চয়ন জবাব দিতে পারল না। তার গলায় শব্দ নেই। সে শুধু ক্লান্ত ঘাড়টা লটকে ঊর্ধ্বমুখে চেয়ে রইল। খরার আকাশের দিকে এভাবেই বোধ হয় হতাশ চাষী তাকিয়ে থাকে।
তবে ল্যাম্পপোষ্টের আলো পড়েছিল তার মুখে। ডাক্তারবাবু চিনতে পারলেন, কি রে চয়ন?
চয়ন তার প্রাণপণ শক্তিতে গলা ঘেঁড়ে বলে উঠল, মা!
ডাক্তারবাবু নেমে এলেন। চয়ন তখন সিঁড়িতে বসে হাঁফাচ্ছে।
কী হয়েছে? স্ট্রোক নাকি?
চয়ন শুধু মাথা নেড়ে জানাল যে, সে জানে না।
সামান্য উত্তেজনা, সামান্য উদ্বেগ, একটু আচমকা দৌড়ঝাঁপ তাকে যেন রসাতলে ফেলে দেয়। ডাক্তারবাবুর পিছু পিছু বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের ওপর ঘেন্নায় মরে যাচ্ছিল। ডাক্তারবাবুর কোনও কথারই সে স্পষ্ট জবাব দিতে। পারেনি।
ডাক্তার এসে মাকে দেখলেন, তারপর অয়নের দিকে তাকিয়ে বললেন, কার্ডিয়াক অ্যাজমা ছিল নাকি?
অয়ন বলে, ঠিক জানি না।
হাসপাতালে নিতে পারবে?
হাসপাতাল! বলে অয়ন খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল।
ডাক্তার একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, অবশ্য সেখানে নিয়েও খুব লাভ হবে না। শরীরে তো কিছুই নেই দেখছি, কখানা হাড় মাত্র। এক কাজ করা, নন্দী ফার্মাসি থেকে একটা অকসিজেন সিলিন্ডার আনাও। আর ওষুধ। ওদের দোকানের ভিতরে লোক থাকে। ডাকলেই উঠে ওষুধ দেবে। তাড়াতাড়ি করো। আমি বসছি।
কাঁচা ঘুম থেকে উঠে-আসা বিরক্ত অয়নের মুখ দেখে কেরোসিনের আলোতেও চয়নের মনে হয়েছিল, বিছানায় ওই যে কখানা হাড়ের অস্তিত্ব নিয়ে পড়ে আছে মা, আজও নিজ্জের মতো পৃথিবীতে মা হয়ে জন্মনোর গুনাগার দিচ্ছে, এ মা অয়নের নয়। অয়নরা মায়ের পেটে জন্মায় না। অয়নদের মা বলে কেউ থাকে না।
অয়ন চয়নের দিকে চেয়ে বলল, দৌড়ে যা।
চয়ন জানত তাকেই যেতে হবে। দ্বিরুক্তি না করে সে তোশকের তলা থেকে প্লাস্টিকের ছোেট ব্যাগটা বের করে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এবং তারপরই বুঝতে পারল, শরীরময় অস্তিত্বের কত অসুবিধে। তার হাঁটু ভেঙে আসছে। তার হাফ ধরে যাচ্ছে।
তবু নন্দী ফার্মাসি অবধি গেল চয়ন। দরজা খোলালো। সিলিন্ডার আর ওষুধ নিল। তারপর তার পক্ষে গন্ধমাদন বওয়ার মতো ভারী সিলিন্ডার কাঁধে নিয়ে সে ফিরল।
উঠোনটা সে যে কী করে পেরোলো তা সে নিজেও জানে না। দরজার চৌকাঠটা কোনওক্রমে ডিঙিয়ে সে সিলিন্ডার সমেত পড়ে যাচ্ছিল মেঝেয়। ডাক্তারবাবু ধরলেন, আহা, ওরকম অস্থির হলে চলে? বিপদে মাথা ঠিক রাখতে হয়।
তখন কানে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে চয়নের। তবু পকেট থেকে ওষুধ, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ আর অ্যাম্বুলের প্যাকেটটা বের করে দিল।
আর সময় ছিল না তার। দরজার বাইরে নিজেকে নিক্ষেপ করল সে। কয়েক পা টলোমলো করে হেঁটে চৌবাচ্চার দিকে সরে গেল, যেখানে বাসন মাজাের ছাইগাদা, নোংরা ফেলার বালতি। সেখানেই অন্ধকারে নিজেকে ঢেলে দিল সে। তারপর নিশ্চিন্তে অজ্ঞান হয়ে গেল।
কেউ একজন দেখেছিল তাকে। ওপর থেকে। সে জানত না।
কিন্তু চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা খেয়ে যখন চোখ খুলে তাকাল তখনও খুব বেশী সময় যায়নি। হয়তো কয়েক মিনিট। সামনে বউদিদের কিশোরী ঝি রূপা দাঁড়ানো। হাতে মগ।
ওপর থেকে বউদি চাপা তীব্র স্বরে ডাকছিল, এই রূপা! কী করছিস ওখানে? চলে যায়।
রূপা অবশ্য পাত্তা দিল না। চয়নের দিকে চেয়ে ফ্রক পরা মেয়েটা বলল, আমার মায়েরও এ রোগ আছে। পীরবাবার জলপড়া দিলে সেরে যায়।
চয়ন ভেজা গায়ে উঠে বসল। শরীরে ভাটির টান। পরনির্ভর এই জীবনের ভার আর বইতে ইচ্ছে করে না।
মেয়েটা এগিয়ে এসে হাত ধরে বলল, ভর দিয়ে ওঠো, পারবে?
ওপর থেকে বউদি চেঁচাল, এরপর কিন্তু চুলের মুঠি ধরে হেঁচড়ে আনবো।
চয়ন বলল, তুই ওপরে যা রূপা। আমি পারব।
রূপা খুব একটা চাপা গলায় নয়, বরং একটু শুনিয়েই বলল, চেঁচাক না মাগী, সবসময়েই তো চেঁচায়। সামনের শনিবার খুড়ো এলে তার সঙ্গে চলে যাবো। মা গো! এ বাড়িতে মানুষ থাকতে পারে।
রূপার গলা নিস্তত রাতে স্পষ্টই শুনতে পেল বউদি। তাই বোধ হয় আর একটাও কথা বলল না। জানালা বন্ধ করে দিল।
চয়ন ভয় পেল। সে জানে, জল অনেক দূর গড়াবে। বউদি সহজে ছাড়বে না। সে মৃদু গলায় বলে, ওপরে যা রূপা, নইলে হয়তো মারবে।
রূপা ফাঁক করে হেসে বলে, অত সোজা নয়। প্রথম প্রথম চড়-চাপড় হজম করেছি, তারপর একদিন যেই মারতে এসেছে অমনি বেলনা তুলে আমিও তেড়ে গেছি। ব্যস মর্দনী সব ফুস করে উবে গেছে। আজকাল তো আমি গাল দিলেই উন্টে গাল দিই। ওঠো তো, ভর দিয়ে ওঠে।
ভর দিতেই হল চয়নকে। নইলে উঠতে পারত না।
তুমি যখন থাকো না তখন আমি এসে মাঝে মাঝে বুড়ি মাকে দেখে যাই। ইস, কেমন মড়ার মতো পড়ে থাকে! মনে। হয় বুঝি শ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে।
চয়ন খুব বড় বড় করে শ্বাস নিতে লাগল।
বুড়ি মাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাও না কেন?
চয়ন এ কথার কীই-বা জবাব দেবে? সে একটু হাসবার চেষ্টা করল মাত্র।
রূপা ওপরে গেল না। তার পিছু পিছু ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
ডাক্তার ইঞ্জেকশন দিয়ে নাকে নল লাগিয়েছে। তারপর নাড়ী ধরে বসে আছে। পাশে বিরক্ত অয়ন।
ডাক্তার মায়ের হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলল, সবসময়ে অ্যালার্ট থেকো। অবস্থা খুব ভাল নয়। এ ঘরে আলো নেই কেন বলো তো!
অয়ন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, লাইনটা খারাপ।
আলো থাকাটা দরকার। আর ঘরটা ভীষণ স্টাফি। সম্ভব হলে দোতলায় শিফট কোরো। এখানে তো কেরোসিনের গ্যাস জমে আছে। স্টোভ জ্বলে নাকি?
