অয়ন বলল, মাঝে মাঝে জ্বালতে হয়।
রুগীর পক্ষে খারাপ।
প্লাস্টিকের ব্যাগটা কোথায় ফেলেছে তা অন্ধকারে দেখতে পাচ্ছিল না চয়ন। ডাক্তারের ভিজিটটা দিতে হবে।
কী খুঁজছো?
ছোট একটা কালো প্লাস্টিকের ব্যাগ।
দাঁড়াও। বলে রূপা উপুর হয়ে এদিক ওদিক খুঁজে চৌকির পায়ার কাছ থেকে ব্যাগটা কুড়িয়ে এনে দিল।
ডাক্তারবাবু চলে যাওয়ার পর সদর বন্ধ হলে চয়ন এসে মায়ের কাছে বসল। আর সঙ্গে সঙ্গে ওপরে জানালা খুলে বউদি চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই রূপা হারামজাদী বজ্জাত, কতবার ওপরে আসতে বলেছি তোকে?
রূপা উঠোন থেকে সমান তেজে জবাব দিল, অমন আঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছে কেন? বুড়ো মানুষটার অসুখ করেছে বলে দেখতে এসেছি সেই তখন থেকে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কেন, কি কাজ তোমার?
ফের মুখে মুখে কথা! আমি হুকুম করেছি, তুই ওপরে আসবি। উল্টে চোপা করছিস!
যাবোনা ওপরে, কী করবে? গলাটা কেটে ফেলবে? এঃ, হুকুম দেখাতে এসেছে।
এই শুনছো! ওকে কান ধরে নিয়ে এসো তো।
এ কথাটা অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলা। অয়ন কিছু উপদেশ দেবে বলেই বোধ হয় দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু রূপা আর বউয়ের ঝগড়ায় বিব্রত হয়ে চুপ করে ছিল। এবারে মুখ ফিরিয়ে রূপার দিকে চেয়ে বলল, যা না ওপরে।
রূপা ঝাঝিয়ে উঠে বলে, কেন যাবো? মাঝ রাত্তিরে তো আর ঘরের কাজ নেই। একটু দেখতে এসেছি, অমনি কেমন যাকাচ্ছে দেখ। আচ্ছা মেয়েমানুষ বাবা!
ওপর থেকে বউদির গলায় একটা বিস্ফোরণ শোনা গেল, শুনলে! তুমি পুরুষমানুষ না কী! আঁ! চুলের বঁটি ধরে ওকে দু ঘা দিতে পারছে না? মুখের সামনে দাঁড়িয়ে ঝি-চাকর যা-খুশি বলে যাবে! তোমার ব্যক্তিত্ব নেই।
অয়ন যে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা চয়ন খুব বুঝতে পারছে। রূপার গায়ে হাত তোলার মতো সাহস তার নেই, বউয়ের অবাধ্য হওয়ার মতো বুকের জোরেরও অভাব।
বউদি চেঁচিয়ে বলল, মেনীমুখো পুরুষ বলেই তো কেউ মানে না, ভয়ও খায় না। দিব্যি বাড়ি দখল করে আপদেরা বসে আছে। পারলে তাড়াতে। একদিন এ বাড়ি ওই ছোট তরফের ভোগেই যাবে। ভাল মানুষটি সেজে থাকে বলে সোজা পাত্ৰ ভেবো না। ভিরমি খায়, চোখ উল্টে পড়ে থাকে ওসব ন্যাকামি ঢের জানা আছে। তলায় তলায় কী করছে জানো? নইলে ওই সোমখ মেয়েটা রাতবিরেতে গিয়ে ওরকম ঝাঁপ খেয়ে পড়ে নাকি? মুখের অত জোরই বা আসছে কোত্থেকে যদি না তোমার যুধিষ্ঠির ভাইয়ের উসকানি থাকত!
এই অ্যাঙ্গেলটা খুব নতুন। রূপার সঙ্গে কত অনায়াসে তাকে জড়িয়ে নোংরা ইঙ্গিত করে ফেলল বউদি! প্রতিবাদ করার মতো জোর বা ক্ষমতা নেই চয়নের। অবাধ্য হৃৎপিণ্ডের একটা প্রবল দুরদুরুনি নিয়ে সে মায়ের মৃতপ্রায় মুখের দিকে চেয়ে বসে রইল।
জবাব দিল রূপা, বেশী কথা কইবে তো আমিও কথা কইতে জানি। যখন দেশ থেকে আনিয়েছিলে তখন তো কত ভাল ভাল কথা! ভাল হয়ে থাকবি, তোর বিয়ে অবধি আমরা দিয়ে দেবো। মেয়ের মতো ভালবাসবো। যাদের কথার ঠিক নেই তাদের সঙ্গে খানকীর তফাত নেই, বুঝলে!
খানকী আমি না তুই? মাঝরাতে উঠে একেবারে আলুথালু হয়ে গিয়ে বুকের ওপর পড়ল—যেন উত্তম-সুচিত্রা! ড়ুবে ড়ুবে জল খাস একাদশীর বাবাও টের পায় না, না? অত দরদ কিসের রে? ধুমসো মেয়ে, ফ্ৰক পরে কচি খুঁকি সেজে থাকলেই বুঝি লোকের চোখে ধুলো দেওয়া যায়। এই, তুমি এখনও দাঁড়িয়ে মজা দেখছো? পায়ের চটিটা খুলে ওর দু গালে মারতে পারছে না?
অনেকক্ষণ বাদে অয়ন মানুষের মতো একটি আচরণ করল। ওপর দিকে চেয়ে বলল, কেন চিৎকার করছে বলে তো? মায়ের যে ভীষণ অসুখ।
আহা, মায়ের অসুখ! অসুখ তো নিত্যিদিন আছে। আর তোমার নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে যে মেয়েটা আমাকে যা খুশি বলছে! তোমার মতো পুরুষের ঘোমটা দিয়ে থাকা উচিত।
দ্বিধাবিভক্ত অয়ন নিজেকে জোড়া দিতে পারছে না। কেরোসিনের ম্লান আলোতেও তার অসহায় মুখখানা দেখতে পাচ্ছিল চয়ন। সে মৃদুস্বরে বলল, তুই ওপরে যা দাদা। আমি তো মায়ের কাছে আছিই।
অয়ন সামান্য দ্বিধার সঙ্গে বলল, তুই কি এর মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি! কই, দেখিনি তো!
লজ্জিত চয়ন বলে, হঠাৎ মায়ের এরকম হওয়ায় বোধ হয় মাথাটা ঘুরে গিয়েছিল। চৌবাচ্চার কাছে পরে গিয়েছিলাম। রূপা এসে চোখে মুখে জল দিয়েছিল।
অয়ন একটা শ্বাস ফেলে বলে, এই তাহলে ব্যাপার।
উঠোনে রূপা হঠাৎ কি একটা কথার উত্তরে পেঁচিয়ে বলল, গলায় তুমি দড়ি দাও গে। সকাল হোক না, পাড়ার লোক যদি জড়ো না করি তাহলে আমার নামে কুকুরকে ভাত দিও। পাশের বাড়ির বিত্তি বলেছে, এ বাড়ির বউদিটা এক নম্বরের হারামি।
শুনলে! শুনলে তুমি?
অয়ন বিবর্ণ মুখে রূপার দিকে ফিরে বলল, কী করছিস তুই! কোন সাহসে এত কথা বলছিস?
কেন, আমি কি কাউকে ভয় পাই?
চুপ করবি কিনা!
আগে তোমার বউকে চুপ করাও!
অসহায় অয়ন একবার চয়নের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করে ধীরে ধীরে ওপরে চলে গেল। চয়ন ঘর থেকে শুনতে পেল, ওপরে স্বামী-স্ত্রীতে প্রবল কথা কাটাকাটি হচ্ছে। তবু ভাল। পাড়া জানান দিয়ে যা হচ্ছিল তার চেয়ে এটা বরং ভাল। ওদের স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া খুব হয়। কিন্তু পরদিন আবার বেশ ভাবসাব, হাসি হাসি মুখ, ওগো-হা গা।
রূপা দরজায় এসে দাঁড়িয়ে আছে। মুখখানা ফেটে পড়ছে রাগে।
চয়ন একবার তাকাল তার দিকে। বছর পনেরো-যোলোর সতেজ মেয়ে। রংটা চাপা, মুখে একটা রুক্ষ উগ্র ভাব আছে। মাথায় একরাশ কোকড়া চুল। মাত্র মাসখানেক হল এসেছে। চয়নের সঙ্গে ভাল করে দেখাও হয় না। তবে এক মাসে সে এটা লক্ষ করেছে যে, দাদার অন্য সব ঝি তার সঙ্গে যেমন খারাপ ব্যবহার করে, এ মেয়েটা তেমন করে না।
