পড়ে নি রাশেদ; অমন বই পাওয়াই যায় না, পেলেও ভয় লাগে, বাবা দেখে ফেললে। বিপদ হবে। দক্ষিণের বাড়ির রোকেয়ার বিয়ের ক-দিন পর রাশেদ গিয়েছিলো তাদের বাড়িতে, রোকেয়ার বরই রাশেদকে তাদের শোয়ার ছোট্ট ঘরটিতে নিয়ে গিয়েছিলো; রোকেয়া ক-দিনের মধ্যেই মোটা মোটা সুন্দর হয়েছে, বিয়ের পানি পড়লে নাকি এমন হয়, রাশেদ রোকেয়ার গালে কামড়ের দাগ দেখে তার মুখের দিকে তাকাতে পারে নি; তাই বসেই সে বালিশের পাশে রাখা বইটি হাতে তুলে নেয়। রোকেয়া চিৎকার করে তার হাত থেকে কেড়ে নেয় বইটি, বিয়ের আগে ওই বই পড়লে ছেলেরা খারাপ হয়ে যায় বলে সে বলে। রাশেদ লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে, এরপর সে বই সম্পর্কে সাবধান হয়, মনে হতে থাকে খারাপ বইই চারপাশে বেশি। সে তাদের পুরোনো বাক্সে পাওয়া। পত্রিকাগুলো পড়ে বছরের পর বছর ধরে, একই লেখা পড়ে অনেক বার; সেগুলোতে শুধু পাকিস্থান পাকিস্থান কায়েদে আজম কায়েদে মিল্লাত মাদারে মিল্লাত মুসলমান। মুসলমান, পড়তে পড়তে তার ঘেন্না ধরে যায়। ওপরের ক্লাশের ছেলেদের থেকে বাঙলা বই এনেও সে পড়ে, খুব ভালো লাগে। ইস্কুলে দুটি দৈনিক পত্রিকা আসে, ছাত্ররা সেগুলো পড়তে পায় না, রাশেদ হরিপদ স্যারকে বলে সেগুলো এনে পড়ে। সে নিজে দুটি পত্রিকার গ্রাহক হয়, সেগুলো পনেরো দিন পর পর বেরোয়, বছরে দু-টাকা লাগে, এতো কম লাগে বলেই সে গ্রাহক হতে পেরেছে। পত্রিকা পাওয়ার জন্যে সে উদগ্রীব হয়ে থাকে, সব সময়ই পত্রিকা আসতে দেরি হয়; পত্রিকা পেলেই সে প্রথম ঘ্রাণ নেয় কাগজের, পত্রিকার কাগজের ঘ্রাণ চমকার লাগতে থাকে তার। রাশেদ বড়ো হয়ে বুঝতে পারে ওই সময় এতে ব্যাকুল হয়ে সে যা পড়তো, তার বেশির ভাগই পড়ার উপযুক্ত ছিলো না; সে তখন অনেক নিকৃষ্ট লেখকের লেখা পড়েছে, তাঁদেরই সে মনে করেছে বড়ো লেখক, কিন্তু তারা লেখকই নয়, যদিও তাদের লেখা বাঙলা বইতে আছে, তাদের লেখা পত্রিকায় ছাপা হয়। তবু তাঁরাই তার মন ভরে দিয়েছিলেন। রাশেদ বই পড়ে, এবং তার মনে একটা বোধ জন্ম নিতে থাকে যে যা কিছু লেখা হয় তা-ই সত্য। নয়, যা কিছু ভালো বলে মনে করা হয়, তা-ই ভালো নয়, যা-কিছু মানতে বলা হয়, তা-ই মানার যোগ্য নয়। সে অনেক কিছুই মানতে পারছে না। স্যাররা কথায় কথায় কায়েদে আজম বলেন, রাশেদ বলে মোহাম্মদ আলি জন্না। এক স্যার খুব রেগে যান। একবার, বলেন, মোহাম্মদ আলি জিন্না বলবা না, বলবা কায়েদে আজম, আমাদের। জাতির পিতা। চুক করে যায় রাশেদ। একবার হেডস্যার একটি পত্রিকা নিয়ে ক্লাশে ঢোকেন, পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তৃতা লিখে নিতে বলেন, বক্তৃতাটি মুখস্থ করতে বলেন। পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী আমেরিকা থেকে ফিরে সলিমুল্লা হলের ছাত্রদের সামনে একটি বক্তৃতা দেন, যাতে তিনি শূন্যের সাথে শূন্য আর এক যোগ করার। পার্থক্যের কথা বলেন; হেডস্যার বলেন যে বক্তৃতাটি পাকিস্থানের সব ছাত্রদের মুখস্থ। করতে হবে। রাশেদের খারাপ লাগে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা মুখস্থ করতে হবে কেননা? একবার পড়েই সে বক্তৃতাটি ফেলে দেয় খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে। বক্তৃতাটি তাদের ক্লাশের সবাই মুখস্থ করে, এমনকি আজিজও গড়গড় করে ওটি বলে যায়, হেডস্যার রাশেদকে মুখস্থ বলতে বললে রাশেদ বলে একবার সে ওটি পড়েছে, কিন্তু মুখস্থ করার মতো মনে হয় নি। রাশেদের কথা শুনে ক্লাশের সবাই ভয় পায়, এখনি হেডস্যার হয়তো বেত আনতে বলবেন, কিন্তু হেডস্যার চুপ করে রাশেদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন, স্যারের মুখ খুব স্নিগ্ধ দেখাতে থাকে।
২৩৫টি ধর্ষণ, ৮৩টি আত্মহত্যা, ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
২৩৫টি ধর্ষণ, ১৫০টি খুন, ৯৭টি বাস দুর্ঘটনা, ৮৩টি আত্মহত্যা, ১২২টি স্ত্রীহত্যা, ৬৫টি নৌকোডুবি, ৫০৫০টি ডাকাতি, পুলিশ ১২ কোটি, মাস্তানরা ১০ কোটি, আমলারা ১৫ কোটি, ব্যাংক থেকে শিল্পপতিরা ১০৫ কোটি, সেনাপতিরা ২২ কোটি, মন্ত্রীরা ২৫ কোটি, রাজনীতিকরা ২৭ কোটি, উদ্দিন মোহাম্মদ ও তার পত্নী ও উপপত্নীরা ৩৫ কোটি, রাস্তার ভিখিরিটা ১ টাকাও না, রিকশাঅলাটা ১ টাকাও না, আমি ১ টাকাও না-আজকের বাঙলাদেশে-দাড়ি কামাতে কামাতে মনে মনে জাতীয় হিশেব করছিলো রাশেদ, এমন হিশেব করতে করতে দাড়ি কামালে সে দাড়ি কামানোর বিচ্ছিরি ব্যাপারটাকে ভুলে থাকতে পারে, তখন বুঝতে পারলো চারপাশে বা একেবারেই পাশে একটা ঘটনা ঘটেছে। গাড়ির পর গাড়ি আসছে, সামনের রাস্তা ভরে গেছে পাজেরো জিপ টয়োটা বেবি আর যা যা আছে সে-সবে, সবাই পাশের বাসায় উঠছে নেমেও আসছে, বেশ কয়েকটা পুলিশও দেখা যাচ্ছে জানালা দিয়ে। পুলিশগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ দেখানোর চেষ্টা করছে নিজেদের, কিন্তু মাঝেমাঝে সামাল দিতে গিয়ে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে, তখন কালোবস্তুটা মুখের সামনে নিয়ে চিৎকার করছে। রাশেদের মনে পড়লো পাশের বাসার কাজের মেয়েটি, মাসখানেক ধরে, মাঝরাতে আর হঠাৎ চিৎকার করে উঠছে না, ওর রোগটা হয়তো সেরে গেছে, বা হয়তো এখন চিৎকারের বদলে মাঝরাতে খিলখিল করে হাসে। হাসি এক বাসা পেরিয়ে আরেক বাসায় আসার কথা নয়, হাসি হৃদয়ের অন্তরঙ্গ সম্পদ, জড়িয়ে জড়িয়ে থাকে; চিৎকারই দূরে যায় হাসি যায় না। কয়েক দিনের মধ্যে মেয়েটিকে দেখেছে বলে তার মনে পড়ছে না, বা একদিন দেখেছে, মুখটি বেশ ভরাট আর শরীরটি আরো ভরাট হয়ে উঠেছে, ভরাট বালিকা দেখলে রাশেদের গ্রামকে মনে পড়ে, সুযোগ পেলে সিনেমায় নেমে এমএ পাশ ধুমশিগুলোকে সে দেখিয়ে দিতে পারতো, এ-সময়ের মহান শিল্পটাকে উল্টেপাল্টে দিতে পারতো; বেগম মজুমদারকেও দেখা যাচ্ছে না, তিনি হয়তো কাবার আলো’ নিয়ে ব্যস্ত আছেন; মহৎ একখানা বই লিখছেন মহীয়সী মহিলা, এমন একখানা কেতাবের খুব দরকার ছিলো মুসলমানের, ইসলামি সাহিত্যের অমর উদাহরণ হয়ে থাকবে বইখানি। তবে তিনি ইসলামকে একটুখানি অমান্য করছেন, লেখাটির সাথে তিনি নিজের নাম ছাপছেন, এটা ইসলামসম্মত হচ্ছে না; কয়েক দিন আগে রাশেদ একখানা ইসলামি বই পড়েছে, পাতায় পাতায় মারহাবা করতে ইচ্ছে হয়েছে, তাতে হজরত মাওলানা সাব লিখেছেন নারীদের বই লেখা উচিত নয়, তাতে পর্দা নষ্ট হয়, আর লিখলেও তাতে নিজের নাম দেয়া পাপ, কেননা তাতে পরপুরুষের সাথে সম্পর্ক হয়, যা জেনার সমান। তবে বেগম মজুমদারের বইখানি পড়লে ওই হজরত মাওলানা সাব পাগল হয়ে যাবেন; বইখানি বেরোলে রাশেদ কিনে সোনার পানি দিয়ে বাধিয়ে রাখবে, পৌত্রপৌত্রীরা পড়বে, তখন হয়তো অন্যান্য বই পড়া নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। স্নানাগার থেকে বেরিয়েই রাশেদ শুনলো পাশের বাসার কাজের মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে; একটুও চমকালো না সে, কাজের মেয়েদের মুখ বুক শরীর ভরাট ভরাট হয়ে উঠলে তো তারা আত্মহত্যা। করবেই। এটা সভ্যদের কাজ, সভ্যরাই আত্মহত্যা করে; কাজের মেয়েগুলো যেমন সভ্য হয়ে উঠছে আজকাল, তাদের সাংস্কৃতিক মান যেমন উন্নত হচ্ছে, শহরে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের শরীর যেমন ভরাট হয়ে উঠছে, তাতে আত্মহত্যার সভ্য কাজটি অনতিবিলম্বে সম্পন্ন করা অবধারিত হয়ে উঠছে তাদের জন্যে। কোন পাড়াগা থেকে একটা অসভ্য মেয়ে এসেছিলো, এসেই সভ্য হচ্ছিলো, মাঝরাতে শুধু একবার হঠাৎ অসভ্য চিৎকার করে উঠছিলো, এখন সে সভ্যতার পরিণতি হয়ে উঠেছে। রাশেদ। পাটখেতের গন্ধ পাচ্ছে, বড়ো একটা পাটখেত মনে হচ্ছে শহরটাকে, একটি কিশোরী যাচ্ছে পাটখেতের ভেতর দিয়ে, টয়োটা পাজেরো শীততাপনিয়ন্ত্রণ থেকে কাস্তে হাতে নেমে আসছে নৃশংস কৃষকেরা, লাশ পড়ে থাকছে খেতের ভেতরে, উরুতে জমে থাকছে চাক চাক রক্ত।
