রাশেদ জানতে চায় রাবুর মার যে পেট হয়েছে, কেউ দেখেছে; আজিজ জানায় কেউ দেখে নি। তাহলে কি স্যারের শত্রুরা এটা বানিয়েছে তাঁকে বিপদে ফেলার জন্যে? রাশেদ আর আজিজ ঠিক করে উঠতে পারে না ঘটনাটি সত্য কী সত্য নয়। সত্য কী করে হবে, ওই বাড়িতে তো গ্রামের কেউ যায়ই না, তারাও যায় না কারো বাড়িতে, তাই কে দেখেছে রাবুর মায়ের পেট হয়েছে? আজিজ বলছে, স্যার ওই বাড়িতে যান, রাতেও থাকেন, তাই ঘটনা সত্য হতেও পারে। কিন্তু তিনি যে রাতে থাকেন, তা কেউ দেখেছে? তা দেখে নি, তবে তিনি বিকেলে ওই বাড়িতে যান, তাকে কেউ আর বেরিয়ে আসতে দেখে না, তাই মনে হয় তিনি রাতে থাকেন ওই বাড়িতে। পুরুষমানুষ আর। মেয়েমানুষ একলা থাকলে ওই কাজ না করে পারে না। আজিজ একটা বইয়ে পড়েছে পুরুষমানুষ আর মেয়েমানুষ একলা থাকলে শয়তান হাজির হয় মাঝখানে, শয়তান কানে কানে ওই কাজ করতে বলতে থাকে, শয়তান বলে ওই কাজ আঙুরের মতো মিষ্টি বেদানার মতো মিষ্টি শরাবের মতো মধুর, তখন আর তারা না করে থাকতে পারে না। রাশেদের তীব্র ইচ্ছে হয় ওই বইটি পড়ার। আঙুর বেদানা শরাব কোনোটিই তখনো রাশেদ দেখে নি, এগুলোর কথা শুনেছে, এগুলোর কথা শুনলেই কেমন যেনো লাগতে থাকে, আর আজ আঙর বেদানা শরাব তার রক্তকে খেজুররসের মতো জ্বাল দিতে। থাকে, রক্ত থেকে উঠতে থাকে তীব্র সুগন্ধ, এবং একটি বিষের স্রোতও তার রক্তের ভেতরে বইতে থাকে। রাশেদ বুঝতে পারছে সত্য বা মিথ্যে যা-ই হোক এবার লোকেরা একটা শাস্তি দেবে বারেক স্যারকে; তবে ওই শাস্তির থেকে তার ভেতরে অন্য এক আগুনের দাউদাউই সে বেশি টের পেতে থাকে। নতুন জ্ঞান তার রক্তে আগুন। জ্বেলে দিয়েছে। মাতবররা বিচার ডাকতে পছন্দ করে, বিচার করে সাধারণত জুতো মারে, সাধারণত ভুল লোককেই জুতো মারে; বিচারে ডেকে তারা যদি বারেক স্যারকে জুতো মারতে পারতো, খুব সুখ পেতো তারা; কিন্তু তারা জানে স্যার তাদের বিচারে আসবেনই না। তিনি তাদের মূর্খ মনে করেন গাধা মনে করেন; মাতবরদের জন্যে এটা খুব অপমানের, তারা সত্যিই মূর্খ আর গাধা বলেই হয়তো। কয়েক দিন পরই তারা। স্যারকে শাস্তিটা দেয়। স্যার নৌকো বেয়ে বিকেলবেলা রাবুদের বাড়ির দিকেই যাচ্ছিলেন, তাঁর নৌকোটি যখন দক্ষিণের ধানখেতের কাছাকাছি আসে তখন দু-দিক থেকে দু-মাতবরের দু-চাকর লগি মেরে এসে তার নৌকোয় ঢু দেয়; বারেক স্যার তাদের ধমক দিলে তারা তাকে আক্রমণ করে, লগি দিয়ে বাড়ি মারতে থাকে, বারেক স্যার পানিতে পড়ে যান, তাঁর মাথা ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। চাকর দিয়ে বারেক স্যারকে পিটিয়েও হতাশ হয়ে পড়ে মাতবররা; তারা ভেবেছিলো মার খেয়ে বারেক মাস্টার নিশ্চয়ই চাকরদের বিচার চাইতে আসবে তাদের কাছে, তখন তারা আস্তে আস্তে তুলবে রাবুর মায়ের পেট হওয়ার কথাটি; কিন্তু বারেক স্যার কোনো অভিযোগ করেন। নি। রাশেদ আর আজিজ একবার গিয়েছিলো স্যারের কাছে, তিনি বলেছিলেন মূর্খ আর। গাধাদের নিয়ে তিনি ভাবেন না।
আজিজের দেয়া জ্ঞান রক্তে পরিণত হয়ে গেছে রাশেদের, সব সময়ই তা সে টের পাচ্ছে, রক্তকেও সে এতোটা টের পায় না, নিশ্বাসকেও পায় না। রাশেদ ইস্কুলে যাচ্ছে, বই পড়ছে, বিলু আপার মুখের দিকে আর ভালো করে তাকাতে পারছে না, পুষু আপার ব্লাউজের প্রান্তরে নিচের মাংসের ভাজ চোখে পড়তেই অন্ধের মতো চোখ বুজে। ফেলেছে। মাংসে সে কাঁপন বোধ করে চলছে যা আগে কখনো বোধ করে নি; একটা ঘোর, ঘুমের মতো, ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের মতো, স্বপ্নের মধ্যে জেগে থাকার মতো, তাকে ঘিরে ফেলছে। একা থাকতে ভালো লাগছে, কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, চোখের সামনে কী যেনো দেখতে পাচ্ছে সারাক্ষণ। কয়েক দিন পর বিকেলবেলা ইচ্ছে হলো নৌকো বেয়ে একটু বেরিয়ে আসতে; বড়ো নৌকোটি নিয়ে নান, তাদের চাকর, চলে গেছে দোয়াইর পাততে, বিকেলে এ-সময় নানু দোয়াইর পাততে যায়, ঘাসফড়িং গেঁথে চিংড়ি ধরার জন্যে ধানখেতের আলের মাঝখানে দোয়াইর পেতে আসে। কোনো কোনো দিন নিয়ে যায় রাশেদকেও, আজ নিয়ে গেলে তার রক্ত ঠাণ্ডা হতো। তার নিজেরও একটি ছোট্ট কোশানৌকো রয়েছে, রাশেদ সেটি ক’রে ইস্কুলে যায়, কিন্তু বেড়ানোর জন্যে কোশাটি খুব ভালো নয়। রাশেদ তবু বেরিয়ে পড়ে, চারদিকে পানি ফুলে ফুলে উঠছে, তার বৈঠার আঘাতে ঢেউ উঠছে পানিতে, ঢেউ দেখতে পুষু আপার ব্লাউজের প্রান্তের মাংসের ভাঁজের মতো, পানিতে প্রায় ডুবে আছে পাড়াগুলো, দূরে পুকুরপাড়ে হিজলগাছটি মাথা পর্যন্ত ডুবে গেছে। রাশেদ দূর থেকে দেখতে পায় হিজলের ডালপালার ভেতর থেকে বেরিয়ে আছে তাদের নৌকোটির গলুই, নানু হয়তো নৌকো লাগিয়ে মজা করে বিড়ি টানছে। নানু লুকিয়ে লুকিয়ে সতীলক্ষ্মী বিড়ি খায়, বিড়ির গন্ধটা রাশেদের বেশ লাগে। রাশেদ কোশানৌকোটি বেয়ে হিজলগাছের কাছে যায়, নৌকোর গলুই ধরে, ডালপালার ভেতরে নানুকে দেখে কেঁপে ওঠে। নানু লুঙ্গি অনেকটা খুলে ফেলেছে, বা হাত দিয়ে সে নৌকো ধরে আছে, তার চোখ বোজা, ডান হাত দিয়ে সে তার শিশ্ন নাড়ছে, জোরে জোরে নাড়ছে, জোরে জোরে নাড়ছে। রাশেদ স্তব্ধ হয়ে যায়, নানুকে ডাকতে ভুলে যায়, পাতার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকে; নানু চোখ বুজে দ্রুত নাড়ছে, ভয়ঙ্কর সুখকর স্বপ্ন দেখছে, তার ভেতর থেকে মৌচাকের মধু আর জাতসাপের বিষ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নানুর ভেতর তেকে শাদা লালা ফিনকি দিয়ে বেরোয়, তার শরীর বেঁকে বেঁকে যায়। ঘুমঘুম চোখ খুলে নানু রাশেদকে দেখে, সুখে অবসাদে সে ভরে আছে। রাশেদ দূর থেকে দেখে শাদা বস্তুটি, তার ঘেন্না লাগে, আজিজ এরই কথা বলেছিলো। নানু বলে, দাদা, আমার বিয়ার বয়স অইয়া গ্যাছে, আমি বিয়া করুম, বিয়া না করলে বাচুম না, দেহেন না খাণ্ডা খাণ্ডা মণি বাইরয়।। রাশেদের ঘেন্না লাগে; তার সব কিছু কাঁপতে থাকে, তার কোশাটি কাঁপতে থাকে, নিচে ভাদ্রের পানি কাঁপতে থাকে। ধীরে ধীরে কাঁপতে থাকে সারা গ্রামটি।
