বীণা একটু লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে বলল, আমার বর।
গণেশ পুরনো আমলের মানুষ। যাত্রাওয়ালির ঘর-সংসার আছে জেনে যেন খুশিই হল। বলল, বাঃ বেশ। তা তুমি কী করো হে বাপ।
নিমাই তটস্থ হয়ে বলল, এই টুকটাক।
বীণা তাড়াতাড়ি নিমাইয়ের আহাম্মক ঢাবার জন্য বলল, ফলের ব্যবসা আছে।
গণেশ প্রশান্ত মুখে বলল, খুব ভাল ব্যবসা। ফল শুদ্ধ জিনিস। তা গানটান জানোনা নাকি? একটু আগে যেন শুনছিলাম গুনগুন করে একটু গাইছিলে! কীর্তনের মতো!
ভারি লজ্জা পেয়ে গেল নিমাই। গান জানার ওই হল একটা মুশকিল। যখন তখন যেখানে সেখানে বে-খেয়ালে গলায় সুরটা খেলে ওঠে। মাথা নামিয়ে বলল, আজ্ঞে গানটান জানি না। হেঁড়ে গলায় কি আর গান হয়? একটু কীৰ্তন-টির্তন করি আর কি!
খুব ভাল। গলায় সুরও আছে মনে হচ্ছে। তা ফলও ভাল, কীর্তনও ভাল, কিন্তু কচি বউটিকে এই লাইনে ঠেলছে কেন? সংসার যে রসাতলে যাবে।
নিমাই আতান্তরে পড়ে গেল। কথাটা ন্যায্য বটে, কিন্তু প্রকাশ্যে কথাটার পো ধরা যায় না। বীণাপাণি ধর চোখে চেয়ে আছে। আমতা আমতা করে নিমাই যা বলল তারও কোনও মানে হয় না। সে বলল, আজ্ঞে, দিনকাল যা পড়েছে।
গণেশ সাহা আর একখানা বিড়ি ধরিয়ে বলল, আমার ছেলেরা সব লায়েক হয়েছে। বড়জনই এখন দলের কাজকর্ম। দেখছে। আমাদের সেকেলে রুচি সে বেশী পছন্দ করছে না। তার ইচ্ছে সিনেমার লোকজনকে টেনে আনে। কাস্টিং ভাল হলে, পালা যাই হোক, চলবে। আমার সঙ্গে মতে মেলে না, তবে মেনে নিতে হচ্ছে। এদের আমলে তো নতুনদের দলে ঢোকাই কঠিন হবে।
বীণার মুখখানা একেবারে ফ্যাকাসে মেরে গেল। ঘামছেও খুব! রুমালে মুখ মুছতে গিয়ে ঘামের সঙ্গে রূপটানের সবটুকুই প্রায় পুঁছে ফেলল। কেমন ন্যানো গলায় বলল, আমিও তো গান গাই।
গণেশ সাহা বিড়ির ধোঁয়ায় ঘরটাকে একেবারে জতুগৃহ বানিয়ে বলল, বলছি তো, সিজনটা শেষ হোক। দেখব।
আমার নাম ঠিকানা লিখে রাখুন তাহলে। নইলে ভুলে যাবেন।
গনেশ বোধ হয় বীণার হাত থেকে বাঁচার জন্যই অনিচ্ছে সত্ত্বেও এদিক ওদিক খুঁজে একটা কাগজের টুকরো আর ডটপেন বের করে নাম ঠিকানা টুকে নিল। তারপর বলল, এবার এসো গিয়ে।
নিমাই তড়াক করে উঠে পড়ল। যত তাড়াতাড়ি ঘরটা থেকে বেরনো যায় ততই মঙ্গল। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
বাইরে বেরিয়ে এসে বীণার কাঁদো-কাঁদো মুখটার দিকে চেয়ে খুব সন্তৰ্পণে জিজ্ঞেস করল, এবার কোথায় যাবে?
বীণাপাণি ঝাঝের সঙ্গে বলল, কেওড়াতলায়!
এ হল রাগের কথা। রাগের সময় লোককে ঘাঁটাতে নেই। বীণা একটা মস্ত বড় হাতব্যাগ বয়ে বেড়াচ্ছে। অত বড় ব্যাগ আনার দরকার ছিল না। ভারী জিনিস, ওর কষ্ট হচ্ছে। নিমাই হাত বাড়িয়ে বলল, ব্যাগটা বরং আমার হাতে দাও। তোমার কষ্ট হচ্ছে।
সঙ্গে সঙ্গে বীণাপাণি ব্যাগটা দ্বিগুণ জোরে পাঁজরে চেপে ধরে বলে, না। মেয়েদের ব্যাগ তুমি বাইবে কেন? খারাপ দেখাবে।
নিমাই একটু হাসল। মেয়েরা যেন কিছুতেই পুরুষদের বিশ্বাস করতে চায় না। নিমাই হাতটা গুটিয়ে নিয়ে বলল তেষ্টা পায়নি।
কেন বলো তো!
একটা ডাব খাবে নাকি? এখানে বেশ সস্তা।
আমার আর কিছু হবে না জানো?
কী হবে না।
কেউ নেবে না আমাকে। বিশ্ববিজয় অপেরা উঠে যাবে। তখন না খেয়ে বনগাঁয় পড়ে মরতে হবে।
এর জবাবে নিমাইয়ের কিছু বলার ছিল। কিন্তু গরম ঘেমমা দুপুরে চিৎপুরের পাগলকরা ভিড়ের গলিতে দাঁড়িয়ে কথাটা বলা যায় না। বললেও নেবে না বীণা। রেগে যাবে। মেজাজ বুঝে কথা না বললেই বিপদ। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
বীণা কোন দিকে যাবে তা যেন ঠিক করতে পারছে না। তার চোখে জল আসছে। ধরা গলায় বলল, এর পর বয়স হবে, রূপ যৌবন যাবে। কে পুঁছবে আমায় আর। মণিমালা অপেরার মতো ছোট দলই এত প্যাঁচ কষছে! বড় দলতো কথাই বলতে চাইবে না।
নিমাই জানে, এটা কোনও প্রশ্ন নয়। তাই জবাব দেওয়ার দরকার নেই। মুখে শুধু একটু কষ্টের ভাব ফুটিয়ে রাখা। যেন ওর দুঃখে বুক ফেটে যাচ্ছে তার। অভিনয় সেও একটু জানে। সবাই জানে। না জানলে কি জগৎসংসার চলত?
বীণাপাণি আরও কিছুক্ষণ ভিড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। ওর মাথায় কেন যেন ভূত চেপেছে আজকাল, বিশ্ববিজয় ছেড়ে বড় দলে ঢুকবে, কলকাতায় বাসা করবে। আরও অনেক কিছু। বীণাপাণিকে কিছু বোঝনোর নেই নিমাইয়ের। যা ভাল বুঝবে তাই করুক। তার দুর্দিনে বীণাপাণি যে তার জন্য অনেক করেছে সেটা ভোলে কি করে নিমাই? খারাপ অসুখ থেকে সারিয়ে তুলেছে। দোকান করে দেবে বলে ভরসা দিয়েছে। বীণাপাণি তো আর খারাপ মেয়ে নয়।
বশংবদ নিমাই বীণার কাছ ঘেঁষেই চিন্তিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
অনেকক্ষণ বাদে বীণা বলে, চলো।
চলো। কোনদিকে যাবে?
এমনি হাঁটি চলল। মনটা ভাল নেই।
সে তো জানি।
লোকটার কথা শুনে তোমার কী মনে হল বলো তো! সত্যিই ডাকবে আমাকে?
নিমাই সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে করতে পারে না। বলল, এরা সব ঘুঘু লোক। মনের কথা বুঝতেই দেয় না।
তার মানে ডাকবে না, এই তো!
মনে তো হয়, না। ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে।
এদের কেউ পৌঁছে না, জানো? বায়না হয় না। তবু কেমন ডাঁট দেখাচ্ছে। ফিল্ম স্টার নিচ্ছে না হাতি! পাঁচু চাটুজ্জের কোনও বাজার আছে নাকি? ফিলে চান্স পায় না বলে যাত্রায় এসে ঢুকেছে।
তাই হবে। সাতের দর না কী একটা বলছিল যেন।
সাতের দর মানেও জানো না? মাসে সাত হাজার টাকা মাইনে। মণিমালা অপেরা দেবে সাতের দর, হুঁ!
