ডাক্তার এল। হাত পায়ের ক্ষতে ওষুধ ব্যাজে লাগানো হল। প্রেসক্রিপশন নিয়ে ওষুধ কিনে আনল দারোয়ান। আপার বাড়িতে টেলিফোনে জানানো হল, আপা একটু কাজে আটকে আছে। ফিরতে দেরি হবে।
আপাকে পৌছোতে সঙ্গে গেল অনীশ, গুরমিক আর পিটার।
অনীশ বলল, কেমন লাগছে এখন আপা?
আপা হাসল, একটু ক্লান্ত। কিন্তু বেশ ভাল লাগছে।
গুরমিক বলল, একটাকে খুব পিটিয়েছি।
আপা বলল, মারাটাই তো ভুল। মারতে নেই।
তুমি একটি ইমপসিবল মেয়ে আনা। আরে বাবা, মানুষ বরাবর লড়াই করে বেঁচে আছে। উল্টে মার না দিয়ে কি বাঁচতে বলো।
আপা ক্লান্ত গলায় বলে, শুরমিক, তুমি গায়ের জোরে বিশ্বাস করো, আমি করি না। যারা আমাকে মেরেছে তাদেরও আমি ঘেন্না করতে পারি না।
শুরমিক ধমকে উঠল, হেট দেম আপা, হেট দেম। গেন্না না করলে এই দুনিয়াতে কি বেঁচে থাকা যায়? হ্যাঙ ইওর ফিলজফি আপা আন্টি। আজ যারা তোমাকে মেরেছে কাল তারা তোমাকে খুন করবে, যদি না তুমি উন্টে মারো।
ওরা ভীতু বলেই মেরেছে। ওদের অস্তিত্বে, রুজিরোজগারে যে আমি বিপদ ডেকে আনছিলাম।
ওসব ছাড়ো আপা। সেটা আমাদের হাতে ছেড়ে দাও। ক্লাসমেটদের নাম বলে দাও আমাদের। আমরা দেখে নিচ্ছি।
জানি। তোমরা আমার ভালই চাও। আর আমি ওদেরও ভাল চাই। কয়েকদিন অপেক্ষা করো।
ইউ আর রিয়েলি ইম্পসিবল।
অনীশ মৃদু স্বরে বলল, আমি জীবনে কখনও মারপিট করিনি আপা। আজ প্রথম একজনকে হকি স্টিক দিয়ে মারলাম। খুব জোরে মেরেছি। লোকটার হাত ভেঙে যাওয়ার কথা।
আপা কবুণ গলায় বলে, আহা রে! কেন যে ওরকম করলে!
অনীশ বলল, কিন্তু তুমি জানলে অবাক হবে, জীবনে প্রথম একটা বদমাশ লোককে মারতে পেরে আমার অদ্ভুত লাগছে। আই অ্যাম এনজয়িং ইট।
আপা সবু গলায় বলে, ওটাও একটা ড্রাগ অনীশ। কোনটা?
মার দেওয়াটা। ওটাও নেশা। যারা একবার মারে এবং সেটা উপভোগ করে তারা আবার মারবে। হয়তো অকারণে মারবে। মারতে আনন্দ পাবে। পৃথিবী তো সেই কারণেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তোমাকে আমি বুঝতে পারি না আপা।হয় তুমি কোনও গডেস ইন ডিজগাইস অথবা একটু লুনাটিক।
আমি তোমাদের চোখে সুনাটিক হতেই পারি। কিন্তু আমার চোখ দিয়ে যদি তোমাকে পৃথিবীটা দেখাতে পারতাম!
পৃথিবীটাকে তুমি কিরকম দেখ আপা? ইজ নট ইট এ হেল।
নোংরা, খারাপ, নিষ্ঠুর। তবু কী যে সুন্দর।
আপা, আজ রাতে ভাল করে ঘুমাও। আজ মাথা কাজ করছে না।
আমার মাথা তেমন কাজ কখনও করে না। কাজ করে আমার মন। আমার হৃদয়।
আপাকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে চার বন্ধু হেঁটে হেঁটে খানিক দূর এক সঙ্গে এল। কেউ কোনও কথা বলছিল না। তারা বীরের মতোই একটা কাজ করেছে। তবু নিজেদের বীরত্বটাকে অনুভব করছিল না। তারা আপা সম্পর্কে কোনও মন্তব্যও করতে পারছিল না। তারা খানিকটা বিহল।
তারা ভাবছিল। শুধু ভাবছিল।
০৩১. জলকাদায় বৃষ্টিতে গাঁ-গঞ্জের কাঁচা-পাকা রাস্তায়
সেদিন জলকাদায় বৃষ্টিতে গাঁ-গঞ্জের কাঁচা-পাকা রাস্তায় এবং ক্ষেতে খামারে অনেক ঘুরতে হল কৃষ্ণজীবনকে। কারণটা হল নিরুদ্দেশ রামজীবন।
সে বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই কান্নার আওয়াজ পেয়েছিল। বাবা আর মা তাকে দেখে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ল বটে, কিন্তু মুখে তেমন হাসিখুশি ভাবটা ছিল না। এটা হওয়ার কথা নয়। পথে আসতে আসতে সে পটলের কাছেই শুনে নিয়েছিল ঘটনাটা।
রাঙাকে ডেকে বলল, কেন্দো না বউমা। রেমো কি মাঝে মাঝে এরকম চলে-টলে যায় নাকি?
রাঙা মাথা নিচু করে বলে, গেলে আমাকে অন্তত বলে যায়। কাল কিছু বলেনি। বটতলায় ওর কিছু খারাপ বন্ধু আছে। মাঝে মাঝে এসে খুঁজে যায়। তাদেরই ভয়। মেরো-টেরে ফেলবে কিনা কে জানে?
যে লোকটা খুন হয়েছে সে রেমো নয়, নিশ্চিন্তে থাকো। ভেবো না, আমি খুঁজতে বেরোচ্ছি।
আপনি এতটা পথ এলেন, এখনই বেরোবেন কি? আগে একটু চা করে দিই।
আমি চা বিশেষ খাই না। তবে বৃষ্টির দিন, দাও একটু।
রাঙা দৌড়ে গেল। মুড়ি মেখে চা করে নিয়ে এল। বলল, দুপুরে কী খাবেন বলুন! একটু পোস্ত করি?
কৃষ্ণজীবন হাসল, খাওয়ার সময় হবে কিনা কে জানে! রেমো কোথায় কোথায় যেতে পারে একটা ধারণা দাও তো!
আমাদের কিছু বলে না তো। বটতলার বন্ধুরা জানে হয়তো। কিন্তু তারা যা লোক, কে জিজ্ঞেস করতে যাবে তাদের?
বন্ধুদের নাম জানো?
না, শুধু একজনের নাম শুনেছি, পঞ্চা।
পটল জ্যাঠার কাছ ঘেষেই আছে। সঙ্গে গোপাল। পটলের চোখে বিস্ময়ের ঘোর। এই তার জ্যাঠা! তার মস্ত জ্যাঠা! সে পঞ্চা নামটা শুনেই বলল, ওদের আমি চিনি জ্যাঠা। গণেশ, পঞ্চা, চিত্ত, রতন।
বামাচরণ বা শ্যামলী এতক্ষণ ঘর থেকে বেরোয়নি। তারা যে এ বাড়িতে আছে তাই মনে হচ্ছিল না কৃষ্ণজীবনের। হঠাৎ দরজা খুলে বামাচরণ বেরিয়ে এল। পরনে বাইরের পোশাক প্যান্ট আর জামা। মুখে একটু বিগলিত হাসি। জন্মে যা কখনও করেনি। আজ হঠাৎ তাই করল বামাচরণ। দাওয়ায় উঠে ঢিপ করে একটা প্ৰণাম ঠুকে বসল কৃষ্ণজীবনকে।
কৃষ্ণজীবন একটু হাসল, কেমন আছিস রে বামা?
ওই আছি আর কি! তুই ভাল তো দাদা? বাড়ির খবর-টবর সব ভাল?
কৃষ্ণজীবন একটা অস্ফুট হ্যাঁ বলে তার চেয়ে তিন বছরের ছোটো ভাইকে দেখছিল। বামার গালে খোঁচা খোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি। গায়ের লোক অবশ্য নিয়মিত দাড়ি কামায় না। কিন্তু বামাচরণের মুখে বেশ বয়সের ছাপও পড়েছে, মাথার চুল বিরল হয়ে টাক প্রায় বেরিয়ে পড়েছে। চুল যা আছে তার বেশির ভাগই পাকা। জামা প্যান্ট যেমন ময়লা তেমনি ভাজহীন, চেহারা-ছবিতে ভদ্রলোকের ছাপটাই নেই। কৃষ্ণজীবনের ভারি কষ্ট হল দেখে। কেন যে শ্ৰীহীন হয়ে বুড়িয়ে যাচ্ছে এরা। বাইরের লোক তাকে আর বামাচরণকে পাশাপাশি দেখলে বিশ্বাসই করবে না যে, বামাচরণ কৃষ্ণজীবনের চেয়ে বয়সে ছোট। কিংবা সম্পর্কে ভাই।
