এখন আর তা মনে হচ্ছে না?
না। তুমি মেয়ে-গান্ধীজী হতে চাইছো। আজকাল ওরকম ভালমানুষীর কোনও দাম নেই।
ভালমানুষী কে বললে? এ হল স্ট্যাটেজি। তুমি কি ভাবছো চুপ করে মার খেয়ে যাবো? মোটেই তা নয়।
তা হলে কী করবে?
চিনে রাখবো। চাঁইদের ধরতে না পারলে ড্রাগ অ্যাডিক্টদের কাছে বক্তৃতা দিয়ে কোনও লাভ নেই। এত তো পাবলিসিটি হচ্ছে, তবু অ্যাডিকশন বাড়ছে তো?
তোমার ওপর মাঝে মাঝে আমার ভীষণ রাগ হয়। ইউ লাভ টু লিভ ডেনজারাসলি।
না বাবা না। আমি ঠাণ্ডা মেয়ে। আমি শান্তিতে বেঁচে থাকতে চাই।
তোমার কাণ্ড দেখে তা মনে হয় না।
আমার কাজটা করবে কি না বলো।
কী করতে হবে আবার বলে দাও।
একটু দূরে থেকে আমাকে ফলো করবে। বোকার মতো আমাকে বাঁচাতে যেও না। যদি কিছু হয়তো দূর থেকেই চিনে রাখবে। কথা দাও কিছু করবে না।
ঠিক আছে।
শোনে, কিছু ঘটতে পারে, নাও পারে। আগে থেকে খুব বে প্রত্যাশা রেখো না। অ্যান্টি ক্লাইমেক্সও হয়ে যেতে পারে।
অনীশ খুবই বিষাদ বোধ করল। কিন্তু আপা তার বন্ধু হলেও তার ওপর অনীশের প্রচণ্ড বিশ্বাস। তার আজকাল কেবলই মনে হয়, আপা কোনও ভুল করতে পারে না।
সে গিয়ে সুমিত, পিটার আর গুরমিককে ঘটনাটা বলল।
সুমিত বলল, গেম রুম থেকে কয়েকটা হকি স্টিক বের করে নিলেই তো হয়। গুরমিক বলল, ঠিক কথা।
পিটার বক্সিং করে। সে বলল, নো প্রবলেম। আপার গায়ে হাত তুললে হাত ভেঙে দেবো, সে যতো বড় মস্তান হোক।
ছুটির পর আপা একটু অপেক্ষা করল। ছেলেমেয়েদের দঙ্গলটা কেটে যাক। গুণ্ডারা যদি তাকে মারে তাহলে এরা বিপদে পড়বে।
একটু পরে সে একা বেরোলো। রাস্তা ফাঁকা। নির্জনই বলা যায়। সে একবারও পিছন ফিরে তাকাল না। ভয় পেল না। স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যেতে লাগল বড় রাস্তার দিকে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটার পর একটা প্রাইভেট গাড়ি গা ঘেঁষে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের স্কুল বাসও চলে গেল হুস করে।
সামনে ঝাউতলার নিচে তিনটে লোক দাঁড়িয়ে। কালো, বিচ্ছিরি চেহারা।
তাদের দিকে তাকালই না আপা। সোজা হেঁটে যেতে লাগল।
আচমকাই হোঁচটটা লাগল। আপা মা গো বলে সম্পূর্ণ বেসামাল হয়ে উপুড় হয়ে পড়ল ফুটপাথের শানে। হাঁটুতে খটাং করে একটা শব্দ হল। কনুইটাতে এত লাগল যে মাথা ঝিমঝিম করে উঠল তার। হাতের বই-খাতা ছিটকে গেছে রাস্তায়। বৃষ্টিভেজা পথে জলকাদায় মাখামাখি হল তার বই-খাতা, সে নিজে।
বিহলতা কাটিয়ে ওঠার আগেই একটা লাথি এসে তার রোগা কোমর প্রায় ভেঙে দিল।
একটা বিচ্ছিরি অসংস্কৃত গলা চাপা গলায় বলল, এই শালী কুত্তি, কার নাম বলবি তুই? আঁ! কার নাম বলবি?
বলতে বলতেই একজন কে যে তার চুল ধরে টেনে তুলল।
চটাস করে একটা চড় পড়ল তার গালে, বল শালী খানকী, কার নাম জানিস তুই?
আপার দু চোখ বেয়ে জল পড়ছে টপ টপ করে। ঠোটের কষ বেয়ে লালা। জীবনে সে কারও কাছে কখনও মার খায়নি। কিন্তু নৃশংস পশু-মানুষদের ওপরেও তার রাগ নেই। তার মনে হয় এরা বড় বোকা, বড় দুর্বল, বড় অসহায়।
কথার জবাব দেওয়ার সাধ্য নেই তার। মার খেয়ে তার মাথা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। এখনই সে নিৰ্বাপিত হবে। মারাও যেতে পারে।
ঠিক এই সময়ে তিন জোড়া পা দৌড়ে আসছিল। ওদের বারণ করেছিল আপা। তবে আসছে কেন? সে চায়নি ওরাও তার সঙ্গে মার খাক।
প্রথমে পৌঁছলো শুরমিক, তার পায়ে পায়ে পিটার, একটু পিছনে অনীশ। দুজনের হাতে হকি স্টিক।
অনীশের রাগ সবচেয়ে বেশী। তার হকি স্টিক এত জোরে একটা লোকের হাতে লাগল যে লোকটা বাপরে বলে হাতটা চেপে ধরেই দৌড়ে পালাল।
দ্বিতীয় লোকটাকে গুরমিক মারল পায়ে। তারপর লোকটা পড়ে যেতেই সে দুমদাম মারতে লাগল দক্ষ হাতে।
তিন নম্বর লোকটাকে নেওয়ার কথা ছিল পিটারের। কিন্তু বেগতিক দেখে লোকটা দৌড় মেরে উল্টো দিকের একটা গলিতে ঢুকে গেল।
গুরমিকের মার খেয়েও ভূপাতিত লোকটা একটা ব্যাঙের মতো লাফ মেরে সরে গিয়ে পালাতে লাগল।
পথচারী লোকজন সব ছুটে আসছে চারপাশ থেকে। স্কুলের দারোয়ান, মিসরাও আসবে।
অনীশ আপাকে তুলল।
খুব লেগেছে তোমার আপা?
আপার মুখ দিয়ে টস টস করে রক্ত পড়ছে। চোখ ভরা জল। তবু সে বলল, বোকা।
কে বোকা?
তোমরা। বারণ করেছিলাম না?
করেছিলে। সেটা তুমিই বোকা বলে। খুব লেগেছে? রক্ত পড়ছে যে!
কিছু নয়; ঠিক আছি।
হাসপাতালে নেওয়ার দরকার।
না বাবা। মুখে জল দেবো। স্কুলে নিয়ে চলো।
চলো।
কাউকে ধরতে দিল না আপা। নিজে হেঁটে গেল স্কুল অবধি।
স্কুলের মিসরা বেরিয়ে এসেছিলেন ফটকে। ঘটনায় তারা হতবাক্।
আপাকেই একমাত্র নির্বিকার মনে হচ্ছিল। সে গিয়ে চোখে মুখে জল দিল। একটু বিশ্রাম নিল বসে।
তারপর প্রিনসিপাল এলেন, আপা, তুমি কিছু জানো?
কিছু নয় ম্যাডাম।
অনীশ বলেছে তুমি জানো কে এই ঘটনার পিছনে আছে। তাদের নামগুলো আমাদের দরকার।
ম্যাডাম, আমাকে আর দু-একটা দিন সময় দিন।
কী করবে তুমি?
আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলব।
কে বন্ধু?
যারা এই ঘটনার পিছনে আছে।
তারা কি তোমার বন্ধু! এটা কি বন্ধুর মতো কাজ?
মানুষ মাত্রই ভুল করে। তারা আমাকে শত্ৰু ভাবছে।
তুমি আর বিপদের মধ্যে থেকো না আপা। নাম বলে দাও। এটা আমার আদেশ।
নাম বলে দিলেই আমার এত প্ল্যান সব নষ্ট হয়ে যাবে। নাম তো আমি অনেক আগেই বলে দিতে পারতাম।
প্রিনসিপাল অসন্তুষ্ট হলেন। মুখটা গম্ভীর করে বললেন, এ স্কুলে এসব কী হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। তুমি গোঁ ধরে না থাকলেই ভাল করতে। যাকগে, আমি জোর করব না। ডাক্তার আসছে। ততক্ষণ অপেক্ষা করো। আমার গাড়ি তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে।
