রাশেদ ফিরে এসেই পড়তে বসে, সে আর এসব ভাবতে চায় না, দেখতে চায় না, কেঁপে উঠতে চায় না। চিৎকার করে পড়ে, চিল্কারে যেনো তার মাংসের কাঁপন কমে; সে ইতিহাসের ভেতর ঢোকে, ভূগোল বইয়ে ভ্রমণ করতে থাকে মহাদেশ থেকে মহাদেশে, জ্যামিতির বৃত্ত ও ত্রিভূজের মধ্যে খোঁজে শীতলতা। এমন সময় বৃষ্টি নামে, টিনের চালে কোটি কোটি পরীর নূপুর বেজে ওঠে; পশ্চিম পাশের খেজুরগাছটি চালের ওপর ডানা ঝাঁপটাতে থাকে। নিবিড় বৃষ্টি নেমেছে, বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না, মহাজগত ভরে একটানা কোমল মধুর অন্তরঙ্গ বৃষ্টির শব্দ বেজে চলছে। রাশেদকে বিলু আপা খাওয়ার জন্যে ডাকে, রাশেদ চুপচাপ কোনো কথা না বলে খায়, বাবা তাকে। পড়ার কথা জিজ্ঞেস করেন, রাশেদ জানায় ভালোই হচ্ছে, খাওয়ার পর আবার পড়তে বসে। বাইরে নিবিড় কালো বৃষ্টি, রাশেদ মনে মনে দেখতে পায় বৃষ্টিতে পুকুরপাড়ের। হিজলগাছটি ঘুমিয়ে পড়ছে, ধানের পাতা ভিজে ভিজে ভাড়ি হয়ে পানিতে লুটিয়ে পড়ছে, বৃষ্টির ফোঁটায় পানিতে শাদা শাদা ঝিলিক উঠছে। তার খুব ঘুম পায়, টেবিলে মাথা রেখে রাশেদ ঘুমিয়ে পড়ে একবার, কিছুক্ষণ পর মায়ের ডাকে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তার শরীর এখন স্নিগ্ধ শীতল লাগছে, কথা জড়িয়ে সে শুয়ে। পড়ে। বাইরে ঘুমের মতো বৃষ্টির ঘুমের মতো শব্দ, রাশেদের মনে হয় সে মাটির মতো। গলে যাচ্ছে, বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে বয়ে চলছে পুকুরের দিকে, তার ত্বক গলছে, মাংস। গলছে, রক্ত গলছে, গলে গলে পুকুরের দিকে বয়ে চলছে। রাশেদ ঘুমিয়ে পড়ে। সে স্বপ্ন দেখে, যেমন স্বপ্ন আগে দেখে নি, এক স্বপ্নের মতো নারী যাকে সে কখনো দেখে নি যার রূপের মতো রূপ সে কখনো দেখে নি যার ঠোঁট ডালিম ফুলের মতো হিজল। ফুলের মতো রঙিন সে রাশেদের আঙুল নিয়ে খেলা করছে রাশেদ তার হাত নিয়ে খেলা করছে নারী রাশেদের গ্রীবায় হাত রাখছে রাশেদ তার গালে হাত রাখছে তার শাড়ি উড়ছে তার বুক ধবধব করছে রাশেদ হাত বাড়াচ্ছে আর তখন শরীর কেঁপে কেঁপে উঠে স্বপ্ন ভেঙে যায় স্বপ্ননারী শূন্যে মিলিয়ে যায়। চাপা হতাশার মধ্যে ঘুম ভেঙে যায় রাশেদের, তার শীত শীত লাগতে থাকে, ভিজে গেছে বলে তার বোধ হয়, সে হাত বাড়িয়ে ছোঁয়, আঙুলে আঠা আঠা লাগে, ঘেন্নায় অবসাদে রাশেদ কুঁকড়ে ওঠে। পাশের বাড়ির জালালদি শেখ, যে রাশেদের বাবার থেকে দশ বছরের বড়ো হবে, রাশেদের বাবা যাকে চাচা বলে, গালাগাল করে চলছে তার স্ত্রীকে; প্রতিদিন সকালে দুপুরে সন্ধ্যায়ই সে গালাগাল করে, রাশেদ শুনতে পাচ্ছে পড়ার ঘর থেকে। রাশেদ ওই গালাগাল শুনে প্রতিবারই ভয় পায়, নিজের জন্যে নয়, জালালদি আর তার স্ত্রীর জন্যে, তবে সে দেখেছে আর কেউ ভয় পায় না। ভয়টা তার রক্তে কালো কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকে। জালালদ্দি গলা ফাটিয়ে গালি দিচ্ছে যদিও তার গলায় জোর কম, চোতমারানির ঝি, তরে তালাক দেই, তর মারে তালাক দেই, তর মাইয়ারে তালাক দেই, তুই আমার বাড়ি থন বাইর অইয়া যা। জালালদ্দির মুখ থেকে ভণ্ডকথা ময়লার মতো উছলে পড়তে থাকে, গ্রামের অনেকেই ভণ্ডকথা বলে, বউকে গালি দেয়ার সময় তারা মুখে ফেনা তুলে। ফেলে, তবে তার মতো কেউ নয়। এসব গালাগাল রাশেদের মনে দলাপাকানো ঘেন্না। সৃষ্টি করে, আর তালাক কথাটি তাকে ভীত করে, তবে আর কাউকে করে বলে মনে হয় না; তালাক বললেই তো তালাক হয়ে যায় বলে সে শুনেছে, ওই পুরুষলোক আর মেয়েলোক আর এক সাথে থাকতে পারে না, থাকলে কবিরা গুনা হয়, তাদের দিকে পাথর ছুঁড়ে মারতে হয়, কিন্তু জালালদি আর তার বউর তালাক হচ্ছে না। তারা একসাথেই থাকছে। সে তার বউকেই শুধু তালাক দেয় না, দেয় শাশুড়ীকেও, ভয়ঙ্কর লাগে কথাটি, আরো কুৎসিত হচ্ছে সে তালাক দেয় তার নিজের মেয়েকেও। মেয়েকে কি তালাক দেয়া যায়, নিজের মেয়ে কি নিজের বউ হয়, নিজের মেয়ের সাথে কি সে। ঘুমোয়? ঘিনঘিনে লাগে রাশেদের। জালালদ্দি শেখের মেয়েটি রাশেদদের বাড়িতে এসে রান্নাঘরে বসে বিড়বিড় করতে থাকে, আমার জাউরা বাপটার মোখে কোনো ট্যাক্সো নাই। জালালদ্দির বউ গালি শুনে কথা বলে না, তবে একটু পরে জালালদ্দি যখন তাকে মারতে শুরু করে, তখন তার গলা শোনা যায়। জালালদ্দি লিকলিকে মানুষ, দিনভর কাশে, হয়তো যক্ষ্মা হয়েছে, নারাণগঞ্জের কারখানায় কাজ করে, বাড়ি আসে দু-তিন মাস পর পর। কয়েক বছর আগে আরেকটা বউ এনেছিলো সে, বেশ সুন্দর ছিলো। দেখতে, সবাই তাকে শহরনি বলতো, কসবিও বলতো। পাড়া বলতে রাশেদ বুঝতে তাদের গ্রামের পাড়াগুলোকেই, তবে শুনে শুনে রাশেদ বুঝে ফেলেছিলো আরেক ধরনের পাড়া আছে, সেগুলো শহরের পাড়া, যেখানে খারাপ মেয়েমানুষেরা থাকে, শহরনিও। খারাপ মেয়েমানুষ, জালালদি ওই পাড়া থেকে তাকে নিয়ে এসেছে। রাশেদের খারাপ। মনে হতো না তাকে, রাশেদকে সে আদর করতো, তার হাসিটাও সুন্দর ছিলো। কয়েক মাস পরেই সে চলে গিয়েছিলো, গ্রামের মানুষ তাকে তাড়িয়ে দেয় নি, জালালদ্দি তাকে এতো মারতো যে সে থাকতে পারে নি। জালালদ্দি তার বউকে মারতে শুরু করে, বউটি গাল সহ্য করলেও মার সহ্য করে না; সে চিৎকার করে ওঠে, ঢ্যামনার পো শরিলে হাত দিবি না, আমারে তালাক দিয়া তুই তর মার লগে হো গিয়া। জালালদি। তাকে মারতে চেষ্টা করে, পারে না, তার বউর শক্তি জালালদ্দির থেকে বেশি; বউ ঠেলা দিয়ে জালালদ্দিকে গোবরের ওপরে ফেলে দেয়। জালালদ্দি চিৎকার করতে করতে খসে-পড়া লুঙ্গি ধরে উঠে দাঁড়ায়, বকতে বকতে রাশেদদের বাড়ির দিকে আসতে থাকে। রাশেদ জানে জালালদ্দি তার পড়ার ঘরের জানালার পাশে এসে দাঁড়াবে, ছেঁড়া লুঙ্গির প্রান্ত দু-হাতে ধরে অনেকক্ষণ ধরে বিলের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তার সাথে কথা বলবে। জালালদি তার সাথে কথা বলে স্নেহের সাথে, রাশেদকে ডাকে দাদা। বলে, রাশেদকে ছুঁয়ে দেখতে চায়; বলে, দাদা পড়ছ নি, পড়, পড়, বেশি কইর্যা পড়, বড় অইয়া তুমি জজ অইবা, আমারে তহন চাকর রাইক্ক। রাশেদের তখন খুব ভালো লাগে লোকটিকে, তার ভাঙা গাল আর খোঁচা খোঁচা দাড়ির দিকে তাকিয়ে মায়া হয়; রাশেদ জিজ্ঞেস করে, দাদা, আপনি এতো গালাগাল করেন কেনো? জালালদি লজ্জা পায়, বলে, দাদা, আমি কি মানুষ? রুজি করতে পারি না, বউরে খাওয়াইতে পারি না, মাইয়ারে কাপড় দিতে পারি না, খালি গাইল দিতে পারি। আইজ কি খামু তারও ঠিক নাই।
