আপা উঠে দাঁড়াল। এবং স্পষ্ট ভাষায় বলল, আমি কাউকে আঙুল তুলে দেখাব না। কিন্তু যারা চুরি করছে তাদের জানাতে চাই যে, আমি তাদের চিনি। আরও জানাতে চাই যে, আমি জানি তারা ড্রাগ অ্যাডিক্ট। আমি প্রিনসিপালকে কথা দিয়েছি আর একটাও চুরির ঘটনা ঘটলে আমি তাদের নাম প্রকাশ করে দেবো।
এর পর আপার ওপর অনেকেই অসন্তুষ্ট হল। শ্যামশ্রী বলল, তুই যদি জানিস তবে চোরকে ধরছিস না কেন আপা? বইটা না পেলে যে আমি ভীষণ মুশকিলে পড়ব! এটা তো অন্যায়।
আপা শ্যামশ্রীর কথার জবাবে খুব দ্ৰ গলায় বলল, দেখ শ্যামশ্রী, বইটা তুই এনেছিলি বন্ধুদের নড ছবি দেখাবি বলে। বইটা আনার পর তোরা পিছনের বেঞ্চে বসে খুব হাসাহাসি করছিলি। কাজটা তোর ভাল হয়নি।
শ্যামশ্রী বলল, ন্যুড তো কী? ও তো ফাইন আর্ট, সব মাস্টারপীস।
ঠিক কথা। মাস্টারপীস দেখার চোখ কি হোর হয়েছে? চোরকে ধরে দিলেও বইটা তো পাবি না। চোর বই বেচে দিয়েছে।
সুজিতাও এসে ধরল আপাকে, চোরের নাম জানলে তোর বলে দেওয়া উচিত আপা। আমার বাবা তো পুলিশে ডায়েরি করেছে। আমি ততটা চাই না। বালা ফেরত পেলে পুলিশ কেস তুলে নেবে।
আপা গম্ভীরভাবে বলল, শোন, চোর আমাদের ক্লাসমেট। এত উঁচু ক্লাস অবধি আমরা সবাই একসঙ্গে এতদিন পড়ে এসেছি। অনেকটা আত্মীয়ের মতো। আমার পরিবারের কেউ এরকম করলে আমরা তো তাকে পুলিশে দিই না। আমি চোরদের আর একটা চান্স দিতে চাই।
আমার বালার কী হবে?
ওটা ডোনেশন বলে ভেবে নে।
তাহলে তুই বড় বড় কথা বললি কেন বক্তৃতায়?
বললাম আবার যাতে চুরি না হয় তার জন্য।
দুর! বলে রাগ করে চলে গেল সুজিতা।
পরদিন স্কুল ছুটির আগে আপা অনীশের কাছে এসে বলল, শোনো, তোমার সঙ্গে আমার একটা জরুরী কথা আছে।
বলো।
তুমি একটা সাহসের কাজ করতে পারবে?
কেন পারব না? কাজটা কিসের?
তুমি একা পারবে না। সুমিত, পিটার আর গুরমিককে সঙ্গে নাও।
নিচ্ছি। ওরা একস্ট্রা ক্লাস করছে। কিন্তু কাজটা কী বলবে তো?
আমি পনেরো মিনিট পরে বেরোবো। হেঁটে যাবো বড় রাস্তা অবধি।
সে তো রোজই যাও।
আজ তোমরা আমাকে ফলো করবে।
ফলো? কেন?
একটু দূরে থেকে ফলো করতে হবে। যেন আমার সঙ্গে কেউ আছে তা বোঝা না যায়।
অনীশ ধৈর্য হারিয়ে বলে ওঠে, বাট হোয়াই আপা? হোয়াই?
আজ হয়তো একটা ঘটনা ঘটবে। কিন্তু তোমরা চট করে এগোবে না! দূরে থাকবে। শুধু লোকগুলোকে চিনে রাখবে, যাতে পরে দেখলেও চিনতে পারো।
অনীশ রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে বলে, তুমি গ্ৰীক ভাষায় কথা বললে আমি কি করে বুঝবো?
আপা শান্ত চোখে অনীশের দিকে চেয়ে বলে, কাল যখন স্টুডেন্টস মিটিঙে বক্তৃতা দিয়েছিলাম তখনও কি বুঝতে পারোনি যে, আমি মৌচাকে ঢিল মেরেছি?
না তো!
এই জন্যই তো তোমাকে গুড বয় বলি।
একটু খুলে বলবে?
আমার সন্দেহ হচ্ছে, আমাদের ক্লাসে এবং অন্য সব ক্লাসেও কয়েকজন করে ড্রাগ অ্যাডিক্ট আছে। আমাদের ক্লাসে দুজনকে আমার খুব সন্দেহ হয়। আরও দু একজন থাকতে পারে।
আমার বিশ্বাস হয় না আপা।
তা জানি। কিন্তু আমি যে পচা ইঁদুরের গন্ধ পাই।
বুঝলাম।
কাল আমি যেই বললাম যে, চোরদের আমি চিনি, সঙ্গে সঙ্গে আমি চোরদের একটা চ্যালেঞ্জও তো জানিয়ে রাখলাম। তাই না?
অনীশ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখে বলে, তাই তো! এটা আমার মাথায় আসেনি। এ কাজ কেন করলে আপা?
ইচ্ছে করেই করেছি। আমি ওদের চমকে দিয়েছি, ভয় পাইয়ে দিয়েছি।
অনীশ মাথা নেড়ে বলে, দ্যাটস রাইট।
ওরা যদি সাধারণ চোর হয় তাহলে কিছু করবে না। চুপচাপ থাকবে। বড় জোর আমার কাছে এসে অন্যায় স্বীকার করবে। কিন্তু ড্রাগ অ্যাডিক্ট হলে তা করবে না।
কী করবে আপা?
ওরা যাদের কাছ থেকে ড্রাগ কেনে তারা বাজে লোক। ব্যবসা মার খেলে তাদের চলবে না। তারা এদের অনেক সময়ে প্রোটেকশন দেয়।
তুমি এত জানলে কী করে?
আমি পায়ে হেঁটে কলকাতা শহর ঘুড়ে বেড়াই, জানো তো!
তা আর জানি না!
অভিজ্ঞতায় আমি সত্যিই বুড়ি।
তারপর বলো। এ তো সাসপেন্স থ্রিলারের মতো ব্যাপার।
থ্রিলারই তো। আমার মনে হচ্ছে ওরা ড্রাগ পেডলারদের খবর দিয়েছে, তারা আজ হোক, কাল হোক আমাকে অ্যাটাক করবেই।
কি করে বুঝলে?
আমার অ্যান্টেনা আছে। ক্লাসে আজ আমার দিকে দুজন ছেলে খুনীর চোখে তাকাচ্ছিল। তাদের একজনকে আমি বলতে শুনেছি, শী উইল বি টট এ লেসন টু ডে।
তাদের নাম আমাকে বলছ না কেন?
সেটা পরে হবে। আমি আগে পেডলারদের চিনতে চাই।
অনীশ প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে বলে, এত রিস্ক নিচ্ছ কেন?
খারাপকে আটকাতে গেলে রিস্ক থাকেই।
আমরা তোমাকে গার্ড দিয়ে নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেবো।
দূর বোকা। তাতে আসল কাজটাই হবে না।
আপা, তোমাকে আমি রিস্ক নিতে কিছুতেই দেবো না।
তাহলে আমি আর একদিন তোমাদের না জানিয়ে বেরোবো। ওরা তো তক্কে তক্কে থাকবেই।
ওরা তোমাকে কী করবে? মারবে?
আপা হাসল, আমি রোগা মেয়ে, কুংফু কারাটে জানি না। ওরা তো ধরেই নিতে পারে যে একটু চোখ রাঙালে বা দুটো থাপ্পড় মারলেই আমি ভ্যা করে কেঁদে ফেলব। আর তার পর থেকে লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে যাবে। তাই না?
অনীশ মৃদু হেসে বলে, সে তোমাকে যারা চেনে না তারা তা ভাবতে পারে। কিন্তু ভাবলে ভুল করবে।
আমি চাইছি ওরা ভুলটা করুক।
তার মানে তুমি মার খাবে।
খাবো। কয়েকজন বন্ধুর ভালর জন্য মার খেতে আপত্তি নেই।
বাঃ, বেশ কথা আপা। চমৎকার প্রস্তাব। এতদিন তোমাকে বুদ্ধিমতী বলে জানতাম।
