গনেশের বিড়ির ধোয়া সুতরাং সইতে হচ্ছে নিমাইকে। নাক চেপে থাকবে, তারও উপায় নেই। নাক চেপে থাকলে গনেশ সাহার অপমান হতে পারে।
কথা অবশ্য বীণাই কইছে। বলে-কয় ভাল। আগে একটু আলাপও ছিল। কাঁচড়াপাড়া যাত্রা উৎসবে দল নিয়ে গিয়ে বছরটাক আগে বিশ্ববিজয় অপেরার পালা দেখেছিল গণেশ। তখনই আলাপ। বীণা পায়ের ধুলো নিয়েছিল, গনেশ আশীর্বাদ করেছিল। সেসব আজ আর মনে থাকার কথা নয়। ছিল না গণেশের। আজও পায়ের ধুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বীণা। পেরে ওঠেনি। ঘরখানা বড় ছোট, তার মধ্যে রাজ্যের টেবিল চেয়ার পাতা। আর গণেশ একখানা হাফ সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওপাশে বসা। টেবিলের নিচে অতি দুর্গম জায়গায় তার পা। বীণা নিচু হয়ে যখন অন্ধকারে গণেশের পা খোঁজাখুঁজি করছিল তখন ঠকাস করে কপাল ফুকে গেল টেবিলের কানায়। গণেশ শশব্যস্ত হয়ে বলল, থাক থাক।
শিয়ালদায় নেমে চিৎপুর অবধি আসতেই তারা ঘেমে, হাপসে অস্থির! একখানা শহর বটে এই কলকাতা। কোনওদিকেই এগোনো যায় না। বাসে ট্রামে গন্ধমাদন ভিড়, রাস্তায় থিক থিক করছে মানুষ-পোকা, হকার, বাজার, রাগী আর তেড়িয়া সব বাঘ-ভালুকের মতো লোক। বাসে ট্রামে সুবিধে হল না বলে হেঁটেই আসতে হয়েছে। ঠিকানা খুঁজে বের করতে দম আরও বেরিয়ে গেছে। গলির গলি তস্য গলির মধ্যে এই ঘরখানা। বুকচাপা অন্ধকার। হওয়া নেই। লোড শেডিং বলে দিনের বেলাতেও মোম জ্বলছে। হাতপাখা হাতে মোটা মানুষ গণেশ বসা। বদ্ধ ঘরে গণেশের বিড়ির ধোয়া একেবারে আঁট হয়ে বসে আছে। নড়ছে না।
বীণা বলল, আপনি তো আমার পার্ট দেখেছেন গণেশদা। একবার চাঙ্গ নিয়ে দেখুন, প্রাণ দিয়ে করব।
গনেশ ভারি বিমর্ষ গলায় বলল, আরে ভাই, বায়নাই হচ্ছে না তো পার্ট, গত বছর এসময়ে অন্তত গোটা কুড়ি আগাম বায়না হয়েছিল। এবার তো মাছিও বসছে না।
কেন, মণিমালা অপেরার তো খুব নাম।
সে ছিল। পৌরাণিক পালাগুলো একসময়ে রে রে করে আসর মাতিয়ে দিত। তা এখন একটু অন্যরকম করতে গিয়ে মার খাচ্ছি। দুদুটো পালা বসে মার খেল। শাখা-সিঁদুর চলল না, সতীর জ্বালা তিন-চার জায়গায় হল,কিন্তু ক্ল্যাপই পেল না।
তা বলে তো আর দল বসে থাকবে না।
বসার মতোই অবস্থা। সিনেমার পাঁচু চাটুজ্জেকে সাতের দরে রাখলুম, তাতেও কিছু হল না। লোহার কারবারটা ছিল বলে রক্ষে, নইলে পেটের ভাতে টান পড়ত।
ওকথা বলবেন না। আপনার তো খুব নামডাক। এখন একটু পড়তি অবস্থা যাচ্ছে বলে কী, আবার বায়না হবে।
তা বিশ্ববিজয়ও তো ভালই করছিল। ছেড়ে আসতে চাও কেন?
বিশ্ববিজয় ভাল দল। কাকার মতোও মানুষ হয় না। কিন্তু বনগাঁয়ে চিরটা কালই কি পড়ে থাকব।
লাইম লাইটে আসতে চাও নাকি? সে বড় শক্ত কথা। রোজ কত ছেলে মেয়ে এসে ধরনা দিচ্ছে। অনেকে পয়সাকড়িও চায় না, শুধু একটা চান্স চায়। আমি বলি কি, বিশ্ববিজয় ছেড়ে না। এখানে তো খুব কম্পিটিশন, ওখানে তা নেই। বিশ্ববিজয় কম পয়সায় পালা করে, তাই বায়নাও হয়। আর আমাদের অবস্থা দেখ, হাতি পোর খরচ। বছরে কতগুলো মাস আর্টিস্টদের বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দিতে হয়। আমরা কম পয়সায় করতে পারি না।
দেখবেন, বায়না ঠিকই হবে।
কোথায় আর হচ্ছে! শাখা-সিঁদুর আর সতীর জ্বালা এ দুটো পালায় কম পয়সা ঢেলেছিলাম? সবই কপাল। পালা দুটো চললে না হয় কথা ছিল।
আচ্ছা, আমার চেহারা তো খুব খারাপ নয়। পার্ট দেখেও তো লোকে ক্ল্যাপ দেয়। একেবারে কি ফেলনা ভাবছেন আমাকে?
গণেশ একথায় রাগ করল না। মাথা নেড়ে বলে, ওরে বাপু, চেহারা তো আমরা মেক-আপ আর আলো দিয়েই পেত্নীকে পরী বানিয়ে দিই। ওটা কোনও কথা নয়। চন্দ্রা মল্লিককে মেক-আপ ছাড়া দেখেছে কখনও রাস্তায় হেঁটে গেলে কেউ ফিরেও তাকাবে না। সেই চন্দ্রা যখন স্টেজে নামে তখন লোকে পাগল হয়ে যায়।
সে জানি। চন্দ্রাদির সঙ্গে আমার আলাপও আছে একটু।
নাম করে ফেললে সব দোষই ঢেকে যায়।
আমাকেও একটু নাম করতে দিন না। দেখবেন, ঠকবেন না।
গণেশ বিড়িটা একটা অ্যাশট্রের মধ্যে খুঁজে দিয়ে বলল, নতুন একটা পালা এবারে নামাচ্ছি। বাবু-বিবি। যদি এটা লাগে তাহলে তোমার কথা ভাববখন। এ সিজনটা যেতে দাও।
বীণা খুব আবদার মাখানো গলায় বলে, আমার কথা আপনার মনেই থাকবে না। এই তো বললেন, কত ছেলেমেয়ে আসছে পার্টের জন্য।
তা আসছে। মণিমালা অপেরার বুকের পাটা আছে বলেই নতুন আর্টিস্ট নামায়। সুনীতি বিশ্বাস, জয়ন্ত হালদার, যোগেন বোস এরা সবাই এই আমার হাতের তৈরি। সুনীতি নেমকহারামি করেনি, এখনও আছে। যদিও মেলা টাকা চাইছে আজকাল। আর যারা নাম করেছে সবাই বড় বড় দলে গিয়ে ভিড়েছে। তবু কি ভেঙে পড়েছি? আবার নতুনদের দিয়েই বছর চারেক আগে সাধক বামাক্ষ্যাপা আর ঝড়ের রাত নামিয়ে কেমন হৈ-চৈ ফেলে দিয়েছিলুম!
সে আর বলতে! ঝড়ের রাত তো এই সেদিন অবধিও চলেছে।
সব নতুন মুখ ছিল। বুঝলে?
বাবু-বিবির কাস্টিং কি শেষ?
ও বাবা! শেষ কবে হয়েছে। রিহার্সালই তো চলছে পনেরো দিনের বেশি।
একটা ছোটখাটো রোলও কি পড়ে নেই?
তাই কি থাকে! আমাদের সব গোড়া বেঁধে কাজ করতে হয়। পুজোর সময় থেকেই পালা নামবে, আর কটা দিন হাতে আছে?
আর কটা দিন আগে এলে বোধ হয় ভাল করতুম, তাই না?
তা করতে। বড্ড দেরী করে ফেলেছে। তবে চিন্তা কিসের? বয়স কম, সুযোগ হয়তো পেয়ে যাবে। সঙ্গে এটি কে বলো তো!
