জ্যোতিষী একটু হেসে বলে, দেখুন না কি হয়!
নিমাই ভাল, বিনা পয়সায় যথেষ্ট হয়েছে। হাতটা সরিয়ে নিল সে।
বীণা উঠল। পানুবাবুকে বলল, আসি তাহলে।
এসো গিয়ে। কাকার দলে আছো এখনও?
আছি।
চলছে কেমন?
খারাপ নয়। তবে মফস্বলের দল তো।
তাতে কি? মফস্বল কি আর ভাল হয় না?
দুজনে ফের বেড়িয়ে পড়ল। রাস্তায় এসে বীণা বলল, হ্যাঁ গো, তুমি হঠাৎ হাত দেখালে কেন?
নিমাই লজ্জা পেয়ে এক গল হেসে বলে, সবাই দেখায়। শখ হল।
খুব বিদঘুটে লোক আছো তুমি! বলে হাসল।
তুমি কিছু মনে কররানি তো!
করেছি। পয়সার কথা বলছিলে কেন? পয়সা লাগলে কি দিতে পারি না আমরা?
ও বাবা! খামোখা হাত দেখিয়ে নষ্ট করার মতো পয়সা কি আমাদের আছে?
আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলবে আজ?
বলব না কেন? কী জানতে চাও?
আমি দেখতে কেমন?
নিমাই অবাক হয়ে হেসে ফেলল, কেন, হঠাৎ আবার সন্দেহ হচ্ছে নাকি? বনগাঁয়ে তো তোমার রূপের সুখ্যাতি সবাই করে।
ছাই করে। তুমি হচ্ছে এক নম্বরের মিথ্যুক। যদি আমি সুন্দরীই হবো তাহলে লোকে পাত্তা দিচ্ছে না কেন?
পাত্তা দিচ্ছে না কে বলল? এদের অবস্থা টাইট। সব গরিব দল। তোমার উচিত বড় বড় দলের কাছে যাওয়া।
তারা আরও পাত্তা দেবে না। আমি দেখতে একটুও সুন্দর নই।
নিমাই যেন নতুন করে বউকে একটু দেখল ভাল করে। তারপর বলল, তাহলে তাদের চোখ নেই।
আচ্ছা, তুমি তো ভগবানের লোক। তুমি যখন বলছ তখন চলে একটা বড় দলের গদিতে যাই।
আজই?
আজই! আমাদের কি আর রোজ রোজ কলকাতায় আসা হয়? চলো।
নিমাই একটা শ্বাস ফেলে বলে, চলো।
০২৯. ছেলেটাকে ধরেছিল আপা
ছেলেটাকে ধরেছিল আপা। তার নাম সঞ্জয় পাল। ক্লাসমেট।
একদিন সঞ্জয় আপার কাছে পঞ্চাশটা টাকা ধার চাইল, দেবে আপা। পরশু শুক্রবার দিয়ে দেবো। খুব লেট হলে সোমবার।
আপা একটু অবাক হল। সঞ্জয়দের খুব বড় ব্যবসা। ভাল অবস্থা। অবাক আপা বলেছিল, এ তো রাজ ভিখারির মতো সিচুয়েশন। তুমি ধার চাইছ।
সঞ্জয় লাজুক হয়ে গিয়ে বলল, জানো তো, বাবা একটু টাইট ভাবে রাখে আমাকে। পকেট মানিটা খুব হিসেব করে দেয়।
তোমার পকেট মানিরই বা দরকার কী সঞ্জয়? গাড়ি করে স্কুলে আসো, তোমার তো আমার মতো বাস-ভাড়াও লাগে না।
একটা জিনিস কিনবো। নাইক-এর টি শার্ট এসেছে একটা দোকানে। কিছু কম পড়ছে টাকায়।
তখনই আপা সন্দিহান হয়েছিল। তার একটা অ্যান্টেনা আছে। তাতে সবসময়ে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। টাকাটা দিয়ে আপা বলল, তোমার টি শার্ট কোন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে।
সঞ্জয় লিন্ডসে স্ট্রিটের একটা দোকানের নাম বলল।
সুজিতার সোনার বালাটা তার ব্যাগ থেকে চুরি গেল সাত দিন পর। মোটা ভারী বালা, তাতে ঘড়ি সেট করা। সুজিতার খুব শখের জিনিস। ভারী বলে লেখার সময় খুলে হাত ব্যাগে রেখে দেয়। সুজিতা একটু অগোছালো। সাবধানী নয়। রিসেস-এর সময় ব্যাগ টেবিলে রেখেই বেরিয়ে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে, ব্যাগ আছে, বাসা নেই। সেই সঙ্গে নেই দেড়শ টাকা। খুব খোজাখুঁজি হল, স্কুলের হেড মিসকে জানানো হল। কিছু লাভ হল না তাতে।
পরদিন আপা অনীশকে এসে ধরল, শোনো অনীশ, আমার মনটাই সন্দেহ-পিচাশ। সবসময়ে পচা ইঁদুরের গন্ধ পাই। তোমাদের মতো সরল নই। আমার মনে হচ্ছে, সুজিতার যা হল সেরকম আরও হবে।
অনীশ হেসে বলে, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। একটা বুড়ি শুচিবায়ুওলা মহিলা হয়ে যাচ্ছ। কিসের গন্ধ পেলে?
এটা কোনো ড্রাগ অ্যাডিক্টের কাজ।
অনীশ হাঃ হা করে হেসে উঠল, তোমার মনটা সত্যিই সন্দেহ-পিচাশ। এই স্কুলে ড্রাগ অ্যাডিক্ট কেউ নেই। আমরা সবাই মাস-প্রমিজ করেছি, কেউ ড্রাগের পাল্লায় পড়ব না, মনে নেই? রেগুলার র্যালি হচ্ছে স্কুলে। পোস্টার সেঁটে রাখছি ঘরে। উই আর ভেরি সেনসিটিভ টু ড্রাগ।
তুমি হচ্ছ ভাল ছেলে। পারফেক্ট গুড বয়। আমি তো তা নই। তোমাকে একটা কথা বলি, একটু খেয়াল রেখো।
তোমার কাকে সন্দেহ হয়?
এখন বলব না।
সঞ্জয় নয়, এবার ধার চাইল অনয় লালা। খুবই মেধাবী ছেলে। তার বাবা আর মায়ের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গেছে। মা কে প্যারিসে, অনয় বাবার সঙ্গে কলকাতায়। স্কুল শেষ করেই সে প্যারিসে চলে যাবে।
আপা খুব সাহায্যকারী মেয়ে। প্রত্যেকের দায়ে দফায় আধা সর্বদা প্রস্তুত। ক্লাসে সবাই আজকাল তাকে মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে আন্টি বলে ডাকে। এমন কি মিস-রাও।
অনয়কে টাকাটা দিয়ে আপা বলল, শোনো, আমাকে সত্যি করে বলবে টাকাটা কেন নিচ্ছ?
অনয় খুব উদাসভাবে বলল, ধার নিচ্ছি আপা। বাবা তিন দিন হল বাইরে। আমার হাতখরচ নেই। বাবা কাল ফিরবে। দিয়ে দেবো।
আপা আর কিছু বলল না। সঞ্জয় আর অনয় যথাসময়ে তার টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছিল। তবু আপা কেমন যেন দুশ্চিন্তায় রয়ে গেল।
দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটল তিন দিন বাদে। শ্যামশ্রী নামে একটা সরল সোজা মেয়ের কাছে একটা দামী আর্টের বই ছিল। দুষ্প্রাপ্য বই। অনেক বিশ্ববিখ্যাত আর্টিস্টের ছবির প্রিন্ট। রিসেসে সে বইটা হাপিস হয়ে গেল। আবার স্কুলে একটা হৈ-চৈ হল। নাম-করা ইংলিশ মিডিয়ম স্কুল। এখানে পড়ে সব বিশিষ্ট পরিবারের ছেলে-মেয়ে। চুরির ঘটনা তাই স্কুল কর্তৃপক্ষকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। ছাত্রছাত্রীদের মিটিং ডাকা হল। গার্জিয়ানদের মিটিং হল।
ছাত্রছাত্রীদের যে মিটিং ডাকা হল তাতে প্রিনসিপাল উঠে বললেন, চুরির ব্যাপারে আপা কিছু বলবে।
