সংসারে যে চাপা আড়াআড়ি তা বুঝতে কষ্ট হল না কৃষ্ণজীবনের। আড়াআড়ি না থাকলে এতক্ষণে বামাচরণের উচিত ছিল রামজীবনের খোজে বেরিয়ে পড়া। আড়াআড়িই শুধু নয়, হয়তো ভাগাভাগিও। এ সংসারের সঙ্গে বন্ধন কি ছিন্ন হয়েছে কৃষ্ণজীবনের? সে যে কোনও খোঁজই রাখে না!
বামাচরণের বউ শ্যামলীও এসে প্ৰণাম করে ঘোমটা টেনে দাঁড়াল। একে সে মুখ চেনে, এক-আধবার দেখেছে।
কেমন আছো বউমা?
কৃষ্ণজীবন একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল। না, এরা ভাল নেই। একদম ভাল নেই।
প্লাস্টিকের প্যাকেটটা তুলে নিল কৃষ্ণজীবন। সে শাড়ি ভাল চেনে না। দোকানে গিয়ে বাঁশবনে ডোমকোনা অবস্থা হয়েছিল তার। মস্ত দোকান, সেলসম্যান শাড়ির পর শাড়ি খুলে দেখাতে দেখাতে পাহাড় করে ফেলেছিল প্ৰায়। সে অবশেষে সেলসম্যানেরই সাহায্য চাইল অসহায়ভাবে। বহুকাল সে মাকে, বাবাকে, বোনদের, ভাইয়ের বউদের কিছুই দেয়নি। কাজেই মায়ের জন্য গরদ, বাবার জন্য খুব ভাল ধুতি আর বাফতার পাঞ্জাবির কাপড়, বোন আর ভাইয়ের বউদের জন্য পিওর সিল্ক কিনে এনেছে। ভাইপোদের কথা খেয়াল ছিল না। ওদের জন্য টাকা দিলেই হবে।
শাড়ি ধুতি গরদে মলিন বাড়িটা যেন ঝলমল করে উঠল। এমনকি দুশ্চিন্তায় সিঁটিয়ে থাকা রাঙার মুখে অবধি চওড়া হাসি দেখতে পেল কৃষ্ণজীবন। নির্বিকার বিষ্ণুপদ অবধি ধূতিটা পরখ করে দেখল। খুব। বাড়িতে একটা হিল্লোল বয়ে গেল।
শাড়ি বুকে নিয়ে চিপ টিপ প্ৰণাম করল দুই বউ।
সরো আর বীণার শাড়িদুটো কী হবে মা? কৃষ্ণজীবন জিজ্ঞেস করে।
হয় তারা বলে, রেখে যা। রোমো দিয়ে আসবেখন। বনগাঁয়ে অনেক লোক যায়। আর সরোর বর তো আসে-টাসে। ভাবিস না।
বামাচরণ খুশির গলায় বলল, ও আমিই পৌঁছে দিতে পারব।
কৃষ্ণজীবন মুড়ি আর চা খেয়ে উঠল। বলল, এখনও বেলা বিশেষ হয়নি। রেমোকে যদি কাছেপিঠে পেয়ে যাই তো নিয়ে আসছি। দেরি হলে তোমরা খেয়ে নিও।
রাঙা বলে উঠল, আপনি পটলকে সঙ্গে নিয়ে যান দাদা। ও চেনে সব।
পটল এক পায়ে খাড়া। জ্যাঠার সঙ্গ তার কাছে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। জ্যাঠার সঙ্গে কথা কইলেই নাকি কত কী শেখা যায়।
বটতলা অবধি অবশ্য তেমন কথা হল না। জ্যাঠা হাঁটে যেন স্টিম ইঞ্জিনের মতো জোরে। তাল রাখতে পটলকে ছুটিতে হচ্ছিল।
জ্যাঠা, তুমি কি ওইসব লোকের সঙ্গে কথা কইবে?
না বলে উপায় কি?
ওদের সবাই ভয় খায় কিন্তু।
কেন, কী করে ওরা?
খুন জখম করে, জুয়া খেলে, মদ খায়।
বাবাকে বারণ করতে পারিস না?
ও বাবা! যা মারবে তা হলো!
খুব মারে নাকি?
বাম বম করে পেটায়! কিন্তু গোপাল তো দোষ করে না। গোপালকে কেন পেটায় বলো তো।
সত্যিই তো! ওতো বোবা মানুষ।
এমনিতে মারে না। কিন্তু মদ খেলে যেন খুন চাপে।
তুই এত রোগা হয়েছিস কেন?
আমি তো রোগাই।
বড্ড রোগা। স্বাস্থ্য ভাল করে ফেলতে পারিস না?
কিছুতেই হয় না। আমার আমনি চিমসে চেহারা, মা বলে।
বটতলা এখন বেশ জমজমাট জায়গা। দোকান-পাট, বাসের আড্ডা। এমন ছিল না। শীতলা মন্দিরটা ছিল। একটা বটগাছের তলায় হাট বসত সপ্তাহে দুদিন। কত ফাঁকা ছিল। জঙ্গল ছিল।
আর কাউকে নয়, পঞ্চাকেই পাওয়া গেল চায়ের দোকানে। কালো বেঁটেমতো, দাড়িওলা একটা ছেলে। রাস্তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে একটা বেঞ্চে ঝুঁকে বসে আছে।
পটল চাপা গলায় বলে উঠল, জ্যাঠা, ওই পঞ্চা!
কৃষ্ণজীবন বলল, আয় তা হলে, ওকেই জিজ্ঞেস করি।
আশ্চর্যের বিষয় এই, কৃষ্ণজীবন কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই পঞ্চা টপ করে উঠে দাঁড়াল। মুখে বিগলিত হাসি, দাদা, কবে এলেন?
আজই সকালে।
অনেকদিন আসেননি বিষ্টুপুরে!
না।
ভাল আছেন তো?
পটল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পঞ্চা হল এ অঞ্চলের ভয়ের লোক। কাউকে আমল দেয় না। জ্যাঠার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছে যেন গুরুদেব।
কৃষ্ণজীবন অবাক হল না। সে একে না চিনলেও এ গায়ের সবাই তাকে চিনবে এটাই স্বাভাবিক। সে ছিল এ গায়ের মুখ উজ্জ্বল-করা ছেলে। আজও তার কথা বলাবলি হয়। বিদ্যা সকলের থাকে না, কিন্তু বিদ্বানকে খাতির করে না এমন পাষণ্ডের সংখ্যা-ঈশ্বরের দয়ায়-এখনও কম।
একটা দুটো কথা বলে কৃষ্ণজীবন জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, রেমোটার খবর কিছু জানো? সে কাল থেকে বাড়ি ফেরেনি।
রামজীবন! কেন, সে তো কাল পিপুলপাতি গেছে।
পিপুলপাতি? এ দিকে বাড়িতে সবাই ভাবছে।
কী কাণ্ড দেখুন তো। খবর দিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। কার কাছ থেকে যেন টাকা আনতে যাওয়ার কথা বলছিল।
নাম বলেনি?
না। তবে পিপুলপাতি মাঝে মাঝে যায়।
এখন তো বাস পাবো না, না?
সকালের দিকে দুটো দক্ষিণে গিয়েছিল। তার মধ্যে একটা ফিরল একটু আগে। স্টেশনে যাবে, তারপর আবার ফিরবে। বর্ষার জন্য আরও তিনটে বাস বসে গেছে বলে এই অবস্থা।
বাসটা কখন ফিরবে?
ধরুন তা ঘণ্টাখানেক তো বটেই। বেশীও হতে পারে।
কৃষ্ণজীবন ঘড়ি দেখে নিল। সাড়ে দশটা বাজছে। হেঁটে গেলে সে চল্লিশ মিনিটে পিপুলপাতি পৌঁছে যাবে। অবশ্য গায়ের লোকের দূরত্বের মাপ সম্পর্কে তার বিশ্বাস নেই। এ দেশের গায়ের লোকের দুটি জিনিসের খুব অভাব। সময় আর দূরত্বের আন্দাজ।
পঞ্চা জিজ্ঞেস করল, যাবেন নাকি?
যাবো। ওর বউ খুব ভাবছে। এসে যাবে ঠিক।
তবু একটু ঘুরেই আসি।
তা হলে এই মাঠ সোজাসুজি যান। রাস্তা আছে। পথ অনেক হবে। পাকা রাস্তায় গেলে সময় লেগে যাবে।
কৃষ্ণজীবনের আপত্তি হল না। সে পটলকে জিজ্ঞেস করল, যাবি?
