ভাত খুব মারাত্মক জিনিশ। ছোটোবেলা থেকেই রাশেদ দেখে আসছে ঘরে ঘরে ভাতের অভাব, তাদের গ্রামে পেট ভরে খেতে পায় এমন ঘরের সংখ্যা খুব কম, দশবারোটির বেশি হবে না; তাদের বাড়িরই অন্য তিন ঘরের লোকেরা ঠিকমতো খেতে পায় না। পশ্চিম ঘরের বউ-আম্মা আর তার শাশুড়ী প্রায় না খেয়েই থাকে। বউ-আম্মার স্বামী, রাশেদের চাচতো কাকা, বিয়ের পর বউ-আম্মাকে আর দাদীকে রেখে, পাঁচ-ছ বছর আগে, সেই যে আসাম গেছে দরজি না কিসের কাজে, আর আসে নি, কবে। আসবে কেউ জানে না, রাশেদ মাঝেমাঝে শুনতে পায় কামরূপ গেলে কেউ আর ফেরে না; বছরে দু-একবার টাকা পাঠায় লোকের সাথে, পঞ্চাশ ষাট টাকা, হাতে আসার সাথে সাথে খরচ হয়ে যায় বাকি শোধ করতে করতে, সব বাকি শোধও করতে পারে না। তারা খায় খুদের ভাত, সকালে খায় দুপুরে খায় রাতেও খায়, সকালে খেলে দুপুরে খায় না, দুপুরে খেলে রাতে খায় না। গ্রামের লোকেরা এ-সময় শাপলাই খায় বেশি, বউ-আম্মা শাপলাও পায় না, কে তাকে বিল থেকে শাপলা তুলে এনে দেবে? রাশেদ। আর নানু যেদিন শাপলা তুলতে যায়, বউ-আম্মার জন্যেও শাপলা তুলে আনে, তার জন্যে মোটা মোটা কয়েক আটি শাপলা তোলে, বউ-আম্মা সেগুলো ঘাটে ভিজিয়ে রাখে, যেদিন খুদও থাকে না সেদিন দুপুরে শাপলা রাঁধে। তার একটা জালি আছে, পুরোনো শাড়ি দিয়ে বানানো, সেটি দিয়ে সে গুড়োচিংড়ি আর তিনি ধরে। সন্ধ্যায় সে ঘাটে। জালি পাতে, জালিতে কুঁড়োর আধার দেয়, মাঝেমাঝে জালি তোলে, জালিতে যে-কটি গুড়োচিংড়ি আর তিনি ওঠে, সেগুলো জমিয়ে রাখে মাটির ঘটে। গুঁড়োচিংড়ির বড়া খায় দিনের পর দিন, শাপলা খায়, চালের ভাত সাত দিনে একদিনও খায় না, খুদের। ভাত খায়। জালালদ্দি শেখও তাই খায়, যদিও সে সন্ধ্যায় তামাক খেতে এসে বাবার সাথে গল্প করতে করতে বলে দুপুরে সে ইলিশ মাছ দিয়ে বোরো চালের ভাত খেয়েছে। মিষ্টি আলু পছন্দ করে রাশেদ, পোড়া মিষ্টি আলু খেতে খুব ভালো লাগে, বিশেষ করে। ভালো লাগে বেশি পোড়া অংশ চিবোতে; তবে মিষ্টি আলু ভাত নয়। মিষ্টি আলু ভাত না হলেও ভাতের বদলে গ্রামের অনেকেই আলু খেয়ে থাকে। আলুর নৌকো এলে মা। রাশেদকে ডাকতে বলে, চার আনায় একধড়া আলু পাওয়া যায়, একধড়ার কম বেচে না। আলুঅলা, রাশেদের মা দু-তিন ধরা মিষ্টি আলু রাখে। জালালদ্দিও ঘাটে এসে দাঁড়ায়, আলুর মণ কতো জিজ্ঞেস করে, এক মণ আলু মাপতে বলে, আলুঅলা অবাক হয়; জালালদি বলে সে মণের নিচে আলু কেনে না, তবে আলু মাপতে শুরু করলেই সে আলুঅলাকে বলে সে আজ আলু কিনবে না, ঘরে কয়েক মণ আলু পড়ে আছে। বউ-আম্মাও ঘাটে এসে দাঁড়ায়, আলুর দিকে এমনভাবে তাকায় যেনো সে সোনার দিকে তাকিয়ে আছে। রাশেদের মা বলে, বউ, তুমিও একধড়া আলু রাক। মার কথা শুনে রাশেদের সুখ লাগে।
দুপুর হলে রাশেদদের বাড়িতে দাও তার ভাঙা, পেছন দিকে অর্ধেক খসেপড়া, নৌকোটি বেয়ে আসে, সে নৌকো সেঁচতে সেঁচতে আসে। তার নৌকোটির পেছনের দিকটা নেই, আর যতোটুকু আছে তার সবটা ভরেই ফুটো, সে আঠাল মাটি দিয়ে অসংখ্য ফুটো বন্ধ করেছে, কিন্তু নৌকোটির দিকে দিকে পানি উঠতে থাকে। সে নৌকোটি রাশেদদের ঘাটে ভিড়োয়, খেজুরগাছের সাথে বাধে, তবে বাড়ি ফেরার সময়। তাকে নৌকোটি উঠোতে হয় পানির নিচে থেকে। দাগু জোলা বা তাঁতী, তবে তাঁত নেই অনেক বছর; কামলা খাটে সে, রাশেদদের বাড়িতে বছর ভরেই খাটে, কিন্তু এ-সময়। কেউ কামলাও খাটায় না। দাগুর বাচ্চাও অনেকগুলো, সেদ্ধ শাপলা খেয়েই তারা বেঁচে আছে। দাগু আসে ফেনের জন্যে। গ্রামে ফেনও দুষ্প্রাপ্য, গ্রামে যেমন ভাতের গন্ধ পাওয়া যায় না তেমনি পাওয়া যায় না ফেনের গন্ধও। দাগু ফেনের দিকে যেমনভাবে তাকায় রাশেদের নেড়া কুকুরটিও তেমনভাবে তাকায় না; কুকুরটির ফেনের পাতিল থাকে খেজুরগাছের গোড়ায়, মা কুকুরটির পাতিলে ফেন ঢেলে দেয়, কুকুরটি দূরে শুয়ে শুয়ে দেখে, তার উঠতে ইচ্ছে হয় না, কিন্তু দার পাতিলে ফেন ঢালার সময় চকচক করে ওঠে দাগুর চোখমুখ। দাগু কুকুরের পাতিলটার দিকেও তাকায়, ওই ফেনটুকু। পেলে সে আরো খুশি হতো, কুকুরটি দাগুর পাতিলের দিকে একবারও তাকায় না। ফেন নিতে একা দাগুই আসে না, তার ভাই ছিটুও আসে, জালালদ্দির বউও আসে, কালার মাও আসে। যেদিন তারা সবাই আসে, তারা একে অন্যের মুখের দিকে তাকায় না, পারলে তারা ঝাঁপিয়ে পড়তো একে অপরের ওপর, ঝাঁপিয়ে না পড়ে তারা বসে থাকে মুখ কালো করে। রাশেদের ক্ষুধা পায় রান্না শেষ হওয়ার আগেই, রান্নাঘরে এসে সে। উঁকি দেয়, ওই মুখগুলো দেখে তার আর ক্ষুধা থাকে না।
রাশেদকে ঘিরে আছে মানুষ গাছপালা পাখি পুকুর ধানখেত আকাশ মেঘ বৃষ্টি আর তার বইগুলো; সে অনুভব করছে মানুষ গাছপালা পুকুর পাখি ধানখেত আকাশ মেঘ। বৃষ্টি যেমন সত্য তেমনি আরেক সত্য আছে বইগুলোর মধ্যে, ওই সত্যই তাকে আকর্ষণ করছে বেশি। মানুষ সুন্দর, তবু মানুষ তার মনে ঘেন্না জাগাচ্ছে, কষ্ট জন্ম দিচ্ছে; মানুষকে সব সময় সুন্দর মনে হচ্ছে না তার, মানুষ খুব খারাপ হতে পারে, কুকুরের থেকেও খারাপ হতে পারে, মানুষের থেকে পালিয়ে যেতেই ইচ্ছে করছে তার। মাঝেমাঝে; আরো বেশি সুন্দর গাছপালা পুকুর পাখি মেঘ বৃষ্টি ধানখেত, এসব কষ্ট দেয় না, মনে ঘেন্না জাগায় না, চোখের সামনে উপহার দেয় সুন্দরের পর সুন্দর, কিন্তু তারা কথা বলে না, স্বপ্ন দেখে না, ভাবে না, দূরকে কাছে আনে না। বইগুলো চুপ করে থাকে, বইয়ের পাতা খুললে কোনো পাখি ডেকে ওঠে না কোনো ফুলের গন্ধ পাওয়া যায় না কোনো মানুষের মুখ দেখা যায় না, তবু বইগুলোর ভেতরে যেনো সব আছে, মানুষ আছে গাছপালা নদী মেঘ বৃষ্টি আছে, এবং আরো এমন কিছু আছে যার কথা রাশেদ জানতো না এখনো জানে না, যার কথা তাদের গ্রামের মানুষ জানে না, যার কথা জানে না ওই হিজলগাছ, জানে না পশ্চিমের ঝোঁপের ডাহুক। বই রাশেদের সামনে খুলে ধরে। এক আশ্চর্য জগত, সে-জগতের ছন্দমিল তাকে কম্পিত করে, তার চিন্তা তাকে চিন্তিত করে, তার ভাবনা তাকে ভাবায়। রাশেদ তার বইগুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বারবার পড়ে, বাঙলা ইংরেজি অঙ্ক ভূগোল সবই তাকে আকর্ষণ করে, আলোড়িত করে; কিন্তু ক্লাশের বইগুলো পড়া হয়ে গেলে আর পড়ার কিছু থাকে না। ক্লাশের বইয়ের বাইরে যে বই আছে তা সে আগে জানতোই না, ইস্কুলের পাঠাগারে অনেক বই আছে কিন্তু। সেগুলো কেউ পড়ে না, কাউকে পড়তে দেয়া হয় না। ক্লাশের পাঠ্যবইয়ের বাইরের কোনো বই তাকে তার বাবা কখনো এনে দেন নি, তাদের গ্রামে কারো ঘরেই আর কোনো বই দেখে নি রাশেদ; তবে একদিন সে, সেভেনে পড়ার সময়, তাদের ঘরেরই একটি পুরোনো বাক্স খুলে অবাক হয়ে যায়; দেখতে পায় সিন্দুকটি ভরে আছে বই, অনেকগুলো পত্রিকা, পত্রিকা শব্দটি সে শেখে আরো পরে, রাশেদ সেগুলো পড়তে। থাকে, মুগ্ধ হতে থাকে, শিউরে উঠতে থাকে। একটি বই পড়ার চাঞ্চল্য সে কখনো ভুলবে না। বইটিতে নায়ক তার জুতো ফেলে যায়, নায়িকা তা সংগ্রহ করে রাখে। গোপনে; নায়িকার জ্বর হয়েছিলো বলে চুল কাটতে হয়েছিলো, সে-চুল সংগ্রহ করে। রাখে নায়ক; পড়তে পড়তে চঞ্চল হয়ে উঠতে থাকে সে। এমন বই সে আগে পড়ে নি, তবে বইটি শেষ করে উঠতে পারে নি রাশেদ। সে যখন চঞ্চল হয়ে উঠছিলো পড়তে। পড়তে, বাবা এসে দাঁড়ান টেবিলের পাশে, রেগে ওঠেন তার হাতে ওই বই দেখে, রাশেদের হাত থেকে তিনি নিয়ে যান বইটি। রাশেদ আর বইটি পড়তে পারে নি। ওই সব বই পড়তে নেই ছেলেদের, পড়লে ছেলেরা খারাপ হয়ে যায়, যেমন মেয়েদের সাথে কথা বলা খারাপ, মেয়েদের সাথে কথা বললে খারাপ হয়ে যায় ছেলেরা।
