হাঁটতে হাঁটতে তারা চিৎপুরের ট্রাম রাস্তায় এসে ওঠে।
হ্যাঁ গো, তুমি ফোন করতে পারো?
ফোন! কাকে করবে?
বড়দার বাড়িতে।
জরুরী কথা আছে নাকি? দুপুরে কি বড়দাদা বাড়িতে থাকবেন? অফিস নেই।
তাই তো! মনে ছিল না। তাহলে চলো আর দু-একটা গদিতে যাই।
নিমাই একটু নিবে গিয়ে বলে, যাবে!
যাই না। বড় জোর ঘাড় ধাক্কা দেবে, তার বেশী তো আর নয়। তা আজকের দিনটা ঘাড় ধাক্কা খেয়েই যাক।
একটু চেনাজানা না থাকলে কি গিয়ে সুবিধে হবে?
একেবারে যে নেই তা নয়। পুষ্প অপেরার ম্যানেজার পানুবাবুর সঙ্গে তো কাকা একবার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল।
নিমাই মিয়নো গলায় বলে, সে কি আর মনে রেখেছে।
চলোই না দেখা যাক। গদিটা কাছেই কোথাও হবে।
আবার খুঁজতে খুঁজতে দুজনে হয়রান হয়। পুষ্প অপেরাও ছোট দল, বাজারে তেমন নাম নেই। তবে ধৈর্য ধরার একটা মূল্য তো আছেই। অবশেষে একটা গলির শেষে পুরনো একটা দোতলা বাড়ির ওপরের তলায় পুষ্প অপেরার একটা রংচটা সাইন বোর্ড দেখতে পাওয়া গেল।
পুরনো ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে উঠে একখানা টানা বারান্দার একেবারে শেষ ঘরখানায় পুষ্পর অফিস। দুজন লোক বসা। একজন বোধ হয় কোনও জ্যোতিষী। সেই বিষয়েই কথা হচ্ছিল।
অন্য জন পানুবাবুই। কাঁচা পাকা চুলের মাঝবয়সী মানুষ। বেশ শৌখিন পোশক। আদ্দির পাঞ্জাবি, হাতে তিন রকম পাথরের আংটি, গলায় সোনার চেন। কালোর মধ্যে চেহারা মন্দ নয়।
বীণা এবার আর পা খুঁজল না। খুব শিক্ষা হয়েছে। তবে জোড় হাতে নমস্কার করে বলল, পানুবাবু, চিনতে পারছেন?
পানুবাবু চিনতে পারলেন না। বা চিনতে চাইলেন না। একটু চেয়ে থেকে বললেন, না তো! তুমি কোথা থেকে আসছো?
বনগাঁ। বিশ্ববিজয় অপেরায় পার্ট করি। কাকা আলাপ করিয়ে দিয়েছিল আপনার সঙ্গে। মনে নেই?
অ। বোসো, বোসো। কাকার খবর কী? ভাল আছে তো!
আছে। আমি একটা আবদার নিয়ে এসেছি।
এখানেও লোডশেডিং। তবে সুখের কথা হল, পানুবাবু বা জ্যোতিষী বিড়ি খাচ্ছে না, আর ঘরখানা দোতলায় বলে একটু আলো-হাওয়া আছে। নিমাই বসে মৃদু মৃদু ঠ্যাং নাচাতে লাগল। কথাবার্তা যা হবে সে যেন আগে থেকেই তা জানে।
বীণা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, আমি যদি দলে আসতে চাই তাহলে নেবেন।
পানুবাবু মৃদু একটু হাসলেন। তারপর বললেন, সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু দল কোথায়?
কেন, দল উঠে গেছে নাকি?
এইবার তুলে দেবো। লোকে যা চায় তা দিতে পারছি কোথায়? পেরেও উঠব না।
তাহলে আমার কী হবে? অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম যে!
আমরাই মাইনে পাচ্ছি না ঠিকমতো। গত বিশটি বচ্ছর ম্যানেজারি করে এখন গুনাগার দিতে হচ্ছে। কর্তা আর টাকাপয়সা ঢালবেন না। বড় বড় দলের চাপে আমাদের এখন নাভিশ্বাস উঠছে। কয়েক লাখ টাকা ঢাললে তবে একটু তোলা। যায় হয়তো। টাকারই জোগাড় নেই।
বীণা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, এবার আপনাদের পালা নামছে না?
পানুবাবু একটা মাছিকে তাড়ানোর জন্য হাতের ঝাঁপটা মেরে বললেন, দুটো পুরনো প্লে নামবে। কয়েকটা বায়না হয়েছে। দেখা যাক।
তাতে হয় না?
পুরনো লোকরা সব রয়েছে যে! তাদের তো আর তাড়াতে পারি না।
নতুন মুখও তো দরকার হয়। হয় না?
দরকার হলেই বা উদ্যোগ কে নেবে বলো! স্বয়ং মালিকেরই গা নেই। তার এখন নানা ব্যবসা। খুব ফলাও অবস্থা।
যাত্রার বাজার তো এখন খুব ভাল।
আরে ভাল তো বড় বড় নামকরা দলগুলোর কাছে। আমাদের নয়।
জ্যোতিষী লোকটার চেহারা বেশ পরিপাটি। গলায় রুদ্ৰাক্ষ আর কপালে একটা সিঁদুরের ফোঁটা আছে। মিটিমিটি দেখছিল দুজনকে।
নিমাইয়ের মাথাটা এই গরমে আর রোদে একটু গোলমালই হয়ে গিয়ে থাকবে। হঠাৎ জ্যোতিষীর দিকে চেয়ে বলে ফেলল, আজ্ঞে, হাত দেখাতে কত দক্ষিণা লাগে?
জ্যোতিষী লোকটা একটু অবাক হল যেন। একটু হাসল, তারপর বলল, কেন, হাত দেখাতে চান নাকি?
কখনও দেখাইনি কাউকে। ভাগ্যটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না।
জ্যোতিষী মিটিমিটি হেসে বলল, কেমন যাচ্ছে! কাজকর্ম নেই নাকি?
নেইই বলতে পারেন।
দেখি হাতটা।
নিমাই হাতটা লুকিয়ে ফেলে বলে, আজ্ঞে, দক্ষিণাটা না জেনে দেখাই কি করে? পরে পয়সা দিতে না পারলে?
পয়সা লাগবে না।
বলেন কি? বিনা পয়সায় কি কিছু হয়?
আমি ওরকম জ্যোতিষী নই।
নিমাই চেয়ার বদল করে জ্যোতিষীর পাশে এসে বসল। হাতখানা মেলে দিয়ে বলল, দেখাতে একটু-ভয় ভয়ও করে। কি জানি কী লেখা আছে হাতে! হয়তো অপঘাতে মৃত্যু।
পানুবাবু একটা দেশলাই কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছেন। আড় চোখে দেখছেন এদিকে। বীণা একটু অবাক চোখে চেয়ে আছে। নিমাই এমন অদ্ভুত কাণ্ড কখনও করে না।
জ্যোতিষী হাতটা মন দিয়ে মিনিট খানেক দেখল। তারপর ছেড়ে দিয়ে বলল, অপঘাতে মরবেন না।
নিজের এই হঠাৎ করে হাত দেখানোর কাটা ঘটিয়ে নিমাইয়েরও এখন লজ্জা লজ্জা করছে একটু। বিনয়ে বিগলিত হয়ে বলল, বাঁচা আর মরা সমানই হয়ে এসেছে। কেমন দেখলেন হাতখানা?
জ্যোতিষী একটু হাসল। বলল, সবটাই কি কারও ভাল বা মন্দ হয়। তবে আপনি লোক খারাপ নন।
একটা ব্যবসা করার খুব ইচ্ছে। হবে?
এ হাত ব্যবসাদারের হাতই নয়। তবু করুন।
এই রে, একেবারে জল ঢেলে দিলেন যে!
কত বয়স হল।
সে সব কি আর হিসেব আছে? ত্রিশের কাছাকাছি তো হবেই। বেশীও হতে পারে।
ত্রিশের পর একটু ভাল হতে পারে।
জীবনে হাত দেখায়নি নিমাই। জ্যোতিষীরা কিরকম বলে-কয় তার ধারণাও ছিল না। অবাক হয়ে বলল, কিরকম ভাল হবে।
