রাকিব বলে, হাসান, এই ভাগাড়ে তুমিও একটু মোতো, মোতার জইন্যে এর থিকা ভাল জায়গা আর পাইবা না, বড় কবিরা কোটিপতির বাড়িতে এইভাবেই মোতে, মোতো হাসান মোতো।
রাকিব সুলতান যেনো পাঁতাগ্রুয়েল হয়ে উঠেছে।
হাসানেরও তীব্র প্রস্রাবে ধরেছে, তার তলপেট ফেটে যাচ্ছে, শিশ্ন শক্ত হয়ে প্রচণ্ড ব্যথায় ভেঙে পড়ছে, তার মাথার চারদিকেও সবুজ কুয়াশা জমে আসছে গোলাপি গন্ধ জ’মে আসছে রুপোলি জল টলমল করছে; সে টয়লেটে যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়ায়, বসার একশোবর্গমাইল দশকোটি টাকার ঘরটিকে তার রেলস্টেশনের রাস্তার পাশের একটা নোংরা প্রস্রাবখানা মনে হয়, যার দেয়ালে লেখা আছে ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না’, কিন্তু যাকে দেখলেই রিকশাঅলা পকেটমার ভিখিরি পিয়ন হকারদের তীব্র প্রস্রাবে ধরে। পচা ইঁদুর পড়ে আছে। এখানে ওখানে, ছড়িয়ে আছে পাতলা পায়খানা, পাগলের বমি, ভজভজ ক’রে ময়লা ছুটছে, ছড়িয়ে আছে মাসিকভেজা ত্যানা, কুকুরের গু; এতো ঘিনঘিনে জায়গায় সে প্রস্রাব করে কী করে? তার একটি পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে টয়লেট দরকার।
হাসান বলে, আমার একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার, বড্ডো প্রস্রাবে ধরেছে, আমার একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার।
কোটিপতি কবি বলে, ওই দিকে যান, একটা বড়ো টয়লেট আছে।
হাসান তলপেট চেপে একলা হাঁটতে হাঁটতে একটি পাঁচকোটি টাকার ঘরে ঢোকে, মনে হয় এখানে প্রস্রাব করতে পারবে, কিন্তু ঘরটি দেখে তার শরীর ঘিনঘিন করতে থাকে, সে বলে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’; সে আরেকটি পাঁচকোটি টাকার ঘরে ঢোকে, সেটা দেখেও বলে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’; সে আরেকটি পাঁচকোটি টাকার ঘরে ঢোকে, এবং বলে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’। সে ঘর থেকে ঘরে ঘুরতে থাকে, কোটি কোটি টাকায় সাজানো প্রত্যেকটি ঘরকে তার নোংরা আবর্জনাস্তূপ ব’লে মনে হয়, এবং সে বলতে থাকে, ‘এতো নোংরায় আমি প্রস্রাব করতে পারি না’। ঘুরতে ঘুরতে সে আবার একশোবর্গমাইল বসার ঘরটিতে এসে উপস্থিত হয়, দেখে প্রস্রাবের ওপর গড়াচ্ছে রাকিব সুলতান।
হাসান বলে, রাকিব ওঠে, বাইরে চলো, প্রস্রাবের জন্যে একটি পরিচ্ছন্ন জায়গা দরকার।
রাকিব বলে, চলো, এই ভাগাড়ে দম বন্ধ হইয়া আসতেছে। হাসান রাকিবকে টেনে তুলে ওই আবর্জনাস্তূপ থেকে টলতে টলতে বেরিয়ে আসে; এবং বলতে থাকে, একটি পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার, একটা পরিচ্ছন্ন টয়লেট দরকার, খুব প্রস্রাবে ধরেছে।
কবি অথবা দণ্ডিত অপুরুষ – ১১
শ্যামলীকে ভালোবাসার প্রথম চারটি বছর হাসানের কেটে যায় এক নিশ্বাসে, সময়টাকে একটি দুপুরের মতো মনে হয়, যার সকাল নেই সন্ধ্যা নেই রাত্রি নেই, শুধুই দুপুর; সে কবিতার পর কবিতা লিখতে থাকে, মাঝেমাঝে দু-একটি গদ্য, তার কবিতার ভেতরে মেঘ বৃষ্টি নদী নগর গ্রাম সন্ধ্যা রাত্রি অগ্নি বিংশশতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ হয়ে ঢুকে থাকে। শ্যামলী, ছড়িয়ে থাকে। তার মুখ, তার চোখ, তার চুল, তার আঙুল, তার স্তন; অ্যাডেও সে সফল হ’তে থাকে, পদোন্নতি ঘটতে থাকে। সে পাচ্ছে, তার মনে হ’তে থাকে। সে পাচ্ছে, যদিও কিছুই সে পেতে চায় না, পাওয়ার কিছু নেই; কবি হয়ে উঠেছে সে, তাকে স্বীকার না ক’রে উপায় নেই, দুটি-একটি পুরস্কারও হাস্যকরভাবে পেয়ে যাচ্ছে, ভালো সিগারেট খেতে পাচ্ছে, স্কচ পান করতে পারছে, এবং শরীরটিও তার সুখে আছে, মনটিও সুখে আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শরীর, ওটি যদি খাদ্য পায় তাহলে সব কিছু সুস্থ থাকে, শহর গ্রাম মহাজগত ধানক্ষেত, এমনকি কবিতাও সুস্থ হয়ে ওঠে। শ্যামলী জুগিয়ে চলছে তার শরীরমনের খাদ্য, তার শরীর ও কবিতা বদলে যাচ্ছে ওই খাদ্যে, শ্যামলী ছাড়া তার শরীর। এতোদিনে কুষ্ঠরোগে ভ’রে যেতো।
হাসানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ বেরোনোর পর এক দীর্ঘ দুপুরে বিছানায় নগ্ন গড়াতে গড়াতে শ্যামলী বলেছিলো, তোমার কবিতার চরিত্র খুবই বদলে গেছে, তোমার কবিতা একটা বড়ো বাঁক নিয়েছে।
হাসান বলেছিলো, সব কিছুই বদলে যায়, জীবন বাঁক নেয়, কবিতাও বাঁক নেয়, কিছুই স্থির হয়ে থাকে না তুমি তো জানোই।
শ্যামলী জিজ্ঞেস করেছিলো, আমরাও কি বাঁক নিচ্ছি? আমাদের সম্পর্কও কি বদলে যাচ্ছে?
হাসান বলেছিলো, হ্যাঁ, বদলে যাচ্ছি। আমরাও।
শ্যামলী বলেছিলো, আগে তোমার কবিতা ভরা ছিলো প্ৰবল কামে, মনে হতো সব কিছুর সাথে তুমি সঙ্গম করছে, এখন সেই কাম নেই, প্ৰেম আছে।
হাসান বলেছিলো, প্রত্যেকের জীবনে একটা সুন্দর অসহ্য যন্ত্ৰনা প্রবল ঝকঝকে সোনার মতো অগ্নিশিখা বর্শাফলক বোশেখের রোদ জ্যৈষ্ঠের জোয়ারের মতো মোহন কাম দেখা দেয়, সে কবি হ’লে ওই কাম কবিতা হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব, জীবনানন্দে তা ঘটেছে, ঘটেছে আমার কবিতায়ও।
শ্যামলী তার একটি প্রচণ্ড প্রত্যঙ্গ ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো, এখন কাম নেই?
হাসান হেসে বলেছিলো, এটা কতো বড়ো মূর্খ চাষা তা তো তুমি জানােই।
শ্যামলী বলেছিলো, এই চাষাটা আমার জীবন, এই চাষাটার সাথে দেখা হওয়া আমার জীবনের শ্ৰেষ্ঠ ঘটনা।
হাসান বলেছিলো, চাষ কেমন লাগে?
শ্যামলী বলেছিলো, এই চাষ ছাড়া আমি বুঝতাম না আমি মাটি।
