চয়ন মৃদু স্বরে বলল, ঝগড়া করলি কেন?
বাঃ, ওই তো ঝগড়া করল। আমি কি লাগতে গেছি। ওপর থেকে দেখলাম তুমি চৌবাচ্চার ধারে দড়াম করে পড়ে গেলে, তাই ছুটে নেমেছি। তাতে কি দোষ ছিল। মৃগী যে কেমন খারাপ ব্যায়রাম তা আমি হাড়ে হাড়ে জানি।
এখন কী হবে? তোকে যদি তাড়িয়ে দেয়।
দিক না! জলে পড়ে যাব না ঠিকই। সামনের চাটুজ্জে বাড়ি থেকে তো দুশো টাকায় সাধছে। বর-বউ চাকরিতে যায়, বাচ্চা রাখতে লোক চাই।
চয়ন একটু হাসল। এ বয়সের মেয়েদের আজকাল চাকরির অভাব হয় না ঠিকই। বরং প্রচণ্ড চাহিদা।
চয়ন পরিশ্রান্ত বোধ করছে, একটা গভীর মন খারাপের গহ্বর তৈরি হয়েছে বুকের মধ্যে। মা চলে যাচ্ছে। সে কিছুই করতে পারছে না। মায়ের নিবন্ত মুখের দিকে চেয়ে চয়ন বলল, আমার জন্যই তো অশান্তিটা হল তোর। কেন যে তুলতে এলি আমাকে। জানিস তো বউদি আমাকে পছন্দ করে না।
রূপা দরজার চৌকাঠে উবু হয়ে বসে তার দিকে চেয়ে বলে, শোনো দাদাবাবুর কথা! একটা লোক আঁস্তাকুড়ে পড়ে থাকবে, কিছু করব না বুঝি! মৃগী খুব খারাপ রোগ। মাকে সেজন্য আমরা পুকুরে বা নদাঁতে যেতে দিই না। উনুনের ধারেও যাওয়া উচিত নয়। একবার তো ভাতের হাঁড়িতে পড়ে গিয়ে মুখটুও পুড়ে গিয়েছিল। তোমাকে দেখার তো কেউ নেই, না?
দরকারও হয় না। চলে যাচ্ছে।
তোমাকে ওই শয়তানটা দেখতে পারে না কেন বলো তো? সবসময়ে তোমাদের নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলে।
বলুক গে। কী যায় আসে।
তোমার গায়ের চামড়া বেশ পুরু আছে বাপু। অত ভয় খাও কেন? দেখলে তো চোটপাট করলুম বলে কেমন চুপসে গেল!
চয়ন মৃদু হেসে বলে, তোর খুব সাহস, না?
আমি কাউকে ভয় খাই না।
দেশে থাকতে লেখাপড়া করিনি?
রূপা মুখটা একটু ঝামরে বলল, সবাই কেন ওকথা জিজ্ঞেস করে বলো তো! লেখাপড়া করে কি তোমাদের আর দুটো করে হাত-পা গজিয়েছে? তোমার বউদি তো শুনি বি এ পাশ, আহা, কী বি এ পাশের ছিরি! মুখ তো আমাদের মতোই আঁস্তাকুড়! না বাপু, আমি বেশী পড়িটড়িনি তবে বাংলা অক্ষর চিনি। সোজা বই হলে একটু-আধটু পড়তেও পারি। কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং করে লিখতেও পারি একটু।
বাড়িতে কে আছে?
যেমন সকলের থাকে। মা বাপ তিনটে ভাই আর চারটে বোন। রোজগারপাতি নেই। বাবার একটা ভটভটি আছে, ভাগের। আর ক্ষেতে কিছু ধান হয়। একটা ভাই মাছের ভেড়িতে সদ্য কাজে ঢুকেছে।
তুই একটা বেশ মেয়ে। তবে একটু ঝগড়াটি, তাই না?
ঝগড়াটি না হলে শেয়ালে শকুনে টেনে নিয়ে যেত এত দিনে, বুঝলে? মুখের জোর আর গলার জোর না থাকলে আমাদের মতো মেয়েদের খুব বিপদ।
চয়ন একটু অবাক হয়ে বলে, বেশ বলেছিস তো!
নিজের কানেই তো শুনলে, তোমার বউদি তোমাকে আমাকে নিয়ে কেমন খারাপ কথা বলছে। কিছু করিনি তাও। মুখ বুজে থাকলেই পেয়ে বসত। আরও বলত। এমন ঝামা ঘষে দিয়েছি যে, আর বলবে না কখনও।
চয়ন মৃদু ম্লান একটু হাসল। তারপর নরম গলায় বলল, যা, ঘুমো গে।
তুমি কী করবে? মাকে আগলে বসে থাকবে।
মাকে নিয়েই তো থাকি।
অবস্থা কি খুব খারাপ?
মায়ের শরীরে কি কিছু আছে বল! কখানা হাড় শুধু।
জানি। আমি এসে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখে যাই।
চয়ন কৃতজ্ঞতায় ভরে গিয়ে বলে, মাঝে মাঝে দেখিস। কেউ দেখে জানলে ভরসা পাই।
ভেবো না তুমি। এ বাড়িতে যে কদিন আছি, দেখব।
রূপা চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল চয়ন। মা সারা রাত নানারকম শব্দ করল। শ্বাসের শব্দ, কষ্টের শব্দ। ভোরবেলার দিকে শান্ত হল যেন। ডাক্তার বেলা আটটা নাগাদ এসে দেখে-টেখে বলল, ফাঁড়াটা এ যাত্ৰা কেটেছে। কিন্তু এ রোগে কিছু বলা যায় না।
সকালে আজ টিউশনিতে যায়নি চয়ন। সারাদিন মায়ের পাশে বসে রইল চুপ করে। কিছু ভাবল না। কিছু করল না। এমন কি খেতে অবধি ইচ্ছে হল না।
বিকেলের দিকে সামলে উঠল তার মা। দুটো একটা কথা বলল।
টিউশনিতে কি যাব মা? একা থাকতে পারবে?
যা বাবা। কামাই হলে যদি ছাড়িয়ে দেয়! যা। একাই তো থাকি। পারব।
সারাদিন খায়নি বলে যে খিদে পেয়েছিল তাও নয়। শরীরটা অবসন্ন লাগছিল তার। এর বেশী কিছু নয়।
কিন্তু মোহিনী তাকে দেখেই বলল, মাস্টারমশাই, আপনার কী হয়েছে?
চয়ন অপ্রতিভ মুখে বলল, তেমন কিছু নয়। মার শরীরটা ভাল নয়। রাত জাগতে হয়েছিল।
তাহলে আজ না এলেই হত। একটা ফোন করলেই পারতেন।
সারাক্ষণ ঘরে থাকতে ভালও লাগছিল না।
মায়ের কী হয়েছে?
হার্ট ভাল নয়।
মাহিনীর চোখ একটু ছলছল করল বোধ হয়। মুখের দিকে তাকায় না বলে স্পষ্ট দেখতে পেল না চয়ন। তবে মেয়েটা বড্ড মায়াবী। মনটা খুব নরম।
মোহিনী হঠাৎ বলল, আপনি বোধ হয় কিছু খাননি আজ।
না না, খেয়েছি।
দাঁড়ান তো! আসছি।
মোহিনী উঠে গেল। লজ্জায় মরমে মরে যাচ্ছিল চয়ন। প্রাইভেট টিউটর হিসেবে সে কি বড্ড বেশী প্রশ্রয় পাচ্ছে না। এতটা কি তার পাওনা?
০২৮. বিড়ির গন্ধটা নিমাইয়ের সহ্য হচ্ছিল না
বিড়ির গন্ধটা নিমাইয়ের সহ্য হচ্ছিল না। বিড়ির মধ্যে যে কী মধু আছে কে জানে বাবা! লোকে সারাক্ষণ ফুসফুস করে টেনেই চলেছে, টেনেই চলেছে। বিটকেল ঝালো গন্ধটা কে এলেই নিমাইয়ের পেটে গোতলান মারতে চায় একটা অস্বস্তি। তবু সইতে হয়। না সয়ে উপায় কী? যার সঙ্গেই কথা কইতে যায় সেই দুচার কথার পর ফস করে একটা বিড়ি বা সিগারেট ধরিয়ে ফেলে। বিড়িই বেশী। সিগারেট বিড়িতে চারদিকটা ময়লাপ।
গণেশ সাহা মস্ত মানুষ। মণিমালা অপেরার মালিক। চিৎপুরে গদি। এরকম সব মানুষের সামনে এসে বসতে পারাটাই ভাগ্যের কথা। কত উমেদার আসে, দরজার বাইরে থেকেই খেদিয়ে দেওয়ার কথা। সেটা যে করেনি সেটাই সৌভাগ্য বলে বিবেচনা করছে নিমাই।
