হেমাঙ্গ একটু হাসল, পেয়েছি। তবে গায়ের স্কুল বলে, বড় ধরনের গণ্ডগোল না থাকলে আমি প্রশ্ন তুলি না।
সো কাইন্ড অফ ইউ। প্রশ্ন উঠলে আমাকে বিব্রত হতে হত। আমার ইচ্ছে ছিল, ছোট্ট একটা গায়ের স্কুলকে ধীরে ধীরে একটা মডেল স্কুল তৈরি করব। একটা একজাম্পল তৈরি করব।
পারলেন না?
একদম নয়। একটা বিল্ডিং গ্র্যান্ট বের করতে, একটা এইড বের করতে, একটা উইং খোলার জন্য পারমিশন পেতে যে কী ছোটাছুটি করতে হয়। তাও কাজটা হয় না। এতদিন বাদে বুঝতে পারছি, এখানে পণ্ডশ্রম করে কোনও লাভ নেই। ভারতবর্ষ তার নিজস্ব দৰ্শনে চলবে, তাকে চালানো যাবে না। যারা সে চেষ্টা করেছেন কেউ পারেনি।
হেমাঙ্গ সপ্রশংস চোখে এক ঝলক রশ্মিকে দেখে নিল। কিছু বলল না। মেয়েটা বুদ্ধিমতী, সময় থাকতে সার সত্যটা বুঝতে পেরেছে।
রশ্মি একটা বড় শ্বাস ফেলে বলল, একজন লোক স্কুলটাকে তিন বিঘা জমি দান করে গেছেন। আপনি বিশ্বাস করবেন না, সেই জমিটা আজ অবধি আমরা দখল করতে পারিনি। আদালতের হুকুম পাওয়া সত্ত্বেও। কেন জানেন? কিছু পাওয়ারফুল লোক ওই জমিতে চাষ করায়। কোনও সভ্য দেশ হলে এটা হতে পারত না।
ভারতবর্ষের জন্য লজ্জাবোধ করেই যেন হেমাঙ্গ মুখ নামিয়ে নিল এবং বেগুন বড়ির পাতুরিটা সরিয়ে রাখল, খেল না।
রশ্মি বলল, আপনি কিছু খাচ্ছেন না! না খেলে মাস্টারমশাই দুঃখ পাবেন। এ আয়োজনটা ওঁর নিজের। স্কুলের টাকায় নয় কিন্তু।
হেমাঙ্গ ফের অস্বস্তিতে পড়ল।
রশ্মি মৃদু স্বরে আদেশ করল, খান। আপনার খিদে পেয়েছে।
হেমাঙ্গ মৃদু স্বরে বলে, আমি মেয়েদের সামনে খেতে পারি না।
সে কী? বলে রশ্মি খিলখিল করে হেসে ফেলল, আপনার বউও তো একটি মেয়েই, তার সামনে খান তো! তখন?
সেই জন্যই তো বিয়ে করিনি।
রশ্মি খুব হাসল, প্রথমে আপনাকে খুব গোমড়ড়ামুখখা মনে হয়েছিল, তা তো নন? আচ্ছা বাবা, আমি উঠে যাচ্ছি।
আরে না, আপনি বসুন। আমি খাচ্ছি। কিন্তু তাকাবেন না।
রশ্মি খুব সস্নেহে চেয়ে থেকে বলল, ও লজ্জাটা তো মেয়েদের থাকে। আমার অবশ্য নেই।
এই ছোটোখাটো কথা অদৃশ্য মাকড়সার মতো একটা জাল বুনে যাচ্ছে কি? তৈরি হচ্ছে একটা প্যাটার্ন? হেমাঙ্গ এই প্যাটার্নটাকে ভয় পায়। কোথাকার জল কোথায় গড়ায় কে জানে? হয়তো তারা আজ একসঙ্গে এক গাড়িতেই ফিরবে। হয়তো তারপর দক্ষিণ কলকাতাতেও! হয়তো কাছাকাছিই তাদের বাড়ি।
আচ্ছা কলকাতায় আপনি কোথায় থাকেন? উদ্বিগ্ন হেমাঙ্গ হঠাৎ জিজ্ঞেস করে।
হাজরা।
হেমাঙ্গ হাঁ করে থাকে দু সেকেন্ড। তার দাগী দাঁতটা সুলসুল করে। হাজরা যে তার গা ঘেঁষে।
০২৭. শরীর ছাড়া মানুষের আর কী আছে
শরীর ছাড়া মানুষের আর কী আছে, আর কিসের প্রয়োজন তা বুঝতে পারে না চয়ন। কোনও দেবতা এসে যদি চয়নকে বলত, তোমাকে একটা মাত্র বর দেববা। যা খুশি চাইতে পারো। কী চাইবে চয়ন। করজোড়ে সমস্ত অন্তর দিয়ে সে বলবে, পৃথিবীর আর কোনও সম্পদ চাই না, শুধু আমার শরীরটাকে ভাল করে দাও। তাও ভাল বলতে সে পেশীফোলানো দেহশ্ৰী ব্যায়ামবীর হতে চায় না, সে লম্বাচওড়া জাৰ্মান বা আফগানও হতে চায় না, সে শুধু চায় একটু সুস্থ থাকতে, যেখানে সেখানে যখন তখন অজ্ঞান না হয়ে যেতে। ব্যস এইটুকু মাত্র। কত সাধারণ হেটো মেঠো মানুষেরও তো এইটুকু আছে। এ কি খুব বেশী চাওয়া তার?
হয়তো-বা বেশীই। ডস্টয়েভস্কিই না জীবনের শেষ দিকে এসে বলেছিলেন, শরীর যে মানুষের কত বড় সম্পদ তা আজ আমি বুঝি। খ্যাতি, সফলতা সবকিছুর পরও কেন তার ওই বিলাপ যদি সেটা সত্যিই মহার্ঘনা হয়?
জাগা অবস্থায় সকাল থেকে রাত অবধি চয়নের কাছে পৃথিবীটা বিবৰ্ণতায় মোড়া, বিষণ্ণতায় মাখা। তার সঙ্গে পায়ে পায়ে পোষা বেড়ালের মতো ঘোরে শরীরের ভয়।
গতকাল রাতে চয়ন কেরোসিনের টেবিল বাতিটা জ্বালিয়ে বই পড়ছিল। চৌকিতে অস্থিসার মা ঘুমোচ্ছিল নিঃসাড়ে। হঠাৎ মায়ের শ্বাসের শব্দটা খেয়াল করল চয়ন। কেমন কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে। হাঁফধরা। সঙ্গে কি ক্ষীণ একটা কেঁকানির শব্দও?
চয়ন উঠল, যা দেখল তাতে তার হাত-পা হিম। চোখ ওল্টানো, হাঁ করা মুখ, শ্বাস নিতে কী কষ্টই যে হচ্ছে।
মা! মা! বলে চয়ন কয়েকবার ডাকল। সাড়া পেল না।
দরজা খুলে উঠোন পেরিয়ে সে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দরজাটায় ধাক্কা দিয়ে ডাকল, দাদা! বউদি! শিগগির এসো! মা কেমন করছে।
কয়েকবার ডাকবার পর ওপরের জানালা দিয়ে অয়ন বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে, চেঁচাচ্ছিস কেন?
একটু এসো। মা কেমন করছে।
অয়ন নেমে এল। বউদি এল না। অয়নের হাবভাবে ব্যস্ততা নেই, উদ্বেগ নেই, উত্তেজনা নেই, এল, দেখল। তারপর চাবির গোছাটা চয়নের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ডাক্তার রাহাকে একটা খবর দে।
চয়ন এত ঘাবড়ে গেছে যে, একগোছা চাবির ভিতরে কোনটা সদরের চাবি তা খুঁজে পাচ্ছিল না। কাঁপা হাতে একটার পর একটা চাবি দিয়ে চেষ্টা করছিল খুলতে। হয়তো এক চাবিই দুতিনবার লাগাল। অয়নকে জিজ্ঞেস করবে সে কথা মনেই হল না তার। কতদিন হল, তার কেবলই মনে হয় মা তার একার। এ মা অয়নের নয়। এ দায় তাকে একা বইতে হবে।
দরজা খুলে বেরোতেই সে গলঘর্ম হয়ে গিয়েছিল। যখন দুটো মোড় পেরিয়ে রাহার বাড়ির দরজায় পৌঁছেলো তখন তার শরীরে আর একটুও জোর নেই, বুকে নেই দম।
দোতলা থেকে একটি পুরুষক জিজ্ঞেস করল, কে?
